রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পাঁচ দিনে দম্পতিসহ আটজনের অস্বাভাবিক মৃত্যু; প্রাথমিক তদন্তে আত্মহত্যা, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট ও পানিতে ডোবার তথ্য।
ঢাকা | ৩১ মে ২০২৬
পবিত্র ঈদুল আজহার সরকারি ছুটির মধ্যে ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় পৃথক ঘটনায় এক অন্তঃসত্ত্বা নারী ও তাঁর স্বামীসহ অন্তত আটজনের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। গত ২৫ মে থেকে ২৯ মে পর্যন্ত পাঁচ দিনের ব্যবধানে রাজধানীর দারুসসালাম, ভাটারা, কামরাঙ্গীরচর, আজিমপুর, শেরেবাংলা নগর (বসুন্ধরা সিটি) এবং তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা এলাকায় এসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। মৃতদের মধ্যে চারজন ঝুলন্ত লাশ, একজন বহুতল ভবন থেকে পড়ে, একজন পানিতে ডুবে, একজন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে এবং অপর এক যুবক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) জানিয়েছে, প্রতিটি ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট থানাগুলোতে মোট আটটি অপমৃত্যুর (ইউডি) মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।
দারুসসালামে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ও স্বামীর লাশ উদ্ধার
দারুসসালাম থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঈদুল আজহার আগের দিন গত বুধবার দুপুরে জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’ নম্বরে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে হরিরামপুর এলাকার একটি টিনের ছাপড়া ঘর থেকে নূর মোহাম্মদ ওরফে হৃদয় (২৫) এবং তাঁর স্ত্রী ঝুমা আক্তারের (১৮) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহত ঝুমা আক্তার অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন এবং দুই থেকে তিন বছর আগে তাঁদের বিয়ে হয়েছিল। দারুসসালাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. দুলাল হোসেন জানান, ঘরের ভেতর থেকে ছিটকিনি লাগানো ছিল। প্রতিবেশীদের খবরের ভিত্তিতে স্বজনেরা দরজা ভেঙে বাঁশের আড়ার সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকা মরদেহ দুটি নামিয়ে আনেন। পুলিশ প্রাথমিকভাবে এটিকে যৌথ আত্মহত্যা বলে ধারণা করলেও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে।
ছোলমাইদ ও কামরাঙ্গীরচরে দুই যুবকের ঝুলন্ত মরদেহ
ছুটির মধ্যেই রাজধানীর ভাটারা ও কামরাঙ্গীরচরে আরও দুটি ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। গত শুক্রবার রাতে ভাটারার ছোলমাইদ এলাকার একটি বাসার তৃতীয় তলার কক্ষ থেকে মনির গাজী (২৪) নামের এক অনলাইন ফুড ডেলিভারি কর্মীর গলিত ও ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। ভাটারা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. জাহিদুল ইসলাম জানান, বাড়ির মালিক কোরবানির মাংস দিতে গিয়ে ঘর বন্ধ ও দুর্গন্ধ পেয়ে পুলিশে খবর দেন। লোহার অ্যাঙ্গেলের সঙ্গে ঝুলন্ত লাশটি উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) মর্গে পাঠানো হয়। অন্যদিকে, একই রাতে কামরাঙ্গীরচরের আশরাফাবাদ এলাকার একটি বাসা থেকে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় এনাজুল ওরফে সুমন (২৫) নামের এক রিকশাচালকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
আজিমপুরে পানিতে ডুবে কিশোর ও বসুন্ধরা সিটিতে পড়ে শিক্ষার্থীর মৃত্যু
গত সোমবার বিকেলে আজিমপুর সরকারি কলোনির পুকুরে ডুবে মুহতাসিম হক জাহিন (১৫) নামের বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রের মৃত্যু হয়। সাঁতার না জানা জাহিন বন্ধুদের সঙ্গে পুকুরে নামলে তলিয়ে যায়। পরে স্থানীয়রা উদ্ধার করে ঢামেক হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এদিকে, বুধবার বিকেলে তেজগাঁও থানা এলাকার বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সের সাততলা থেকে নিচে পড়ে মো. সৌরভ (২৭) নামের উত্তরার একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক শিক্ষার্থী নিহত হন। তেজগাঁও থানার ওসি ক্যশৈনু মারমা জানান, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করে প্রাথমিকভাবে এটিকে আত্মহত্যা বলে মনে করা হচ্ছে। নিহতের ভাঙা মুঠোফোন থেকে সিমকার্ড উদ্ধার করে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।
জুরাইনে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে বই ব্যবসায়ী ও তেজগাঁওয়ে অজ্ঞাত যুবকের মৃত্যু
গত মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে জুরাইনের ঋষিপাড়া সড়কে জমে থাকা বৃষ্টির পানিতে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে আনোয়ার হোসেন নামের এক বই ব্যবসায়ী মারা যান। শ্যালকের বাসায় কোরবানির পশু পৌঁছে দিয়ে ফেরার পথে বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে ছিঁড়ে পড়া তারের সংস্পর্শে এলে এই দুর্ঘটনা ঘটে। ঢামেক হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ছাড়া, ঈদুল আজহার দিন বৃহস্পতিবার দুপুরে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের প্রধান সড়ক থেকে অচেতন অবস্থায় আনুমানিক ৩৫ বছর বয়সী এক অজ্ঞাত যুবককে উদ্ধার করে পুলিশ। শেরেবাংলা নগরের শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার বিকেলে ওই যুবকের মৃত্যু হয়। তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার ওসি মুহম্মদ মাহবুবুর রহমান জানান, নিহতের পরিচয় ও মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করতে ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া চলছে।
📊 গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও পরিসংখ্যান
- মোট মৃত্যুর সংখ্যা: ০৮ জন (পাঁচ দিনের ব্যবধানে)।
- ঘটনার সময়কাল: ২৫ মে থেকে ২৯ vengeance মে ২০২৬ (ঈদুল আজহার ছুটির সময়)।
- মৃত্যুর ধরন: আত্মহত্যা/ঝুলন্ত লাশ (০৪ জন), বহুতল ভবন থেকে পতন (০১ জন), পানিতে ডুবা (০১ জন), বিদ্যুৎস্পৃষ্ট (০১ জন), অচেতন অবস্থায় উদ্ধার পরবর্তী মৃত্যু (০১ জন)।
- আইনি পদক্ষেপ: সংশ্লিষ্ট থানায় ০৮টি অপমৃত্যুর (ইউডি) মামলা দায়ের।
🔎 এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে
- নিশ্চিত তথ্য: আটটি মরদেহের সুরতহাল শেষে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল ও সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
- দুর্ঘটনার কারণ: বই ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেনের মৃত্যুটি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের অবহেলা ও ছিঁড়ে পড়া তারের কারণে হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
❓ যা এখনো স্পষ্ট নয়
- অজ্ঞাত যুবকের পরিচয়: তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা এলাকায় অচেতন অবস্থায় উদ্ধার হওয়া যুবকের নাম-পরিচয় বা বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
- আত্মহত্যার সুনির্দিষ্ট কারণ: দারুসসালামের দম্পতি এবং বসুন্ধরা সিটিতে শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনাগুলো আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হলেও, এর নেপথ্যের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো স্পষ্ট নয়।
🕵️ যা তদন্তাধীন
- ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন: প্রতিটি মৃত্যুর প্রকৃত কারণ (হত্যা নাকি আত্মহত্যা) নিশ্চিত করতে ফরেনসিক রিপোর্টের অপেক্ষা করছে পুলিশ।
- ডিজিটাল ফরেনসিক: বসুন্ধরা সিটিতে নিহত শিক্ষার্থীর ক্ষতিগ্রস্ত মোবাইল ফোন থেকে তথ্য উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
📌 তথ্যসূত্র:
- Official Sources: দারুসসালাম থানা, ভাটারা থানা, তেজগাঁও থানা এবং তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) আনুষ্ঠানিক বক্তব্য।
- Verified Local Media: প্রথম আলো ও হাসপাতাল পুলিশ বক্সের দৈনিক ইনজুরি রিপোর্ট।



