Homeটুডে নেশনপানির দামেও বিক্রি নেই কাঁচা চামড়া, অথচ জুতো-ব্যাগের দাম আকাশচুম্বী: সিন্ডিকেটের থাবায়...

পানির দামেও বিক্রি নেই কাঁচা চামড়া, অথচ জুতো-ব্যাগের দাম আকাশচুম্বী: সিন্ডিকেটের থাবায় ধুঁকছে দেশের চামড়া শিল্প

রাজধানীতে বড় গরুর চামড়া সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা, জেলাগুলোতে মাটিচাপা ও রাস্তায় অবর্জনা হিসেবে ফেলার হিড়িক; আড়তদার ও ট্যানারি মালিকদের সমন্বয়হীনতায় জাতীয় সম্পদের অপচয়

ঢাকা | ৩০ মে ২০২৬
পবিত্র ঈদুল আজহার কোরবানি শেষ হতে না হতেই বাংলাদেশের কাঁচা চামড়ার বাজারে এক নজিরবিহীন ধস ও চরম অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা পানির দরেও চামড়া বিক্রি করতে না পেরে তা রাস্তা, নদীর ধার ও খোলা জায়গায় স্তূপ করে ফেলে যাচ্ছেন। কোথাও আবার তীব্র দুর্গন্ধ ও চরম লোকসান এড়াতে চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলার মতো আত্মঘাতী ঘটনাও ঘটছে। অথচ এর বিপরীতে দেশের খুচরা বাজারে এক জোড়া ভালো মানের চামড়ার জুতো, বেল্ট বা লেদার ব্যাগ কিনতে সাধারণ ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে কয়েক হাজার টাকা। কাঁচা চামড়ার এই অবিশ্বাস্য দরপতন এবং তৈরি পণ্যের আকাশচুম্বী মূল্যের এই বৈপরীত্যের পেছনে একটি শক্তিশালী চক্র বা ‘সিন্ডিকেট’ কাজ করছে বলে অভিযোগ তুলেছেন সাধারণ মানুষ ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। কৃত্রিম উপায়ে দাম কমিয়ে চামড়া শিল্পকে অবদমিত করে রাখার এই ইকো-সিস্টেম নিয়ে মাঠপর্যায়ে তীব্র হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

📉 মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র: ঢাকা থেকে সাতক্ষীরা, সবখানেই হাহাকার

ঈদের পরদিন থেকেই দেশের প্রধান প্রধান চামড়া সংগ্রহকারী অঞ্চলগুলো থেকে কাঙ্ক্ষিত ক্রেতা না পাওয়ার খবর আসছে। মৌসুমি ব্যবসায়ী ও ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো (মাদ্রাসা ও এতিমখানা) কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন।

  • ঢাকা (পোস্তা): রাজধানীর কাঁচা চামড়ার প্রধান আড়ত পোস্তায় বড় ও ভালো মানের গরুর চামড়ার দাম সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা হাঁকছেন আড়তদাররা। চামড়ার কোনো অংশে সামান্য কাটা বা ছিদ্র থাকলে তার দাম নেমে যাচ্ছে মাত্র ১০০ থেকে ২০০ টাকায়, যা লবণ দেওয়া এবং পরিবহণ খরচের চেয়েও অনেক কম।
  • সাতক্ষীরা: জেলায় চামড়া কেনার মতো কোনো পাইকার না পাওয়ায় দুর্গন্ধ ও পচন থেকে বাঁচতে বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলেছেন সাধারণ মানুষ ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা।
  • চট্টগ্রাম: বন্দরনগরীর বিভিন্ন মোড়ে রাতভর অপেক্ষা করেও চামড়া বিক্রি করতে পারেননি ব্যবসায়ীরা। শেষ পর্যন্ত নিরুপায় হয়ে অনেকেই শহরের প্রধান প্রধান সড়কের পাশে চামড়া ফেলে রেখে চলে গেছেন। কেউ কেউ ক্ষোভে-হতাশায় নামমাত্র মূল্যে আড়তে চামড়া বাধ্য হয়ে দিয়ে গেছেন।
  • ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও সিরাজগঞ্জ: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর এবং সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলায় চামড়া কেনার জন্য কোনো বেপারি বা পাইকারের দেখাই মেলেনি। তীব্র রোদে ও গরমে চামড়া নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় অনেকে নামমাত্র মূল্যে তা বিক্রি করেছেন, আবার অনেকেই রাস্তার মোড়ে মোড়ে চামড়ার স্তূপ ফেলে রেখে প্রস্থান করেছেন।

🔍 কেন এই অবিশ্বাস্য মূল্য বৈষম্য? (কাঁচা চামড়া বনাম তৈরি পণ্য)

অপরাধবিজ্ঞান ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে চামড়া শিল্পের এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির পেছনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোগত কারণ ও সিন্ডিকেটের কারসাজি রয়েছে:
১. ট্যানারি মালিকদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ: দেশের চামড়া বাজারের মূল নিয়ন্ত্রণ মুষ্টিমেয় কিছু ট্যানারি মালিকের হাতে। সরকার প্রতিবছর একটি ন্যূনতম দাম নির্ধারণ করে দিলেও মাঠপর্যায়ে ট্যানারি মালিক ও আড়তদারদের সিন্ডিকেট সেই দামকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায়।
২. আড়তদারদের বকেয়া টাকা না পাওয়া: ঢাকার বাইরে জেলা পর্যায়ের আড়তদারদের অভিযোগ, বিগত বছরগুলোতে ট্যানারি মালিকদের কাছে তাদের কোটি কোটি টাকা বকেয়া পড়ে আছে। নতুন করে চামড়া কেনার জন্য ট্যানারিগুলো পর্যাপ্ত তহবিল বা ক্যাশ টাকা সরবরাহ না করায় পাইকাররা মাঠপর্যায়ে দাম কমিয়ে দিয়েছেন।
৩. লবণের উচ্চ মূল্য ও সংরক্ষণের অভাব: কাঁচা চামড়া সংগ্রহের পর দ্রুত লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করতে হয়। কিন্তু ঈদের সময়ে লবণের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়। ফলে চামড়া ধরে রাখার অর্থনৈতিক সক্ষমতা মৌসুমি ব্যবসায়ীদের থাকে না।
৪. ফিনিশড গুডসের মনোপলি বাজার: কাঁচা চামড়া পানির দরে কেনা হলেও তা প্রসেসিং বা প্রক্রিয়াজাতকরণের পর যখন জুতো বা ব্যাগ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়, তখন ব্র্যান্ডের শোরুমগুলো নিজস্ব মনোপলি (একচেটিয়া ব্যবসা) বজায় রাখে। প্রক্রিয়াকরণ খরচ, কারখানার আধুনিকায়ন এবং উচ্চ করের অজুহাতে জুতো-বেল্টের দাম প্রতিবছর বাড়ানো হলেও তার সুফল কাঁচা চামড়ার উৎপাদক বা কোরবানিদাতারা পান না।

📊 চামড়া বাজারের প্রাইস প্যারাডক্স (মে ২০২৬)

খাতের বিবরণবাজার মূল্য (আনুমানিক)বর্তমান পরিস্থিতি ও মন্তব্য
বড় গরুর কাঁচা চামড়া৳৪০০ — ৳৫০০ (প্রতি পিস)সিন্ডিকেটের কারণে মূল্যের চরম ধস।
ক্ষতিগ্রস্ত/কাটা চামড়া৳১০০ — ৳২০০ (প্রতি পিস)পরিবহণ ও লবণ খরচের চেয়েও কম দাম।
১ জোড়া চামড়ার জুতো (ব্র্যান্ডড)৳৩,৫০০ — ৳৮,০০০+খুচরা বাজারে বহাল তবিয়তে চড়া দাম।
১টি চামড়ার লেদার ব্যাগ/বেল্ট৳১,৫০০ — ৳৫,০০০+আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বাজারে উচ্চ চাহিদা।

💬 “এটি জাতীয় সম্পদের অপচয়” — অফিশিয়াল ও বিশেষজ্ঞ বক্তব্য

কাঁচা চামড়া অবিক্রীত থেকে নষ্ট হওয়া বা মাটিতে পুঁতে ফেলার ঘটনাকে দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

“চামড়া আমাদের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদ। এভাবে চামড়া অবিক্রীত থাকা বা লোকসান ও দুর্গন্ধের কারণে মাটিতে পুঁতে ফেলা অত্যন্ত দুঃখজনক। চামড়া সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে স্থানীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত লবণের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং দ্রুত ট্যানারি মালিকদের সঙ্গে জেলা পর্যায়ের আড়তদারদের বকেয়া টাকা পরিশোধ ও সমন্বয় করা জরুরি।”
ডা. এফ এম মান্নান কবীর, জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, সাতক্ষীরা

বাংলাদেশ চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির একাংশের মতে, সরকার যদি কাঁচা চামড়া সরাসরি বিদেশে রপ্তানির অনুমতি সাময়িকভাবে না দেয়, তবে এই সিন্ডিকেটের থাবা থেকে সাধারণ মৌসুমি ব্যবসায়ীদের বাঁচানো সম্ভব নয়। স্থানীয় বাজারে প্রতিযোগিতা না থাকায় ট্যানারি মালিকরা প্রতিবছরই এই সুযোগ নেন।

⚠ Quick Facts

  • ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান: সিরাজগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও সাতক্ষীরায় সঠিক সময়ে ক্রেতা না পাওয়ায় এবং লবণের অভাবের কারণে আনুমানিক ১৫-২০% কাঁচা চামড়া নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
  • সিন্ডিকেটের কারসাজি: আড়তদারদের একাংশের দাবি, ট্যানারিগুলো ইচ্ছে করেই ঈদের প্রথম দুই দিন বাজারে কোনো তহবিল ছাড়েনি, যাতে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা কম দামে চামড়া ফেলে দিতে বাধ্য হন।
  • বিকল্প সংকট: দেশের মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলোর আয়ের একটি বড় অংশ আসে কোরবানির চামড়া থেকে। চামড়ার মূল্য না পাওয়ায় এবার এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সামাজিক ও দাতব্য ফান্ড বড় ধরনের সংকটে পড়বে।

📋 বর্তমান অবস্থা ও পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপ

চামড়া বাজারের এই চরম বিপর্যয় ঠেকাতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (BTA) জরুরি বৈঠক ডেকেছে। সরকারিভাবে মাঠপর্যায়ে লবণযুক্ত চামড়া দ্রুত ঢাকায় নিয়ে আসার জন্য পরিবহণ ও সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে কাঁচা চামড়া অবৈধ পথে পাচার না হয়ে যায়। তবে মাঠপর্যায়ের চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, চামড়া নষ্ট হওয়ার পর প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়ে কোনো লাভ হবে না; স্থায়ী সমাধানের জন্য ট্যানারিগুলোর একচেটিয়া আধিপত্য ভেঙে জেলা পর্যায়ে আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ বা সংরক্ষণাগার গড়ে তুলতে হবে।

📌 তথ্যসূত্র:

  • জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (DLO) অফিসিয়াল স্টেটমেন্ট
  • বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (BTA) ও পোস্তা চামড়া আড়তদার সমিতি ডায়েরি
  • দেশের প্রধান প্রধান বাণিজ্যিক হাবের অন-গ্রাউন্ড তথ্য (মে ২০২৬)
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular