Homeটুডে নেশনরামিসা হত্যা: দ্রুত বিচার দাবিতে উত্তাল মিরপুর, সুশীল সমাজ ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত...

রামিসা হত্যা: দ্রুত বিচার দাবিতে উত্তাল মিরপুর, সুশীল সমাজ ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ

ঢাকা | ২২ মে ২০২৬ রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর খণ্ডিত করে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও বিচার দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজধানী। আজ শুক্রবার জুমার নামাজের পর থেকেই মিরপুর ও গুলশান এলাকায় বিশাল মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছে সর্বস্তরের জনগণ। ঘটনার দ্রুত বিচার এবং দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির দাবিতে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে।

মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর অবরুদ্ধ, থমকে গেছে যান চলাচল

আজ বেলা পৌনে তিনটা থেকে ‘এলাকাবাসীর ব্যানারে’ কয়েক শত মানুষ মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। বিক্ষোভকারীদের মধ্যে স্থানীয় সাধারণ মানুষ, বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকদের দেখা গেছে। বিক্ষোভের কারণে মিরপুর রোডের গুরুত্বপূর্ণ এই মোড়ে সব ধরনের যান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।

এর আগে বেলা সোয়া দুইটা থেকে শিশুটির বাসার কাছে বি-১১ সমাজকল্যাণ যুব সংগঠন এবং নিহত শিশুটির স্কুলের শিক্ষক ও সহপাঠীরা মানববন্ধনের আয়োজন করে। মিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাফিজুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাজ করছে।

প্রধানমন্ত্রীর সান্ত্বনা ও গুলশান সোসাইটির প্রতিবাদ

ঘটনার সংবেদনশীলতা বিবেচনায় গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে নিহত শিশুটির পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে তাদের পল্লবীর বাসায় যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সান্ত্বনা দেন এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও কঠোর বিচার নিশ্চিত করার দৃঢ় আশ্বাস দেন।

এদিকে আজ সকালে রাজধানীর গুলশান-২ গোলচত্বরে গুলশান সোসাইটির উদ্যোগে এক বিশাল মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। সংগঠনের মহাসচিব মজিবুর রহমান মৃধার নেতৃত্বে এতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সংহতি জানান। মানববন্ধনে মজিবুর রহমান বলেন, “এই জঘন্য অপরাধের বিচার নিয়ে আমরা দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকতে রাজি নই। বিচার বিলম্বিত হলে সমাজে অপরাধপ্রবণতা আরও বাড়বে।”

“শুধু ফাঁসি বা হুজুগে সমাধান নয়, প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার”

পল্লবীর এই রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের পর সামাজিক ও আইনি অঙ্গনে যখন তীব্র ক্ষোভ চলছে, তখন ভিন্ন এক গঠনমূলক ও নীতিনির্ধারণী বিশ্লেষণ নিয়ে সামনে এসেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বড় মেয়ে তথা সমাজ গবেষক ড. শামারুহ মির্জা। ঢাকা বার বা আইনজীবী সমিতির কোনো কোনো নেতার ‘আসামির পক্ষে আইনি লড়াই না করার’ আবেগীয় সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে তিনি আজ এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন:

“কোনো আইনজীবী ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে বলতে পারে সে লড়াই করবে না, কিন্তু কোনো বার (আইনজীবী সমিতি) প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এটা বলতে পারে না। অপরাধী যত জঘন্যই হোক, আইনি প্রক্রিয়া এবং তার নিরাপত্তার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।”

মব জাস্টিস বা গণপিটুনির সংস্কৃতির বিরোধিতা করে তিনি বলেন, কেবল আবেগ বা হুজুগে মাতলে এই সামাজিক ব্যাধি দূর হবে না। ক্যানসারের চিকিৎসায় যেমন কেমো, সার্জারি ও রেডিয়েশন একসাথে লাগে—ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতন রুখতেও রাষ্ট্রকে বহুমুখী ও দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ নিতে হবে।

ড. শামারুহ মির্জার প্রস্তাবিত সুপারিশমালা:

  • পেডোফিলিয়াকে আলাদা অপরাধের ক্যাটাগরিভুক্ত করে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার করা।
  • পেডোফাইল বা শিশু নির্যাতনকারী শনাক্তকরণে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ পুলিশের বিশেষায়িত ‘সাইবার সিকিউরিটি টিম’ গঠন।
  • দেশের সকল আবাসিক ও অনাবাসিক মাদ্রাসাগুলোকে কঠোর সরকারি রেগুলেশন ও নজরদারির মধ্যে আনা।
  • ১৬ বছরের নিচে শিশুদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে আইনি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর এবং পর্নোগ্রাফি সম্পূর্ণ বন্ধ করা।
  • মাদক নির্মূল ও সিসা (Lead) এক্সপোজার কমানো এবং স্কুল-কলেজে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের নিয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক ওয়ার্কশপ করা।

তিনি আরও যোগ করেন, বিগত ১৭ বছর ধরে বিদায়ী হাসিনা রেজিম বিরোধী দল দমন, গুম ও খুনের রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত থাকায় দেশের সামাজিক সুরক্ষার এই বুনিয়াদগুলো ধসে পড়েছে। তবে বর্তমান প্রশাসনের অধীনে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন এবং তরুণ সমাজকে কোনো ধরণের ‘মব’ বা বিশৃঙ্খলায় না জড়িয়ে প্রকৃত রাজনীতি করার আহ্বান জানান।

মামলার বর্তমান অবস্থা

গত মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পল্লবীর একটি ফ্ল্যাট থেকে সাত বছরের ওই শিশুর খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার প্রধান অভিযুক্ত মূল হত্যাকারী সোহেল রানা গত বুধবার আদালতে হাজির হয়ে নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে তিনি স্বীকার করেন যে, শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ খণ্ডবিখণ্ড করার চেষ্টা করেছিলেন। বর্তমানে সোহেল রানা ও তার সহযোগী স্ত্রী স্বপ্না আক্তার কারাগারে রয়েছেন। এর আগে গতকাল আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ডিএমপি কমিশনারকে এক সপ্তাহের মধ্যে এই মামলার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, যুগান্তর ও ডিএমপি মিরপুর বিভাগ

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular