চলতি বছরে সন্দেহভাজন রোগী ১ লাখ ৭৮ হাজার ৬৬৬, পরীক্ষায় নিশ্চিত সংক্রমণ ২০ হাজার ৪৭৪
দেশে হাম পরিস্থিতি এখনো গুরুতর। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৯ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হাম-সদৃশ উপসর্গে আরও পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এতে চলতি বছরে নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন হাম-সংক্রান্ত মৃত্যুর সম্মিলিত সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫৩।
এর মধ্যে ৯৫২টি মৃত্যুকে সন্দেহভাজন হাম-সংক্রান্ত এবং ১০১টি মৃত্যুকে পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম-সংক্রান্ত হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। অর্থাৎ ১ হাজার ৫৩ সংখ্যাটি পুরোপুরি পরীক্ষায় নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যু নয়; এর বড় অংশ হাম-সদৃশ উপসর্গের সঙ্গে সম্পর্কিত সন্দেহভাজন মৃত্যু। এই পার্থক্যটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন রোগী বাড়ছে
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় দেশে ৯৪১টি নতুন সন্দেহভাজন হাম মামলা বা কেস শনাক্ত হয়েছে। এতে চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে মোট সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৭৮ হাজার ৬৬৬। একই সময়ে ৭৯টি নতুন পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম সংক্রমণ পাওয়া গেছে। ফলে ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত সংক্রমণের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৪৭৪।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম বা হাম-সদৃশ উপসর্গ নিয়ে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৫৫৬ জন ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ১ লাখ ৫১ হাজার ৩৯৫ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন।
অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক মানুষ হাসপাতালে চিকিৎসা নিলেও নতুন রোগী ও মৃত্যু পুরোপুরি থামেনি। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে গুরুতর অসুস্থতার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
টিকাদানের ঘাটতি বড় কারণ
রয়টার্সের ৯ সেপ্টেম্বরের বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশে এবারের হাম সংক্রমণ দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় হাম প্রাদুর্ভাবের পর্যায়ে পৌঁছেছে। ওই সময় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ও বিশেষজ্ঞরা নিয়মিত টিকাদান ব্যাহত হওয়া, টিকা সরবরাহে সমস্যা এবং শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতিকে সংক্রমণ বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে নানা ধরনের বিঘ্ন ঘটে। বিশেষ করে যেসব শিশু বয়সের কারণে নিয়মিত টিকার সময়সূচির বাইরে ছিল, তাদের একটি অংশও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। এপ্রিল থেকে জরুরি টিকা কর্মসূচি নেওয়া হলেও দীর্ঘ সময়ের টিকাদান ঘাটতি পূরণ করতে সময় লাগছে।
আল জাজিরার বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, এপ্রিল থেকে দেশে ২ কোটি ডোজের বেশি টিকা দেওয়া হলেও আগের টিকাদান ব্যর্থতার প্রভাব পুরোপুরি কাটেনি।
হাসপাতালে চাপ বাড়ছে
বাংলাদেশে হাম ও ডেঙ্গু—দুটি রোগের সংক্রমণ একই সময়ে চলায় হাসপাতালগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালের রোগীর চাপ, শয্যা ঘাটতি ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা উপকরণ ব্যবস্থাপনার সমস্যার কথা উঠে এসেছে।
শিশুদের মধ্যে হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে ফুসকুড়ি হাম-এর সাধারণ লক্ষণের মধ্যে পড়ে। তবে গুরুতর ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, পানিশূন্যতা ও অন্যান্য জটিলতা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।
সামনে প্রধান কাজ টিকাদান ও শনাক্তকরণ
হাম নিয়ন্ত্রণে টিকাদান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। আক্রান্ত শিশুকে দ্রুত শনাক্ত করে অন্যদের থেকে আলাদা রাখা, পরিবারের সদস্যদের সতর্ক করা এবং টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশুদের টিকা নিশ্চিত করা—এই তিনটি দিক একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দৈনিক পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, প্রাদুর্ভাব কয়েক মাস ধরে চলার পরও নতুন রোগী ও মৃত্যু এখনো হচ্ছে। তাই শুধু হাসপাতালকেন্দ্রিক চিকিৎসা নয়, স্থানীয় পর্যায়ে টিকাদান, রোগ শনাক্তকরণ ও সংক্রমণ প্রতিরোধের কাজও একই সঙ্গে জোরদার করা প্রয়োজন।
তথ্যসূত্র: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, বিডিনিউজ২৪, রয়টার্স, আল জাজিরা।




