চিকিৎসা পেশা কি কেবল রোগ নিরাময়ের মাধ্যম? নাকি তার চেয়েও গভীর কোনো সম্পর্কের ভিত্তি? অধ্যাপক ডাক্তার শিলা সেন-এর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গল্পটি আমাদের শেখায়—হৃদয় দিয়ে রোগী দেখলে কেবল সফল চিকিৎসক হওয়াই যায় না, বরং মানুষের আপনজন হয়ে ওঠার মতো অমূল্য প্রাপ্তিও সম্ভব। রক্তের সম্পর্কের চেয়েও যে ভালোবাসার সম্পর্ক বড় হতে পারে, তার এক জীবন্ত দলিল অধ্যাপক ডাক্তার শিলা সেন ও তাঁর দীর্ঘদিনের রোগী শহিদুল ইসলামের এই যাত্রা।
৩০ বছরের এক অনন্য পথচলা
প্রায় ২৫-৩০ বছর আগে থানার ঘাটের একটি ছোট চেম্বারে চিকিৎসাজীবন শুরু করেছিলেন অধ্যাপক ডাক্তার শিলা সেন। সেই সাধারণ এক দিনে পরিচয় হয়েছিল শহিদুল ইসলামের সঙ্গে, যিনি তাঁর স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য নিয়মিত ডাক্তারের কাছে আসতেন। সময়ের স্রোতে সেই রোগী-চিকিৎসকের পেশাদার সম্পর্কটি কবে যে অটুট ভাই-বোনের সম্পর্কে রূপ নিয়েছে, তা তাঁদের নিজেদেরও অজানা। শহিদুলের তিন মেয়ে ও দুই ছেলের জন্ম হয়েছিল অধ্যাপক ডাক্তার শিলা সেন-এরই পরম তত্ত্বাবধানে।
সাফল্যের চূড়ায় থেকেও মাটির মানুষ
আল্লাহর রহমতে আজ শহিদুল ইসলামের জীবনে এসেছে অঢেল সফলতা; শম্ভুগঞ্জে নিজস্ব বাড়ি, পাঁচতলা বাণিজ্যিক ভবন ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি। তবে এত পার্থিব উন্নতির পরও তাঁর বিনয় ও মানুষের প্রতি ভালোবাসার এতটুকু পরিবর্তন হয়নি; সেই ৩০ বছর আগের সরল মানুষটিই আজও টিকে আছেন তাঁর ভেতর।
সংগ্রামের দিনে অধ্যাপক ডাক্তার শিলা সেন-এর ভূমিকা
এই পরিবারের জীবনে আনন্দের পাশাপাশি ছিল গভীর কালো মেঘ। শহিদুল ইসলামের বড় মেয়ের এপিলেপসি ছিল এবং বিয়ের পর সন্তান ধারণের চেষ্টায় তাকে পাঁচবার গর্ভপাতের মতো নিষ্ঠুর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল। ভাই হিসেবে শহিদুল ইসলাম যেমন চিন্তিত ছিলেন, অধ্যাপক ডাক্তার শিলা সেনও একজন অভিভাবকের মতো উদ্বিগ্ন ছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত তাঁর নিবিড় তত্ত্বাবধানেই সেই জটিল প্রসব সম্ভব হয়েছে এবং সব প্রতিকূলতাকে হারিয়ে আজ সেই জমজ দুই কন্যাশিশু সুস্থভাবে বেড়ে উঠছে।
হজের ফেরা ও হৃদয়ের উপহার
কয়েকদিন আগে হজ পালন করে দেশে ফিরে শহিদুল ইসলাম অধ্যাপক ডাক্তার শিলা সেন-এর জন্য জমজমের পানি, খেজুর ও কাপড় উপহার হিসেবে নিয়ে এসেছিলেন। তবে সব উপহারকে ছাপিয়ে গিয়েছিল তাঁর হৃদয়ের একটি কথা। অধ্যাপক ডাক্তার শিলা সেন-এর মাথায় হাত রেখে তিনি অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, “দিদি, আমি কাবা শরীফে আপনার জন্য দোয়া করেছি। আপনার জন্যই আজ আমাদের পরিবার পূর্ণতা পেয়েছে।” এই আবেগঘন মুহূর্তটি প্রমাণ করে, সম্মান অর্জনের জন্য কেবল অর্থ নয়, প্রয়োজন বিশ্বাস ও আন্তরিকতা।
উপসংহার: চিকিৎসকের আসল প্রাপ্তি
অধ্যাপক ডাক্তার শিলা সেন-এর উপলব্ধি—চিকিৎসকের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি শুধু সফল অপারেশন বা প্রেসক্রিপশন নয়, বরং মানুষের হৃদয়ে আপনজন হয়ে বেঁচে থাকা। এখানে ধর্মের ভেদাভেদ, সামাজিক অবস্থানের পার্থক্য কিংবা ধনী-গরিবের কোনো বিভাজন নেই; ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর মানবিকতাই যে মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়, তা অধ্যাপক ডাক্তার শিলা সেন ও শহিদুল ইসলামের এই সম্পর্ক আমাদের নতুন করে মনে করিয়ে দেয়।
তথ্যসূত্র:
- ব্যবহারকারীর ফেসবুক বার্তা (ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বিবরণ)।



