বিধিবহির্ভূত নিয়োগের অভিযোগে আজীবন পদ প্রত্যাহার; বেতন-ভাতা ফেরতের নির্দেশ, প্রশ্নের মুখে প্রশাসনিক দায় ও নীতিগত প্রক্রিয়া
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
২৬ জুন ২০২৬
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে আজীবন মেয়াদে দেওয়া অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহর নিয়োগ বাতিল করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে ওই পদের বিপরীতে তিনি যে বেতন-ভাতা উত্তোলন করেছেন, তা ফেরত দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্তটিকে “বিধিবহির্ভূত নিয়োগ সংশোধনের পদক্ষেপ” হিসেবে ব্যাখ্যা করা হলেও, ডা. আবদুল্লাহ এটিকে “অন্যায় ও অপমানজনক” বলে আখ্যা দিয়েছেন।
এই ঘটনাকে ঘিরে শুধু একজন চিকিৎসকের ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক জবাবদিহিতা, সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং সম্মানসূচক পদ প্রদানের নীতিমালাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. মো. মোস্তফা কামাল স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে এ সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়।
🔎 কেন বাতিল হলো নিয়োগ?
বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিস আদেশ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২০ জুন অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেটের ৯২তম বাজেট অধিবেশন সভায় আলোচ্যসূচির বাইরে একজন সদস্যের প্রস্তাবের ভিত্তিতে ‘ইমেরিটাস অধ্যাপক নিয়োগ অধ্যাদেশ’ সংশোধন করা হয়। একই সভায় ডা. এ বি এম আবদুল্লাহকে আজীবন মেয়াদে ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে পুনরায় নিয়োগ দেওয়া হয়।
তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, পুরো প্রক্রিয়াটি নির্ধারিত প্রশাসনিক নীতিমালা অনুসরণ করেনি। আলোচ্যসূচির বাইরে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বৈধ নয় বলেই ২০২৬ সালের ১৩ জুন অনুষ্ঠিত ৯৯তম সিন্ডিকেট সভায় নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
একই সঙ্গে ২০২৪ সালের ২০ জুন থেকে উত্তোলিত সব বেতন-ভাতা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
📅 কীভাবে ঘটল পুরো প্রক্রিয়া?
| তারিখ | ঘটনা |
|---|---|
| ২০ জুন ২০২৪ | ৯২তম সিন্ডিকেট সভায় আলোচ্যসূচির বাইরে অধ্যাদেশ সংশোধন |
| ২০ জুন ২০২৪ | ডা. এ বি এম আবদুল্লাহকে আজীবন ইমেরিটাস অধ্যাপক নিয়োগ |
| ১৩ জুন ২০২৬ | ৯৯তম সিন্ডিকেট সভায় নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্ত |
| ২৬ জুন ২০২৬ | অফিস আদেশে নিয়োগ বাতিল ও বেতন-ভাতা ফেরতের নির্দেশ |
💬 ক্ষুব্ধ ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ
বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ।
তিনি বলেন,
“বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যেটা করেছে, অন্যায় করেছে। আমার ওপর অবিচার করেছে। পৃথিবীর ইতিহাসে কোথাও এভাবে একটি সম্মানজনক পদ ছিনিয়ে নেওয়ার নজির নেই।”
তবে এই বক্তব্য তার ব্যক্তিগত মতামত ও প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিবেচ্য; এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত কোনো তথ্য সামনে আসেনি।
৫০ বছরের চিকিৎসাজীবনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেন,
“আমার ছাত্ররা আজ স্বনামখ্যাত অধ্যাপক। জীবনের শেষ সময়ে এসে এমন আচরণ আমাকে সামাজিকভাবে অপমানিত করেছে।”
তিনি জানান, কর্মজীবনে তিনি ১৪-১৫টি আন্তর্জাতিক ও একাডেমিক স্বীকৃতি পেয়েছেন। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একুশে পদক লাভ করেছেন। আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের বহুল ব্যবহৃত গ্রন্থ ডেভিডসন এবং কুমার অ্যান্ড ক্লার্ক-এর আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা বোর্ডের সঙ্গেও তিনি দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন।
⚖️ বিশ্লেষণ: প্রশাসনিক দায় কার?
ঘটনাটি এখন একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে—কোনো নিয়োগ যদি বিধিবহির্ভূত হয়ে থাকে, তাহলে সেই দায় কার?
প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ব্যক্তি যদি প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত হন, তাহলে নিয়োগের বৈধতা যাচাইয়ের মূল দায়িত্ব থাকে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, সিন্ডিকেট বা নীতিনির্ধারণী কর্তৃপক্ষের ওপর।
সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠছে:
• যদি নিয়োগে অনিয়ম হয়ে থাকে, তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি?
• বেতন-ভাতা ফেরতের পুরো দায় কি কেবল নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তির ওপর বর্তাবে?
• নীতিমালা সংশোধনের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া কতটা অনুসরণ করা হয়েছিল?
• ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা এড়াতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে?
📉 বৃহত্তর প্রভাব: শুধু একজন চিকিৎসকের বিষয় নয়
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা কেবল একটি নিয়োগ বাতিলের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং সম্মানসূচক পদগুলোর স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইমেরিটাস অধ্যাপক পদ সাধারণত বিশেষ অবদান ও দীর্ঘ কর্মজীবনের স্বীকৃতি হিসেবে দেওয়া হয়। ফলে এ ধরনের পদ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে তা প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি, নীতিগত স্বচ্ছতা এবং প্রশাসনিক বিশ্বাসযোগ্যতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
🔮 সামনে কী?
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অতিরিক্ত কোনো ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, বিষয়টি প্রশাসনিক ও আইনি—দুই পর্যায়েই নতুন মোড় নিতে পারে।
কারণ প্রশ্নটি এখন আর শুধু “নিয়োগ বাতিল হলো কেন”—সেটিতে সীমাবদ্ধ নেই; বরং প্রশ্ন হচ্ছে—
“যদি প্রক্রিয়ায় ত্রুটি থেকে থাকে, তাহলে তার দায় ব্যক্তি বহন করবেন, নাকি প্রতিষ্ঠান?”



