নির্বাচনপ্রক্রিয়া, কমিটির গঠন ও অর্থায়নের হিসাব প্রকাশের দাবি চলচ্চিত্র সংসদ নেতাদের; অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত চান সংশ্লিষ্টরা
শোবিজ টুডে ডেস্ক
অস্কারের ৯৯তম আসরে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী চলচ্চিত্র নির্বাচন ঘিরে অনিয়ম, অস্বচ্ছতা ও সাংগঠনিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। চলচ্চিত্র নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় সদস্য সংগঠনগুলোর অংশগ্রহণ, কমিটির গঠন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি এবং অর্থায়নের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন চলচ্চিত্র সংসদ-সংশ্লিষ্ট কয়েকজন নেতা। তাঁদের দাবি, বাংলাদেশের হয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অংশ নেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র প্রকাশেরও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর রাজধানীর হোটেল প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘রইদ’ চলচ্চিত্রকে অস্কারের আন্তর্জাতিক ফিচার ফিল্ম বিভাগে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। মেজবাউর রহমান সুমন পরিচালিত ছবিটি পাঁচটি জমা পড়া চলচ্চিত্রের মধ্য থেকে নির্বাচিত হয়। তবে নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট সংগঠনuগুলোর সম্পৃক্ততা এবং সাংগঠনিক স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে আপত্তি তুলেছেন বাংলাদেশ ফিল্ম সোসাইটিজ ফেডারেশনের সভাপতি বড়ুয়া মনোজিত ধীমন ও সাধারণ সম্পাদক সায়মান তারেক।
নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন
বড়ুয়া মনোজিত ধীমনের অভিযোগ, বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজের নেতৃত্ব ও কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তাঁর দাবি, চলচ্চিত্র সংসদ ও ফিল্ম ক্লাবগুলোর সঙ্গে যথাযথ আলোচনা ছাড়াই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। অস্কারের জন্য চলচ্চিত্র নির্বাচনের মতো মর্যাদাপূর্ণ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর অংশগ্রহণ ও মতামত নিশ্চিত করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
ধীমন বলেন, চলচ্চিত্র নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা কিংবা অস্বচ্ছতা গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর ভাষ্য, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ না রেখে যোগ্যতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে চলচ্চিত্র নির্বাচন করতে হবে। অতীতের অনিয়মের অভিযোগ থাকলে সেগুলোও নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখার দাবি জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনে গণতান্ত্রিক চর্চা ও সাংগঠনিক স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। ফেডারেশনের কার্যক্রমে অনিয়ম হয়ে থাকলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপও প্রত্যাশা করেন তিনি।
রাজনৈতিক প্রভাব ও সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ
বাংলাদেশ ফিল্ম সোসাইটিজ ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক সায়মান তারেক অভিযোগ করেছেন, বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজের নেতৃত্ব ও কার্যক্রমে অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব ছিল। তাঁর দাবি, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও চলচ্চিত্র সংসদ-সংশ্লিষ্ট কিছু সংগঠনের নেতৃত্ব ও কাঠামোতে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি। তিনি বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরামের নেতৃত্ব ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
সায়মান তারেক বলেন, অস্কারে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র পাঠানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নির্বাচনপ্রক্রিয়া নিয়ে তাঁদের আপত্তি সংশ্লিষ্ট অস্কার কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরার পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, সংগঠন দখল কিংবা আর্থিক অনিয়মের এসব অভিযোগের পক্ষে কী কী নথিপত্র বা প্রমাণ রয়েছে, তা অভিযোগকারীদের বক্তব্যে বিস্তারিতভাবে উঠে আসেনি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি, আর্থিক হিসাব ও উভয় পক্ষের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলন ও অর্থায়ন নিয়ে ব্যাখ্যা দাবি
চলচ্চিত্র সংসদ-সংশ্লিষ্ট অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, অস্কার কমিটি গঠন, চলচ্চিত্র আহ্বান ও নির্বাচনপ্রক্রিয়া নিয়ে সদস্য সংগঠনগুলোকে কীভাবে অবহিত করা হয়েছে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁদের অংশগ্রহণের সুযোগ কতটা ছিল। তাঁদের দাবি, নিয়মিত মতবিনিময়, সদস্য সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিত্ব এবং কার্যক্রমের হিসাব প্রকাশের মাধ্যমে সাংগঠনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
হোটেল সোনারগাঁওয়ে সংবাদ সম্মেলন আয়োজনের ব্যয় কোন উৎস থেকে এসেছে, সে বিষয়েও স্বচ্ছ ব্যাখ্যা চেয়েছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের মতে, নির্বাচনপ্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আয়-ব্যয়, অর্থায়নের উৎস এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করা হলে এ বিষয়ে তৈরি হওয়া প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সহজ হবে।
তবে বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজের প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে ৯৯তম অস্কারের জন্য চলচ্চিত্র আহ্বান, যোগ্যতার শর্ত, জমা দেওয়ার সময়সীমা এবং ২৭ সেপ্টেম্বর নির্বাচিত ছবির নাম ঘোষণার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ ছিল। সংস্থাটির ওয়েবসাইটে ৬ আগস্ট কমিটি গঠন এবং ২০ আগস্ট চলচ্চিত্র জমা দেওয়ার আহ্বানসংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশিত হয়। ফলে প্রক্রিয়াটির কিছু তথ্য প্রকাশ্যে থাকলেও অভিযোগকারীরা সদস্য সংগঠনগুলোকে যথাযথভাবে অবহিত করা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে যে প্রশ্ন তুলেছেন, সেগুলোর স্বতন্ত্র ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
কমিটির গঠন ও সিদ্ধান্তের নথি প্রকাশের দাবি
অস্কার বাংলাদেশ কমিটির গঠন নিয়ে প্রকাশিত তথ্যেও একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। কমিটি গঠনসংক্রান্ত প্রাথমিক বিজ্ঞপ্তিতে সাত সদস্যের কমিটির কথা বলা হয়েছিল। অন্যদিকে, ২৭ সেপ্টেম্বর চলচ্চিত্র নির্বাচনের বিষয়ে ইউএনবির প্রতিবেদনে কমিটিকে ছয় সদস্যের বলা হয়েছে। এ পার্থক্যের কারণ কী, চূড়ান্তভাবে কতজন সদস্য নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া কী ছিল—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কমিটির স্পষ্ট ব্যাখ্যা স্বচ্ছতা বাড়াতে পারে।
অস্কার বাংলাদেশ কমিটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এ বছর পাঁচটি চলচ্চিত্র জমা পড়েছিল। ছবিগুলো হলো—রেদওয়ান রনির ‘দম’, মেজবাউর রহমান সুমনের ‘রইদ’, নুরুল আলম আতিকের ‘মানুষের বাগান’, মোহাম্মদ তাওকীর ইসলামের ‘দেলুপি’ এবং মনিরুল আকাশ হকের ‘দ্য ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল’। পরে ‘মানুষের বাগান’ প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়ালে বাকি চারটি ছবির মধ্য থেকে ‘রইদ’ নির্বাচন করা হয় বলে ইউএনবির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট চলচ্চিত্র সংসদ নেতাদের দাবি, কমিটির সদস্যদের তালিকা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের নীতিমালা, মূল্যায়নপ্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক ব্যবস্থাপনার তথ্য সহজে যাচাই করার সুযোগ থাকা উচিত। এতে নির্বাচনপ্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে এবং ভবিষ্যতে বিতর্কের অবকাশ কমবে।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
চলচ্চিত্র সংসদ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, অস্কারের মতো আন্তর্জাতিক মর্যাদাপূর্ণ আসরে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী চলচ্চিত্র নির্বাচন শুধু একটি সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নয়; এর সঙ্গে দেশের চলচ্চিত্রশিল্পের মর্যাদা ও আন্তর্জাতিক পরিচিতিও জড়িত। তাই এ প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ, যোগ্যতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন, স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
অভিযোগকারীরা বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজের কার্যক্রম, অস্কার বাংলাদেশ কমিটির গঠন, সদস্য সংগঠনগুলোর অংশগ্রহণ এবং অর্থায়নের উৎস নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পরীক্ষা এবং অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত—উভয় পক্ষের বক্তব্য গ্রহণের মাধ্যমে প্রকৃত অবস্থা পরিষ্কার করা সম্ভব।
চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নির্বাচনপ্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা বজায় রাখতে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পথ।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজের প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি




