বাংলা একাডেমির ‘জুলাই এখন’ কবিতা পাঠ অনুষ্ঠানে মঞ্চে উঠে কবির মাইক কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ; পাল্টা বলছে শ্রমিক শক্তি—কবিতা পাঠ শেষ পর্যন্ত সম্পন্ন হয়েছে
বাংলা একাডেমির শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে আয়োজিত “জুলাই এখন” শীর্ষক স্বরচিত কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে কবি মোহন রায়হানকে ঘিরে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কবিতা পাঠ চলাকালে এনসিপির শ্রমিক সংগঠন শ্রমিক শক্তি-র কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক আহমেদ ইসহাক মঞ্চে উঠে তাঁর হাত থেকে মাইক নিয়ে তাঁকে “অবাঞ্ছিত” ঘোষণা করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
কী ঘটেছিল?
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা এবং প্রকাশিত ভিডিও অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে লেখা একটি কবিতা পাঠ করছিলেন মোহন রায়হান। পাঠের একপর্যায়ে আহমেদ ইসহাক মঞ্চে উঠে আপত্তি জানান এবং কবিতাটিকে জুলাই আন্দোলনের চেতনার পরিপন্থী বলে দাবি করেন। এ সময় সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং অনুষ্ঠান কিছু সময়ের জন্য বিঘ্নিত হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করছিলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। আয়োজকদের হস্তক্ষেপের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
মোহন রায়হানের বক্তব্য
ঘটনার পর সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় মোহন রায়হান বলেন, তাঁর কবিতাটি জুলাই আন্দোলনের বিরুদ্ধে নয়; বরং আন্দোলনের নামে যারা ব্যক্তিস্বার্থ, রাজনৈতিক সুবিধা বা ব্যবসা করছে, তাদের সমালোচনা করেই কবিতাটি লেখা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করানোর রাজনীতির সঙ্গে তিনি একমত নন। তাঁর অভিযোগ, কবিতার প্রকৃত বক্তব্য না বুঝেই এটিকে “জুলাইবিরোধী” হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।
আহমেদ ইসহাক যা বলছেন
অন্যদিকে শ্রমিক শক্তির যুগ্ম আহ্বায়ক আহমেদ ইসহাক বলেন, কবিতার কয়েকটি অংশকে তিনি জুলাই আন্দোলনের চেতনার পরিপন্থী মনে করেছেন। সে কারণেই তিনি প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
তবে তিনি শারীরিক হেনস্তার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি কাউকে মঞ্চ থেকে জোর করে নামিয়ে দেননি। তাঁর দাবি, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের হস্তক্ষেপের পর মোহন রায়হান শেষ পর্যন্ত কবিতা পাঠ সম্পন্ন করেন।
ঘটনাটি কেন আলোচনায়?
ঘটনাটি কেবল একজন কবিকে কেন্দ্র করে নয়; এটি দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ভিন্নমত গ্রহণের সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে হস্তক্ষেপের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। এক পক্ষ বলছে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় কবিকে বাধা দেওয়া উচিত হয়নি। অন্যদিকে আরেক পক্ষের দাবি, জুলাই আন্দোলন নিয়ে কোনো বক্তব্য যদি আন্দোলনের চেতনার বিরুদ্ধে যায়, তাহলে প্রতিবাদ জানানো নাগরিকদের অধিকার।
প্রেক্ষাপট
মোহন রায়হানকে ঘিরে এটি প্রথম বিতর্ক নয়। চলতি বছরের বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ঘোষণার সময়ও তাঁকে নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। প্রথমে পুরস্কার নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও পরে সরকার তাঁর পুরস্কার বহাল রাখার সিদ্ধান্ত জানায়। সেই বিতর্কের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার বাংলা একাডেমির মঞ্চে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিল এই ঘটনা।
নাগরিক দর্পণ | বিশ্লেষণ
গণতান্ত্রিক সমাজে সাহিত্য, কবিতা ও সংস্কৃতির মঞ্চ সাধারণত মুক্ত মতপ্রকাশের অন্যতম ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে কোনো বক্তব্য নিয়ে আপত্তি থাকলে তার প্রতিক্রিয়া কীভাবে জানানো হবে—এ নিয়েও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরীক্ষা হয়।
বাংলা একাডেমির এই ঘটনাটি তাই শুধু একজন কবি বা একটি কবিতা পাঠের বিতর্ক নয়; বরং এটি ভবিষ্যতে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে মতের ভিন্নতা, সহনশীলতা এবং প্রতিবাদের গ্রহণযোগ্য সীমা কোথায় নির্ধারিত হবে—সেই প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।
তথ্যসূত্র: bdnews24.com, প্রথম আলো।




