Homeনাগরিক দর্পণ‘আমি ভালো আছি, চিন্তা করো না’—কয়েক ঘণ্টা পর আজমুলের লাশ

‘আমি ভালো আছি, চিন্তা করো না’—কয়েক ঘণ্টা পর আজমুলের লাশ

এক কৃষকের ছেলে, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের শুরু, একটি রাতের খাবার নিয়ে অভিযোগ—তারপর দলবদ্ধ নির্যাতন, এক লাখ টাকা দাবির অভিযোগ এবং ছাদ থেকে পড়ে মৃত্যু; আজমুলের মৃত্যুর প্রশ্ন ছাপিয়ে সামনে এসেছে গণপিটুনির ভয়ংকর সংস্কৃতি

খুলনা | বিশেষ প্রতিবেদন | ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাত ৯টা। চুয়াডাঙ্গার দর্শনার বড়শলুয়া গ্রামের কৃষক কুতুব উদ্দিনের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলছিলেন তাঁর বড় ছেলে আজমুল হোসেন। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন নিয়ে খুলনায় থাকা ২১ বছরের তরুণটি বাবাকে বলেছিলেন, “আমি ভালো আছি। তোমরা আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না।” সেটিই ছিল পরিবারের সঙ্গে তাঁর শেষ স্বাভাবিক কথা। কয়েক ঘণ্টা পর সেই ফোন থেকেই বাবার কাছে আসে অন্য একজনের কল—“আপনার ছেলে ঝামেলা করেছে। তাকে পেতে হলে দ্রুত এক লাখ টাকা নিয়ে আসেন।” সকালে খুলনায় এসে কুতুব উদ্দিন দেখলেন, তাঁর ছেলে আর বেঁচে নেই।

আজমুল হোসেন ছিলেন নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ১০ সেপ্টেম্বর তিনি ভর্তি হন। নতুন করে বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শুরু করার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাজা খানজাহান আলী আবাসিক হলের পেছনের ইসলামনগর এলাকার একটি ছাত্র মেসে ঘটে সেই মর্মান্তিক ঘটনা।

কৃষকের ছেলের নতুন স্বপ্ন

আজমুলের পরিবার চুয়াডাঙ্গার দর্শনার বড়শলুয়া গ্রামের। বাবা কুতুব উদ্দিন কৃষিকাজ করেন। দুই ছেলের মধ্যে আজমুল বড়। বাবার ভাষ্য, ২০২৫ সালে চেষ্টা করেও আজমুল কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেননি। পরে নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান। কয়েকদিনের জন্য বাড়িতে গিয়ে ১৮ সেপ্টেম্বর দুপুরে আবার খুলনার উদ্দেশে রওনা দেন। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে মেসে পৌঁছানোর কথা জানান পরিবারকে। রাত ৯টায় কথা বলার সময়ও তাঁর কণ্ঠে ছিল স্বাভাবিকতা—বাবা-মাকে চিন্তা না করতে বলেছিলেন তিনি।

একটি পরিবারের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জায়গা পাওয়া নয়; সেটি ছিল হয়তো বহু বছরের অপেক্ষার পর একটি ভবিষ্যতের দরজা খোলা। সেই দরজা খোলার কয়েক দিনের মধ্যেই আজমুলের জীবন থেমে গেল।

যে খাবারকে কেন্দ্র করে শুরু

স্থানীয় বাসিন্দা, মেসের শিক্ষার্থী ও মেসের রান্নার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির বক্তব্য থেকে ঘটনার যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, তাতে ওই মেসে কিছু শিক্ষার্থী ‘মিল’ পদ্ধতিতে খাবার খেতেন। শুক্রবার রাতে খাবার কম পড়েছে বুঝতে পেরে খোঁজাখুঁজি শুরু হয়। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের একজন প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, চতুর্থ তলার ডি-৮ কক্ষের খাটের নিচে একটি প্লেটে অর্ধেক খাওয়া ভাত ও মাছ পাওয়া যায়। এরপর কয়েকজন আজমুলকে চড়-থাপ্পড় দিতে শুরু করেন। স্থানীয় বাসিন্দারা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি বলে তাঁদের বক্তব্য।

মেসের রান্নার দায়িত্বে থাকা ফাতেমা জানিয়েছেন, ওই রাতে তৃতীয় তলার নয়জনের জন্য খাবার রান্না করা হয়েছিল এবং খাবার কম পড়েছিল। আজমুল সেই ‘মিল’-এর সদস্য ছিলেন না। তাঁর বিরুদ্ধে এর আগেও টাকা ও জামাকাপড় চুরির অভিযোগ ছিল—এমন কথাও ফাতেমা বলেছেন; তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বতন্ত্রভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো—একজন মানুষ খাবার খেয়েছেন কি না, বা তিনি সত্যিই কোনো জিনিস নিয়েছেন কি না, সেটি যাচাই করার স্বাভাবিক পথ কী? অভিযোগ থাকলে তাঁকে প্রশ্ন করা যেত, মেস কর্তৃপক্ষকে জানানো যেত, পরিবারকে খবর দেওয়া যেত, প্রয়োজন হলে পুলিশে অভিযোগ করা যেত। কিন্তু যে পদ্ধতিতে বিষয়টি এগিয়েছে, সেটিই শেষ পর্যন্ত একটি জীবন কেড়ে নিয়েছে।

‘চোর’ শব্দটি কীভাবে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিল?

প্রথম আলোকে স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, ‘চোর ধরা পড়েছে’—এমন কথা ছড়িয়ে পড়ার পর আশপাশের আরও মানুষ ঘটনাস্থলে আসেন। আজমুলকে পরে ছাদে নেওয়া হয়। ছাদে ঠিক কারা ছিলেন, সেখানে কী ঘটেছিল এবং কোন পর্যায়ে আজমুল নিচে পড়ে যান—এসব প্রশ্নের পুরো উত্তর এখনো তদন্তে বেরিয়ে আসেনি।

বিভিন্ন প্রতিবেদনে আজমুলের মাথার চুল কেটে দেওয়ার অভিযোগও উঠে এসেছে।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের একজন চিকিৎসক বলেছেন, আজমুলের সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল এবং তাঁর দুই পা ভাঙা ছিল। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

এক লাখ টাকা দাবির অভিযোগ

এই ঘটনার সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়ের একটি হলো পরিবারের কাছে টাকা দাবির অভিযোগ।

আজমুলের বাবা কুতুব উদ্দিন জানিয়েছেন, রাত ১২টার পর ছেলের মুঠোফোন থেকে এক ব্যক্তি তাঁকে ফোন করে বলেন, ছেলে ‘ঝামেলা’ করেছে; তাকে পেতে হলে দ্রুত এক লাখ টাকা নিয়ে আসতে হবে। কৃষিকাজ করা কুতুব উদ্দিন জানান, এত রাতে এক লাখ টাকা জোগাড় করা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। তিনি দ্রুত খুলনায় আসার কথা জানান। পরদিন এসে তিনি ছেলের মরদেহ দেখতে পান।

পরিবারের এই বক্তব্য মামলার তদন্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যদি সত্যিই কাউকে আটকে রেখে মুক্তির বিনিময়ে অর্থ দাবি করা হয়ে থাকে, তাহলে সেটি শুধু মারধরের অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে আরও গুরুতর অপরাধের প্রশ্ন যুক্ত হতে পারে। তবে কলটি কে করেছিলেন, কেন টাকা চাওয়া হয়েছিল এবং কারা এতে জড়িত ছিলেন—এসব এখনো তদন্তের বিষয়।

ছাদ থেকে পড়েছিলেন, নাকি ফেলে দেওয়া হয়েছিল?

আজমুলের মৃত্যুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনো পুরোপুরি মীমাংসিত নয়।

আশপাশের বাসিন্দারা গভীর রাতে শব্দ শুনে বাইরে এসে গলিতে একজন তরুণকে পড়ে থাকতে দেখেন। মেসের ছাত্ররা পরে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যান। পুলিশের তদন্তে এখনো নিশ্চিত হয়নি—আজমুল নিজে ছাদ থেকে লাফ দিয়েছিলেন, নাকি মারধরের পর তাঁকে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।

এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করবে প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, চিকিৎসা ও ময়নাতদন্তের তথ্য, ঘটনাস্থলের আলামত, মুঠোফোনের তথ্য, অবস্থান-তথ্য, সম্ভব হলে নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজ এবং অভিযুক্ত ও সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদের ওপর। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কোনো একক বর্ণনাকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গ্রহণ না করে তদন্তের ফলের অপেক্ষা করাই জরুরি।

চারজনের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার চার

আজমুলের বাবা কুতুবউদ্দিন হরিণটানা থানায় হত্যা মামলা করেছেন। এজাহারে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষার্থীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। এজাহারভুক্ত চারজন হলেন রবিন, মুবিন, সাগর ও ওবায়দুল।

এরপর তদন্তে এখন পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হাসনাত হাবিব রিফাত, তারেক হাসান ওরফে রুবেল এবং প্রতাপ সরকারকে ২১ ও ২২ সেপ্টেম্বর পৃথক অভিযানে গ্রেপ্তার করা হয়। ২৩ সেপ্টেম্বর শেখ আসিফ হোসেন নামে আরও একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—গ্রেপ্তার চারজনের কেউই মামলার এজাহারে নাম থাকা চার আসামির মধ্যে নেই বলে পুলিশ ও সংবাদসূত্র জানিয়েছে।

গ্রেপ্তার রিফাত মঙ্গলবার আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ঘটনার সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন এবং আরও ১২ থেকে ১৩ জনের নাম জানিয়েছেন। তদন্তের স্বার্থে তাঁদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। এখানে মনে রাখা দরকার, জবানবন্দি তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলেও সেটিই দোষ প্রমাণের চূড়ান্ত ভিত্তি নয়; আদালতের বিচারেই অপরাধের দায় নির্ধারিত হবে।

মেস ফাঁকা, ঘরগুলো তালাবদ্ধ

ঘটনার পর মেসটির পরিবেশেও আতঙ্কের চিত্র দেখা গেছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চারতলা ভবনের বেশির ভাগ কক্ষ তালাবদ্ধ ছিল এবং তৃতীয় ও চতুর্থ তলার সব কক্ষ বন্ধ পাওয়া যায়। স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও অনেকে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাননি।

আরও একটি বিষয় তদন্তকারীদের নজরে আসতে পারে। স্থানীয় শিক্ষার্থীদের বক্তব্য অনুযায়ী, এলাকায় আগে থেকেই ছোটখাটো চুরি হতো; মুঠোফোন, ল্যাপটপ, জামাকাপড়সহ বিভিন্ন জিনিস হারানোর অভিযোগ ছিল। শিক্ষার্থীরা মেসে নজরদারি ক্যামেরা বসানোর অনুরোধও করেছিলেন বলে জানা গেছে, কিন্তু ভবনমালিক সে ব্যবস্থা করেননি।

যদি চুরির সমস্যা সত্যিই দীর্ঘদিনের হয়ে থাকে, তাহলে সেটি মোকাবিলার দায়িত্ব ছিল নিয়ম, নজরদারি ও আইনগত ব্যবস্থার মাধ্যমে। সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে ধরে শাস্তি দেওয়ার অধিকার কোনো মেসবাসীর নেই।

আজমুলের মৃত্যু কি শুধু একটি মেসের ঘটনা?

এই প্রশ্নের উত্তর ‘না’—কারণ ঘটনাটি এমন একটি সামাজিক প্রবণতার সঙ্গে মিলে যায়, যা নিয়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছে।

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির হিসাবে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশে ২৬১টি মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় অন্তত ১৩৩ জন নিহত এবং ২৫৬ জন আহত হয়েছেন। জুলাই মাসের হিসাবেও আরও ১৭ জন নিহত ও ৫১ জন আহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সময়ে ওধিকার এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে ৩৩ জনের মব হামলায় নিহত হওয়ার তথ্য দিয়েছে। সংস্থাগুলোর তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি ভিন্ন হওয়ায় সংখ্যাগুলো একসঙ্গে যোগ করে চূড়ান্ত জাতীয় হিসাব হিসেবে দেখা ঠিক হবে না; কিন্তু দুই উৎসই দেখাচ্ছে যে দলবদ্ধ হামলা ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনা একটি গুরুতর মানবাধিকার উদ্বেগ হয়ে আছে।

ওধিকারের প্রতিবেদনে এপ্রিল-জুন সময়ে মব হামলায় নিহতদের বড় একটি অংশকে চুরি বা ডাকাতির সন্দেহে মারধর করে হত্যার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ আজমুলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ধরনটিও বৃহত্তর একটি প্রবণতার সঙ্গে মিলে যায়।

অভিযোগ সত্য হলেও শাস্তি দেওয়ার অধিকার কার?

এখানেই রাষ্ট্র ও সমাজের একটি মৌলিক সীমারেখা আছে।

কেউ সত্যিই চুরি করলে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করা যায়। কেউ অপরাধ করলে পুলিশকে জানানো যায়। সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ হতে পারে। আদালতে বিচার হতে পারে। কিন্তু সন্দেহভাজনকে ধরে দলবদ্ধভাবে মারধর করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া কোনো বিচার নয়।

বিচারব্যবস্থার উদ্দেশ্যই হলো অভিযোগ আর অপরাধের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করা। সন্দেহকে প্রমাণে পরিণত করা। প্রত্যেক পক্ষের কথা শোনা। প্রমাণ যাচাই করা। তারপর আইনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া।

আজমুলের ঘটনায় যদি একটি প্লেটের খাবার থেকেই ‘চোর’ পরিচয় তৈরি হয়ে থাকে, তবে প্রশ্নটি আরও গভীর—একজন মানুষকে অপরাধী ঘোষণা করার এত সহজ ক্ষমতা আমরা কাদের হাতে তুলে দিচ্ছি?

‘চোর’ বললেই কি একজন মানুষের মানবিক অধিকার শেষ হয়ে যায়?

না।

একজন মানুষ ভুল করতে পারেন। অন্যের খাবার অনুমতি ছাড়া খেতে পারেন। নিয়ম ভাঙতে পারেন। এমনকি অপরাধও করতে পারেন। কিন্তু অভিযোগ ওঠার মুহূর্তে তাঁর মানুষ হিসেবে মর্যাদা হারিয়ে যায় না।

আজমুলের ক্ষেত্রেও অভিযোগটি সত্য ছিল কি না, সেটি আলাদা প্রশ্ন। কিন্তু কোনো অভিযোগই এমন শাস্তির অনুমতি দেয় না, যার পরিণতি একজন তরুণের মৃত্যু।

একটি পরিবারের জন্য এই মৃত্যু তাই শুধু একজন সন্তানের মৃত্যু নয়। এটি একটি কৃষক বাবার ভবিষ্যৎ হারানো। মায়ের অপেক্ষার অবসান। ছোট ভাইয়ের জীবনে একজন বড় ভাইকে হারানো। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম কয়েকটি দিনের স্মৃতি হঠাৎ শেষ হয়ে যাওয়া।

রাত ৯টার সেই কথাটি—‘আমি ভালো আছি, তোমরা আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না’—এখন একটি পরিবারের কাছে হয়তো সারাজীবনের শেষ স্মৃতি।

যে সমাজে অভিযোগের আগে রায় হয়ে যায়

মব সহিংসতার সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো এর গতি। একজন অভিযোগ করে, কয়েকজন বিশ্বাস করে, তারপর কয়েক মিনিটের মধ্যে একটি দল তৈরি হয়ে যায়। সেই দলের ভিড়ে ব্যক্তিগত দায়বোধ কমে যেতে পারে—কারণ প্রত্যেকে ভাবতে পারে, ‘সবাই তো করছে।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে—বিশেষ করে যাচাই না করা ছবি, ভিডিও, গুজব বা চুরির অভিযোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে। কোনো মানুষকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করতে তখন কয়েক মিনিট লাগে, কিন্তু তাঁর নির্দোষিতা প্রমাণ করতে হয়তো মাস বা বছর লেগে যেতে পারে।

আজমুলের ঘটনায়ও প্রথমে কীভাবে অভিযোগ ছড়াল, কারা তা ছড়াল, কারা মেসে বাইরে থেকে এল, কে বা কারা মারধরে অংশ নিল এবং কে টাকা চেয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জরুরি। কারণ শুধু কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করলেই পুরো ব্যবস্থার ব্যর্থতা বোঝা যাবে না।

মেস ব্যবস্থাপনাও কি দায়মুক্ত?

এখানে আইনি দায় নির্ধারণ করবে তদন্ত ও আদালত। কিন্তু সামাজিক প্রশ্নটি থেকেই যায়।

একটি চারতলা ছাত্র মেসে কয়েক ডজন তরুণ বসবাস করেন। সেখানে খাবারের হিসাব, মেস পরিচালনা, নিরাপত্তা, অতিথি প্রবেশ, বিরোধ মীমাংসা—এসবের জন্য স্পষ্ট নিয়ম থাকা দরকার। কোনো অভিযোগ উঠলে কাকে জানাতে হবে, কীভাবে যাচাই হবে, মারামারি হলে কে থামাবে—এসবও আগে থেকে নির্ধারিত থাকা উচিত।

আর শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ যদি সত্যিই থাকে যে এলাকায় চুরি হয়, তাহলে নজরদারি ক্যামেরা, নিরাপদ দরজা, প্রবেশ-নিয়ন্ত্রণ ও থানায় অভিযোগের মতো ব্যবস্থা নেওয়া অনেক বেশি যুক্তিসঙ্গত ছিল।

একটি খাবারের প্লেটকে কেন্দ্র করে যদি শেষ পর্যন্ত একটি তরুণের মৃত্যু ঘটে, তাহলে ঘটনাটি আমাদের শুধু অভিযুক্তদের দায়ের দিকে নয়, ঝুঁকি প্রতিরোধের ব্যর্থতার দিকেও তাকাতে বাধ্য করে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকা কোথায়?

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানার বাইরে হওয়ায় মেসটির ওপর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরাসরি এখতিয়ার নেই। তবে পুলিশকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হচ্ছে। নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জানিয়েছেন, আজমুল ১০ সেপ্টেম্বর ভর্তি হয়েছিলেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁর পরিবারকে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে ও সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।

এখানেও একটি বৃহত্তর প্রশ্ন আছে—বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিক্ষার্থীদের আবাসন কি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে বিবেচিত হবে, নাকি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়, মেসমালিক ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন?

এটি শুধু আজমুলের জন্য নয়। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় শহরে হাজার হাজার শিক্ষার্থী মেস, আবাসিক ভবন ও ভাড়াবাড়িতে থাকেন। তাঁদের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে কেবল ব্যক্তিগত দায়িত্ব হিসেবে দেখলে ঝুঁকি থেকেই যায়।

‘গরিব মানুষ, কার কাছে বিচার দেব?’

ছেলের মৃত্যুর পর কুতুব উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেছেন, “আমি কার কাছে এ বিচার দিব? আমি কারো কাছে বিচার দিব না। আমরা গরিব মানুষ। বাড়ি অনেক দূরে। আল্লাহর কাছে বিচার দিলাম।”

এই বাক্যটির মধ্যে একটি পরিবারের অসহায়ত্ব আছে। একজন বাবা আইন জানেন কি না, আদালতে যাওয়ার সামর্থ্য আছে কি না, অভিযুক্তদের সামাজিক প্রভাব কতটা—এসবের কিছুই তাঁর সন্তানের জীবনের মূল্য কমায় না।

একটি ন্যায়বিচারভিত্তিক রাষ্ট্রে বিচার পাওয়ার অধিকার কারও অর্থ, পরিচয় বা সামাজিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করার কথা নয়।

আজমুলের পরিবার তাই শুধু একটি মামলা চায় না; তারা জানতে চায়—সেই রাতে আসলে কী ঘটেছিল। কে প্রথম অভিযোগ তুলেছিল? কারা আজমুলকে মারধর করেছিল? কারা ছাদে ছিল? টাকা দাবি কে করেছিল? কারা বাইরে থেকে এসেছিল? ছাদ থেকে কীভাবে পড়লেন তিনি? আর কেন একজন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণকে একটি খাবারের অভিযোগের জেরে এমন পরিণতি ভোগ করতে হলো?

আজমুলের জন্য ন্যায়বিচার মানে শুধু শাস্তি নয়

আজমুল হত্যার ঘটনায় যারা জড়িত, তদন্তে তাঁদের শনাক্ত করা এবং আইন অনুযায়ী বিচার নিশ্চিত করা অবশ্যই জরুরি। কিন্তু তার চেয়েও বড় শিক্ষা হলো—একজনকে ‘চোর’, ‘ডাকাত’, ‘প্রতারক’ বা অন্য কোনো অপবাদ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে শাস্তি দেওয়ার সামাজিক অধিকার কারও নেই।

অভিযোগ করবেন—পুলিশকে।

প্রমাণ দেবেন—তদন্ত সংস্থাকে।

বিচার করবেন—আদালত।

সমাজের দায়িত্ব হতে পারে সম্ভাব্য অপরাধ ঠেকাতে সহযোগিতা করা, আহত মানুষকে বাঁচানো, পুলিশকে তথ্য দেওয়া এবং উত্তেজিত জনতাকে থামানো। সমাজের দায়িত্ব বিচারকের আসনে বসা নয়।

আজমুলের মৃত্যু আমাদের সামনে তাই দুটি আলাদা প্রশ্ন রেখে গেছে। প্রথম প্রশ্ন, ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে মেসের ছাদে আসলে কী ঘটেছিল? দ্বিতীয় প্রশ্ন, আজমুলের মতো আর একজন তরুণ যাতে আগামীকাল আরেকটি ‘অভিযোগের’ কারণে জনতার হাতে না মারা যান, তার জন্য আমরা কী বদলাব?

প্রথম প্রশ্নের উত্তর দেবে তদন্ত ও আদালত।

দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে পুরো সমাজকে।

কারণ একটি প্লেট ভাতের মূল্য দশ, পনেরো বা তার চেয়েও কম হতে পারে। কিন্তু একজন মানুষের জীবনের মূল্য কোনো টাকায় মাপা যায় না।

আজমুল হোসেন সেই সত্যটি নিজের জীবন দিয়ে রেখে গেলেন।

ঘোষণা: প্রতিবেদনে উল্লেখিত মামলার অভিযোগ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য ও পুলিশের প্রাথমিক তথ্য তদন্তাধীন। আদালতের চূড়ান্ত রায়ের আগে কোনো আসামিকে দোষী হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে না।

তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর; প্রথম আলো; বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা; দ্য ডেইলি স্টার; ঢাকা ট্রিবিউন; দৈনিক ইত্তেফাক; সমকাল; যুগান্তর; হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি; ওধিকার; খুলনা মহানগর পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments