Homeটুডে বাংলাবাল্যবিবাহ বন্ধ, সমান সুযোগ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিতের দাবি কন্যাশিশুদের

বাল্যবিবাহ বন্ধ, সমান সুযোগ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিতের দাবি কন্যাশিশুদের

বাল্যবিবাহ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং কন্যাশিশুদের শিক্ষা, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে। সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাজধানীর মিরপুর-২-এর আলোক অডিটোরিয়ামে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) এই সংলাপের আয়োজন করে। ‘বাল্যবিবাহ বন্ধ করি, কন্যাশিশুর অধিকার নিশ্চিতে বিনিয়োগ করি’ জাতিসংঘের এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আয়োজিত অনুষ্ঠানে কন্যাশিশু, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও উন্নয়ন সহযোগীরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিল কন্যাশিশুদের নিজেদের অভিজ্ঞতা ও মতামত। বৈষম্য, সামাজিক বাধা, নিরাপত্তাহীনতা এবং ভবিষ্যৎ গড়ার পথে নানা প্রতিবন্ধকতার কথা তুলে ধরে তারা।

অনুষ্ঠানে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, কন্যাশিশুদের সাফল্য উদ্‌যাপনের পাশাপাশি তাদের অধিকার বাস্তবায়নের পথে যেসব বাধা রয়েছে, সেগুলো দূর করতে হবে। তিনি বলেন, শুধু কন্যারা বিশ্বজয় করবে বললেই হবে না। কীভাবে তারা বিশ্বজয় করবে, সেই সুযোগ আমরা কীভাবে তৈরি করছি, তা নিয়েও ভাবতে হবে।

শাহীন আনাম বলেন, বাল্যবিবাহ কন্যাশিশুর মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন। এর ফলে নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সুযোগ বাধাগ্রস্ত হয়। দারিদ্র্য, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা এবং বিকল্প সুযোগের অভাবে অনেক পরিবার মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দিতে বাধ্য হয়। তিনি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বিদ্যমান ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আইন বাস্তবায়ন এবং জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি বাড়ানোর আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এমজেএফের সহকারী প্রকল্প ব্যবস্থাপক লাইসা মাহমুদ হেমা। ইউনিসেফ, ইউএনএফপিএ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপের তথ্য তুলে ধরে তিনি জানান, বাংলাদেশে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭.২ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে এবং ১৩.৪ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছরের আগে।

তিনি আরও জানান, প্রাথমিক স্তরে শিক্ষা সমাপ্তির হার ৯১.৩ শতাংশ হলেও নিম্নমাধ্যমিকে তা কমে ৭৫.৯ শতাংশ এবং উচ্চমাধ্যমিকে মাত্র ৪১.১ শতাংশে নেমে আসে। কন্যাশিশুদের শিক্ষা, সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ডিজিটাল দক্ষতা এবং নিজেদের জীবনসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে বিনিয়োগের আহ্বান জানান তিনি। পুরো অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন তিয়াশা ইদরাক।

অনুষ্ঠানের অন্যতম পর্ব ছিল কন্যাশিশু ও বিভিন্ন প্রজন্মের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে সংলাপ। এটি সঞ্চালনা করেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন অফিসার নুসরাত ফাতিমা। সংলাপে কিশোরীরা পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অনলাইন পরিসরে বৈষম্য এবং নিজেদের অধিকার চর্চার ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতার কথা তুলে ধরে।

সেরাক বাংলাদেশের সুমাইয়া আক্তার শিক্ষা ও নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারের মধ্যে সম্পর্ক তুলে ধরে বলেন, শিক্ষার সুযোগ ছাড়া মেয়েদের পক্ষে স্বাধীনভাবে ও সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন।

মায়ের আঁচলের সাদিয়া আক্তার ইভা, যিনি একটি আশ্রয়কেন্দ্রে থেকে পড়াশোনা করছেন, বিদ্যালয়ে খেলাধুলার ক্ষেত্রে ছেলে ও মেয়েদের অসম সুযোগের কথা তুলে ধরে। তিনি জানান, ছেলেরা খেলাধুলার জন্য তুলনামূলক বেশি সময় ও সুযোগ-সুবিধা পায়।

বিআইএসসির শিক্ষার্থী তাসনিম ফেরদৌসী বলেন, বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছালেই সমাজের অনেকেই একটি মেয়েকে বিয়ের উপযুক্ত মনে করে, যদিও সে তখনো শিশু। তিনি প্রশ্ন তোলেন, মানসিকভাবে পরিণত না হওয়া ১৬ বা ১৭ বছরের একটি মেয়ের ওপর কীভাবে সংসার পরিচালনা ও সন্তান লালন-পালনের দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হয়। খেলাধুলায় ছেলেদের দলকে বেশি প্রাধান্য দেওয়ার বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন।

উখাইনু মারমা মাসিক নিয়ে সামাজিক কুসংস্কার, জাতিগত বৈষম্য এবং মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকারের বিষয়গুলো সামনে আনেন। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অন্য অংশগ্রহণকারীরা বিদ্যালয়ে যাতায়াত, মাসিক স্বাস্থ্যসামগ্রী পাওয়ার অসুবিধা এবং ভাষাগত প্রতিবন্ধকতার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কিশোরী আয়েশা আক্তার ব্রেইল ও অডিও শিক্ষাসামগ্রীসহ প্রতিবন্ধী কন্যাশিশুদের উপযোগী শিক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জানান। তিনি বলেন, প্রতিবন্ধী কন্যাশিশুদের করুণা নয়, প্রয়োজন সমান অধিকার ও সুযোগ। দেশের বাইরে দৃষ্টি-প্রতিবন্ধীসহ অন্যান্যরা সকল বিষয়ে পড়াশোনার সুযোগ পায় কিন্তু আমাদের দেশে এটি কেবলই একটি স্বপ্ন।

এসএফএক্স গ্রিনহেরাল্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের শিক্ষার্থী ওয়াদিফা রহমান অপ্সরা বলেন, প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষা সমাপ্তির হার কমে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি ছেলে ও মেয়েদের শিক্ষায় সমান বিনিয়োগ করে এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শেখার পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো ও বাল্যবিবাহ কমাতে সরকার, সমাজ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের নির্বাহী পরিচালক রোকসানা সুলতানা; প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ডিরেক্টর, ইনফ্লুয়েন্সিং ক্যাম্পেইন অ্যান্ড কমিউনিকেশনস নিশাত সুলতানা এবং সেরাক বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক এস এম সৈকত।

বক্তারা বলেন, পড়াশোনা ও খেলাধুলায় মেয়েদের উল্লেখযোগ্য অর্জন থাকলেও দারিদ্র্য, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক পরিবার মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে দেয়। বাল্যবিবাহের মূল কারণগুলো দূর করতে পরিবার, সমাজ ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। অনুষ্ঠানে মায়ের আঁচলের শিশুদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।

সমাপনী বক্তব্যে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের লিড, ইয়ুথ অ্যান্ড সোশ্যাল কোহেশন ওয়াসিউর রহমান তন্ময় অংশগ্রহণকারী কন্যাশিশু, সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সহযোগীদের ধন্যবাদ জানান। এ সময় তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়ন, গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা, সুইজারল্যান্ড দূতাবাস, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ এবং নাগরিকতা সিইএফের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

শুধু সচেতনতামূলক প্রচারণায় সীমাবদ্ধ না থেকে কন্যাশিশুদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ, স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সহিংসতামুক্ত জীবন এবং সমাজের সব ক্ষেত্রে সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বানের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments