আমদানি, নতুন নিবন্ধন ও লাইসেন্স নবায়ন বন্ধ; গ্লাইফোসেট নিয়ে পিটাকের ৯১তম সভায় নতুন সময়সীমা নির্ধারণ হয়নি
স্বাস্থ্য ও কৃষি ডেস্ক | TODAY TV BD
বাংলাদেশে কৃষিতে ব্যবহৃত অত্যন্ত বিষাক্ত আগাছানাশক প্যারাকোয়েটের আমদানি, নতুন নিবন্ধন ও বিদ্যমান পণ্যের লাইসেন্স নবায়ন বন্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে দেশে থাকা প্যারাকোয়েটের প্রায় ৩৯৫ মেট্রিক টন মজুদ আগামী ছয় মাসের মধ্যে শেষ করে শূন্যে নামানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনে অনুষ্ঠিত বালাইনাশক কারিগরি উপদেষ্টা কমিটির (পিটাক) ৯১তম সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভার কার্যবিবরণীর তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্যারাকোয়েট গ্রুপের বালাইনাশকের মোট মজুদ ৩৯৫ মেট্রিক টন।
প্যারাকোয়েটের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তটি স্পষ্ট হলেও গ্লাইফোসেট নিয়ে একই সভায় নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা বা নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি। এ বিষয়ে আগের সভার সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
ছয় মাসে মজুদ শেষ করার সিদ্ধান্ত
পিটাকের কার্যবিবরণী অনুযায়ী, প্যারাকোয়েট গ্রুপের বালাইনাশক নতুন করে আমদানি করা যাবে না, নতুন নিবন্ধন দেওয়া হবে না এবং আগের লাইসেন্সও নবায়ন করা হবে না। দেশে বর্তমানে যে মজুদ রয়েছে, তা পত্র জারির পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে শেষ করে শূন্যে নামাতে হবে।
৩৯৫ মেট্রিক টন মানে প্রায় ৩ লাখ ৯৫ হাজার কেজি প্যারাকোয়েটজাত বালাইনাশক। এখন মূল প্রশ্ন হলো—এই বিপুল মজুদ কোথায় আছে, কোন কোম্পানির কাছে কত আছে, কোন পর্যায়ে কত বিক্রি হচ্ছে এবং ছয় মাসের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সত্যিই সব মজুদ বাজার থেকে শেষ হচ্ছে কি না।
এখানেই নিয়মিত নজরদারির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কাছে যদি কোম্পানি ও নিবন্ধিত বিক্রেতাদের কাছ থেকে সাপ্তাহিক মজুদ ও বিক্রির হিসাব নেওয়ার ব্যবস্থা থাকে, তাহলে নিষিদ্ধ ঘোষণার পর মজুদের গতিবিধি অনেক বেশি স্বচ্ছভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। কোথায় কত প্যারাকোয়েট অবশিষ্ট আছে এবং নির্ধারিত সময়ের সঙ্গে মজুদ কমার গতি মিলছে কি না, সেটিও সহজে বোঝা যাবে।
তবে সাপ্তাহিক হিসাব রাখার এই প্রস্তাবটি বর্তমান পিটাক সিদ্ধান্তের আলাদা কোনো ঘোষিত শর্ত হিসেবে পাওয়া যায়নি; এটি বাস্তবায়ন নজরদারি আরও শক্ত করার একটি প্রস্তাব হিসেবে দেখা যেতে পারে।
গ্লাইফোসেটে কী সিদ্ধান্ত হয়েছে?
প্যারাকোয়েটের সঙ্গে গ্লাইফোসেট নিয়েও পিটাকের ৯১তম সভায় আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এই সভায় গ্লাইফোসেট নিষিদ্ধ করার নতুন কোনো সময়সীমা ঘোষণা করা হয়নি। সভার কার্যবিবরণীতে গ্লাইফোসেটের বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
পিটাকের সভাপতি মো. আবদুছ ছালাম প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, পিটাকের আগের ৮৮তম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গ্লাইফোসেটের মজুদও শেষ পর্যন্ত শূন্যে নামিয়ে আনার বিষয় রয়েছে; তবে ৯১তম সভায় প্যারাকোয়েটের মতো গ্লাইফোসেটের জন্য নতুন করে ছয় মাসের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি।
অর্থাৎ “গ্লাইফোসেটও নিষিদ্ধ হয়ে গেছে এবং ছয় মাসের মধ্যে শেষ করতে হবে”—এ কথা এখনই বলা ঠিক হবে না। বর্তমান তথ্য অনুযায়ী প্যারাকোয়েটের সিদ্ধান্তটি স্পষ্ট; গ্লাইফোসেটের পরবর্তী পদক্ষেপ এখনো নির্ধারণাধীন।
কেন প্যারাকোয়েট নিয়ে এত উদ্বেগ?
প্যারাকোয়েট একটি অত্যন্ত বিষাক্ত আগাছানাশক। মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে এটি বিশেষ করে ফুসফুস, কিডনি ও অন্যান্য অঙ্গের গুরুতর ক্ষতি করতে পারে এবং বিষক্রিয়ায় মৃত্যু হতে পারে। এর চিকিৎসায় নির্দিষ্ট প্রতিষেধকও নেই।
বাংলাদেশে এর ব্যবহার শুধু কৃষির ঝুঁকির বিষয় নয়, বিষপান ও আত্মহত্যার উপকরণ হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টিও জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রথম আলো প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ১০টি হাসপাতালের তথ্যভিত্তিক একটি গবেষণার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ায় মৃত্যুর সংখ্যা ২০১৩ সালের একজন থেকে ২০২৪ সালে ২১২ জনে পৌঁছানোর তথ্য দেওয়া হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আমদানি তথ্য বিশ্লেষণ করে ২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে প্যারাকোয়াটের আমদানি ২০১৩ সালের ৫৩ টনের কিছু বেশি থেকে ২০২৩ সালে প্রায় ৪ হাজার ৬৯৫ টনে পৌঁছেছিল।
নিষেধাজ্ঞার পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নজরদারি
কোনো রাসায়নিক নিষিদ্ধ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও বাস্তবে এর সুফল নির্ভর করে নিষিদ্ধের পর অবশিষ্ট মজুদ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, তার ওপর।
তাই প্যারাকোয়েটের বর্তমান ৩৯৫ মেট্রিক টন মজুদের ক্ষেত্রে কোম্পানি ও পরিবেশকদের হিসাব, গুদামভিত্তিক পরিদর্শন, বিক্রির রেকর্ড এবং নির্ধারিত সময় শেষে অবশিষ্ট পণ্যের হিসাব প্রকাশ করা হলে পুরো প্রক্রিয়াটি আরও জবাবদিহিমূলক হতে পারে।
বিশেষ করে নিষিদ্ধ ঘোষণার পর নতুন করে আমদানি না হলেও পুরোনো মজুদ বাজারে থাকছে। ফলে কৃষকের কাছে এটি কীভাবে পৌঁছাচ্ছে এবং কোথায় ব্যবহার হচ্ছে, সেটিও নজরদারির আওতায় থাকা জরুরি।
শুধু প্যারাকোয়েট বন্ধ করলেই খাদ্য নিরাপদ হবে না
কৃষিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক নিয়ে আলোচনায় একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—শুধু একটি বা দুটি ক্ষতিকর বালাইনাশক নিষিদ্ধ করলেই খাদ্য নিরাপত্তার পুরো সমস্যার সমাধান হবে না।
অনুমোদিত বালাইনাশক ব্যবহার হলেও নির্ধারিত মাত্রার বেশি প্রয়োগ, ফসল কাটার আগে যথেষ্ট বিরতি না রাখা, ভুল ফসলে ব্যবহার, অননুমোদিত মিশ্রণ কিংবা নিম্নমানের পণ্যের কারণে খাদ্যে রাসায়নিক অবশিষ্টাংশের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তাই নিষিদ্ধ রাসায়নিকের তালিকা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অনুমোদিত বালাইনাশকের মান, ব্যবহারবিধি, বিক্রয়ব্যবস্থা এবং খাদ্যে অবশিষ্টাংশ পরীক্ষার ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।
ভারী ধাতু ও তেজস্ক্রিয় উপাদান নিয়েও নজরদারি দরকার
কীটনাশক ও রাসায়নিক সার নিয়ে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি সামনে এসেছে—অনুমোদিত রাসায়নিক পণ্যগুলোতে যেন ক্ষতিকর ভারী ধাতু এবং তেজস্ক্রিয় উপাদান না থাকে।
নীতিগতভাবে রাসায়নিক পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে উপাদানের বিশুদ্ধতা, দূষণ, ভারী ধাতু এবং অন্যান্য অনাকাঙ্ক্ষিত উপাদানের পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। তবে “দেশের সব অনুমোদিত বালাইনাশকে এ ধরনের দূষণ রয়েছে”—এমন সাধারণ সিদ্ধান্ত দেওয়ার মতো তথ্য এই বক্তব্যে নেই। বিষয়টি প্রমাণ করতে হলে নমুনা সংগ্রহ, পরীক্ষাগার বিশ্লেষণ এবং পণ্যের ব্যাচভিত্তিক তথ্য প্রয়োজন।
একইভাবে, অনুমোদিত বালাইনাশক ব্যবহার হলেই খাদ্য অনিরাপদ—এমন ধারণাও ঠিক নয়। ঝুঁকি নির্ভর করে কোন রাসায়নিক, কত পরিমাণে, কী ফসলে, কী সময় এবং কোন নিয়মে ব্যবহার করা হয়েছে তার ওপর।
উচ্চ পর্যায়ের কমিটির সুপারিশের অপেক্ষা
কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকার যে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি করেছে, তার অধীনে উপকমিটির কাজ চলছে বলে সংশ্লিষ্ট বক্তব্যে দাবি করা হয়েছে। উপকমিটি মূল কমিটির কাছে প্রতিবেদন দেওয়ার পর পরবর্তী নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
এই প্রক্রিয়ার ফলাফল এখনো প্রকাশিত না হওয়ায় খাদ্যে রাসায়নিক ঝুঁকি কত শতাংশ কমবে বা কোন কোন বালাইনাশক পরবর্তী সময়ে নিষিদ্ধ হবে—এখনই নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়।
বিশেষ করে “ক্ষতিকর কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ঠিক করতে পারলে দেশের খাদ্য ৮০ শতাংশ নিরাপদ করা সম্ভব”—এ ধরনের একটি নির্দিষ্ট শতাংশের দাবি যাচাইযোগ্য গবেষণা বা সরকারি মূল্যায়ন ছাড়া তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না। এটি একটি মতামত বা প্রত্যাশা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে, বৈজ্ঞানিক পরিমাপ হিসেবে নয়।
সামনে এখন কী করা জরুরি?
প্যারাকোয়েটের ক্ষেত্রে ছয় মাসের সময়সীমা নির্ধারিত হয়েছে। এখন এই সময়সীমা বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হচ্ছে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কোম্পানি ও বিক্রেতাভিত্তিক মজুদের হিসাব, নিয়মিত বাজার তদারকি, বিক্রির নথি সংরক্ষণ, অবশিষ্ট মজুদের শারীরিক যাচাই এবং নির্ধারিত সময় শেষে মজুদ শূন্য হওয়ার সরকারি হিসাব প্রকাশ করা গেলে নিষেধাজ্ঞার বাস্তবায়ন অনেক বেশি স্বচ্ছ হবে।
একই সঙ্গে গ্লাইফোসেট নিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত কী হয়, অনুমোদিত বালাইনাশকের মান পরীক্ষা কতটা শক্তিশালী করা যায়, খাদ্যে রাসায়নিক অবশিষ্টাংশের নিয়মিত পরীক্ষা কতটা বাড়ানো যায় এবং কৃষকদের জন্য নিরাপদ বিকল্প ও সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা কতটা কার্যকর করা যায়—এসব প্রশ্নও সামনে থাকবে।
প্যারাকোয়েট নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত তাই শুধু একটি রাসায়নিক বন্ধের ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের কৃষি, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাকে আরও কঠোর ও স্বচ্ছ করার একটি বড় সুযোগ। এখন সেই সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হয়, সেটিই দেখার বিষয়।
তথ্যসূত্র:
১. প্রথম আলো, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬—“বিষাক্ত প্যারাকোয়াট আমদানি নিবন্ধন বন্ধ, গ্লাইফোসেট নিয়ে সিদ্ধান্ত হলো না”। ২. সমকাল, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬—“প্রাণঘাতী দুই আগাছানাশক নিষিদ্ধ করল সরকার”। ৩. কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষিবিষয়ক তথ্যভাণ্ডার ও বালাইনাশক ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত সরকারি তথ্য।




