Homeটুডে বাংলাঅপ্রতিম হত্যা: শুধু আইফোন, নাকি আরও গভীর কোনো কারণ?

অপ্রতিম হত্যা: শুধু আইফোন, নাকি আরও গভীর কোনো কারণ?

পুলিশ বলছে আইফোন ছিনিয়ে নিতে হত্যাকাণ্ড; তিন আসামির ১৬৪ ধারায় দায় স্বীকার ও তুহিনের বাড়ি থেকে ফোন উদ্ধারের পর সেই তত্ত্ব শক্ত হয়েছে। কিন্তু তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা একই সঙ্গে বলেছেন, আইফোনই একমাত্র কারণ নয়; অপ্রতিম ও তুহিনের পূর্বের বিরোধ, কিশোর গ্যাং, মাদকচক্র এবং অপ্রতিমের মায়ের অতীত দায়িত্ব ঘিরে সম্ভাব্য ক্ষোভও খতিয়ে দেখা হচ্ছে

টুডে টিভি বিডি | বিশেষ অনুসন্ধান কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের ১৩ বছর বয়সী একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ডের প্রথম ৪৮ ঘণ্টায় তদন্ত যেন খুব দ্রুত একটি নির্দিষ্ট দিকে এগিয়েছে। ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে মায়ের আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে বেরিয়ে নিখোঁজ হওয়া অপ্রতিমের মরদেহ পরদিন লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার নির্জন জঙ্গল থেকে উদ্ধার হয়। কপাল ও মুখমণ্ডলে ছিল গুরুতর আঘাতের চিহ্ন। পরে সিসিটিভি বিশ্লেষণ করে সাইফুল ইসলাম তুহিনকে শনাক্ত করা হয় এবং তাঁর বাড়ি থেকে অপ্রতিমের মায়ের আইফোন উদ্ধার করা হয়। ২০ সেপ্টেম্বর সংবাদ সম্মেলনে কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, তুহিন পরিকল্পনা করে অপ্রতিমকে নির্জন এলাকায় নিয়ে যায়; সেখানে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার সময় অপ্রতিম বাধা দিলে ধস্তাধস্তি হয় এবং তুহিন, ফাহাদ ও কামরুল বাঁশের লাঠি দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করে। পরে তুহিন ফোনটি নিয়ে চলে যায়। কিন্তু একই দিনে প্রকাশিত আরেকটি তদন্তসংশ্লিষ্ট বক্তব্য পুরো ঘটনাকে আরও জটিল করে তুলেছে। যুগান্তরকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেছেন, শুধু আইফোনের জন্য অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়নি; তুহিন ও অপ্রতিমের আগে থেকেই কিছুটা বিরোধ ছিল এবং ওই বিরোধসহ কয়েকটি বিষয়কে কেন্দ্র করে তুহিন অপ্রতিমকে ডেকে নেয়। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, মাদক সিন্ডিকেট, কিশোর গ্যাং এবং অপ্রতিমের মায়ের ওপর কোনো চক্রের ক্ষোভ ছিল কি না, তাও তদন্তের আওতায় আছে। এখানেই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি দাঁড়ায়—আইফোন কি হত্যার মূল উদ্দেশ্য, নাকি হত্যার তাৎক্ষণিক উপলক্ষ মাত্র?

১৮ সেপ্টেম্বরের বিকেল: অপ্রতিম কোথায় গেল?

পরিবারের এজাহার অনুযায়ী, ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে কোটবাড়ি-গন্ধমতীর বাসা থেকে মায়ের আইফোন নিয়ে বের হয় অপ্রতিম। বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলবে—এটাই ছিল বের হওয়ার কারণ। সন্ধ্যা ৭টার দিকে তাঁর বাবা ওই ফোনে কল করলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে সদর দক্ষিণ থানায় নিখোঁজের জিডি করা হয়। পরদিন দুপুরে সানন্দার লালমাই পাহাড়ের জঙ্গলে মরদেহ পাওয়া যায়। কিন্তু তদন্তের সময়রেখায় একটি সূক্ষ্ম অসঙ্গতি আছে। পুলিশের সংবাদ সম্মেলন-ভিত্তিক কয়েকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অপ্রতিমকে ১৮ সেপ্টেম্বর দুপুর ২টা থেকে সোয়া ২টার মধ্যে তুহিন লালমাই পাহাড়ের দিকে নিয়ে যায়। অথচ পরিবারের এজাহার ও একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সে বাসা থেকে বের হয় বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে। এই সময়ের অমিলকে সামান্য ভুল ধরে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। কারণ একটি হত্যামামলায় কখন বাসা থেকে বের হলো, কখন তুহিনের সঙ্গে দেখা হলো, কখন পাহাড়ের দিকে গেল, কখন সংঘর্ষ হলো এবং কখন মৃত্যু হলো—এই মিনিটভিত্তিক সময়রেখাই সিসিটিভি, মুঠোফোনের অবস্থান-তথ্য ও সাক্ষ্যের সঙ্গে মিলিয়ে মূল ঘটনা পুনর্গঠনের ভিত্তি হতে পারে।

সিসিটিভি যে প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে

অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল দল আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করে। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের কাছে তাঁকে এক বয়সে বড় কিশোরের সঙ্গে দেখা যায়। পরে কাছের আরেকটি বাড়ির সিসিটিভিতেও ওই কিশোরকে অপ্রতিমকে নিয়ে যেতে দেখা যায়। স্থানীয়ভাবে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো হয় এবং পরে তুহিনকে আটক করা হয়। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তুহিন ও অপ্রতিমের দেখা হওয়া এবং তুহিনের সঙ্গে অপ্রতিমের নির্জন এলাকায় যাওয়া এখন কেবল অনুমান নয়; সিসিটিভি তা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি দিয়েছে। কিন্তু সিসিটিভি একটি প্রশ্নের উত্তর দেয় না: তুহিন কেন অপ্রতিমকে ওই জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল? পুলিশের বর্তমান ব্যাখ্যা—আইফোন ছিনিয়ে নিতে। তদন্তসংশ্লিষ্ট আরেক কর্মকর্তার বক্তব্য—এর সঙ্গে পূর্বের বিরোধও ছিল। এই দুই তথ্য পরস্পরবিরোধী না-ও হতে পারে। বরং একটি সম্ভাবনা হতে পারে, পূর্বপরিচয় ও বিরোধের কারণে অপ্রতিমকে নির্জন জায়গায় নেওয়া সহজ হয়েছিল এবং সেখানে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাই সহিংসতার তাৎক্ষণিক কারণ হয়েছে। এটি অবশ্য অনুসন্ধানী সম্ভাবনা, প্রমাণিত সিদ্ধান্ত নয়।

তুহিন অপ্রতিমের কাছে অপরিচিত ছিল না—এটাই মামলার বড় সূত্র

পুলিশ জানিয়েছে, অপ্রতিম ও গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে “অসম বয়সী বন্ধুত্ব” ছিল। অপ্রতিম সপ্তম শ্রেণির ছাত্র; অপরদিকে প্রধান আসামি তুহিন ১৯ বছর বয়সী এবং তাঁর সঙ্গে থাকা দুই কিশোরও তাঁর চেয়ে বড়। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁরা অপ্রতিমের সহপাঠী ছিলেন না। অর্থাৎ এটি এমন কোনো ঘটনা নয় যেখানে হঠাৎ রাস্তায় অপরিচিত এক শিশুর ওপর হামলা করা হয়েছে। পরিচয় ছিল, যোগাযোগ ছিল, একসঙ্গে চলাফেরা ছিল। এই পূর্বপরিচয়ই আইফোন-তত্ত্বের সবচেয়ে বড় প্রশ্নও তৈরি করে। যদি লক্ষ্য শুধু ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে অপরিচিত কোনো পথচারীর ওপর হামলা না করে অপ্রতিমকে আগে ডেকে নেওয়া হলো কেন? পুলিশ বলছে, পরিকল্পনা করেই তাকে নির্জন জায়গায় নেওয়া হয়েছিল। এর অর্থ হতে পারে, অভিযুক্তরা জানত অপ্রতিম তাদের বিশ্বাস করে। আবার এটিও হতে পারে, পূর্বের কোনো বিরোধ মীমাংসা বা অন্য কোনো বিষয়ে কথা বলার অজুহাতে তাকে সেখানে নেওয়া হয়েছিল। কোনটি সত্য, তা ১৬৪ ধারার জবানবন্দি, ফোনের যোগাযোগের ইতিহাস এবং আগের সম্পর্কের তথ্য মিলিয়ে নির্ধারণ করতে হবে।

হত্যার আগে তুহিনের সঙ্গে অপ্রতিমের যোগাযোগ—এখানে লুকিয়ে থাকতে পারে মূল রহস্য

যুগান্তরের তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, অপ্রতিমের মুঠোফোনেও তুহিনের সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে এবং সিসিটিভিতে তাঁকে তুহিনের সঙ্গে দেখা যায়। একই কর্মকর্তা বলেছেন, তুহিন অপ্রতিমকে ডেকে নেয়। এই জায়গায় তদন্তের জন্য কয়েকটি তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: শেষ ৭২ ঘণ্টায় তুহিনের সঙ্গে কয়বার কথা হয়েছে, কে আগে ফোন করেছে, কোনো বার্তা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কথোপকথন হয়েছিল কি না, অপ্রতিম স্বেচ্ছায় বের হয়েছিল নাকি নির্দিষ্ট কারও ডাকে গিয়েছিল, এবং হত্যার আগে তাদের কোনো বিরোধের ঘটনা ঘটেছিল কি না। এসব তথ্যের পূর্ণাঙ্গ সময়রেখা প্রকাশ্যে এলে “আইফোনের জন্য হত্যা” তত্ত্বটি আরও শক্ত হবে, অথবা এর পেছনের অন্য উদ্দেশ্য সামনে আসতে পারে।

তুহিনের বাবার দোকানে কাজ করত—এটি মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন তথ্য

এই মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, তুহিন একসময় অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের মোবাইল ফোন বিক্রির দোকানে কাজ করতেন। কুমিল্লা জেলা পুলিশ সংবাদ সম্মেলনে জানায়, প্রায় দেড় বছর আগে কোটবাড়িতে ওই দোকান ছিল এবং তুহিন সেখানে কর্মরত ছিলেন। এই তথ্য মামলার প্রচলিত “রাস্তায় আইফোন দেখে লোভ” ব্যাখ্যার বাইরে একটি নতুন তদন্তের দরজা খুলে দেয়। কারণ তুহিন যদি পরিবারের ব্যবসায়িক পরিবেশে আগে কাজ করে থাকেন, তাহলে তিনি পরিবারের অবস্থান, চলাফেরা, ফোন ব্যবহার, আর্থিক সক্ষমতা কিংবা অপ্রতিমের অভ্যাস সম্পর্কে অন্যদের চেয়ে বেশি জানতেন কি না—সেটি তদন্তযোগ্য প্রশ্ন। এখানে কোনো অপরাধের সিদ্ধান্ত টানা হচ্ছে না। কিন্তু অপরাধের আগে ভিকটিম ও পরিবারের সঙ্গে অভিযুক্তের সম্পর্কের মাত্রা বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মোবাইল ফোন চুরি করা কি সত্যিই এত লাভজনক?

অপ্রতিমের ক্ষেত্রে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার তত্ত্ব এখন অনেকটাই শক্ত হয়েছে, কারণ একই ফোন তুহিনের বাসা থেকে উদ্ধার হয়েছে এবং পুলিশ বলছে তুহিন নিজে তার অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দিয়েছে। এমনকি প্রথমে তদন্তকারীদের ভিন্ন জায়গায় পাঠিয়ে পরে তাঁর নিজের বাড়ির তোষকের নিচ থেকে ফোনটি উদ্ধার করা হয়েছে বলে পুলিশের বক্তব্য। তবু প্রযুক্তিগতভাবে একটি প্রশ্ন করা যায়—একটি আইফোন চুরি করে সেটি ব্যবহার বা বিক্রি করা কতটা সহজ? অ্যাপলের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ‘ফাইন্ড মাই’ চালু থাকলে অ্যাক্টিভেশন লক স্বয়ংক্রিয়ভাবে সক্রিয় হয়। অ্যাপলের ভাষ্য অনুযায়ী, এ অবস্থায় মালিকের অ্যাপল অ্যাকাউন্টের অনুমতি ছাড়া ফোন মুছে নতুন করে সক্রিয় করা যায় না; চুরি হলে ফোনকে ‘লস্ট মোডে’ও নেওয়া যায়। অ্যাপল আরও বলছে, চুরি হওয়া ফোনকে ‘ফাইন্ড মাই’ থেকে সরিয়ে দিলে অ্যাক্টিভেশন লক উঠে যায় এবং তখন সেটি মুছে পুনরায় বিক্রি করা সহজ হয়। অর্থাৎ চুরি করা আইফোন পুরোপুরি নিরাপদে পুনরায় বিক্রি করা সহজ নয়, বিশেষ করে মালিক যদি ফাইন্ড মাই ও লস্ট মোড ব্যবহার করেন। তবে এর মানে এই নয় যে কিশোর অপরাধীরা এসব প্রযুক্তিগত ঝুঁকি বুঝে সবসময় সিদ্ধান্ত নেয়। একটি ফোনের প্রতি লোভ, দ্রুত অর্থের প্রয়োজন, যন্ত্রটি নিজের ব্যবহারের আকাঙ্ক্ষা কিংবা অপরাধী আচরণের আবেগপ্রবণতা—এসব কারণে ঝুঁকিপূর্ণ কাজও করা সম্ভব। তাই “আইফোন ট্র্যাক হয়, সুতরাং কেউ আইফোনের জন্য হত্যা করবে না”—এটি বৈজ্ঞানিক বা অপরাধতাত্ত্বিকভাবে চূড়ান্ত যুক্তি নয়। কিন্তু অপ্রতিমের ক্ষেত্রে একটি বিষয় অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ: ফোনটি উদ্ধার হওয়ার পর আইফোনের উদ্দেশ্যকে কেবল অনুমান বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ কমেছে।

তাহলে হত্যার পর ফোন লুকিয়ে রাখা হলো কেন?

পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, মৃত্যুর পর তুহিন ফোনটি নিয়ে পালায় এবং পরে ফোনটি তার নিজের বাড়ির তোষকের নিচে লুকিয়ে রাখে। এর মধ্যে তিনি প্রথমে তদন্তকারীদের ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় খোঁজ করতে বলেন বলেও পুলিশ জানিয়েছে। এখানে দুটি সম্ভাবনা পাশাপাশি দেখা দরকার। প্রথমটি সরল—অভিযুক্তরা ফোনটি নিজেদের কাছে রেখে দিতে চেয়েছিল, তাই লুকিয়ে রেখেছে। দ্বিতীয়টি হলো—হত্যার পর পরিস্থিতি বুঝে তারা ফোনটি কী করবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি এবং আতঙ্কে লুকিয়ে রাখে। অর্থাৎ ফোন উদ্ধার হওয়া আইফোন-তত্ত্বকে সমর্থন করে, কিন্তু ফোনের উদ্দেশ্যই যে হত্যার একমাত্র কারণ ছিল, সেটি একা প্রমাণ করে না।

তুহিনের বিরুদ্ধে আগের অভিযোগ: ছোট অপরাধ থেকে বড় অপরাধের দিকে?

অপ্রতিম হত্যার আগেও তুহিনের বিরুদ্ধে মোটরসাইকেল আত্মসাতের অভিযোগ ছিল। অভিযোগকারী আসাদুল্লাহ সোহাগের পরিবারের পক্ষ থেকে ২০২৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি সদর দক্ষিণ থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, সোহাগের ২ লাখ ৫ হাজার টাকার সুজুকি মোটরসাইকেল তুহিন নিয়ে ফেরত দেননি। একই ব্যক্তির দাবি, পুলিশ তখন মামলা না নিয়ে সাধারণ ডায়েরি গ্রহণ করেছিল এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কথা বলে ব্যবস্থা নেয়নি। এই রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগটি অবশ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য; স্বাধীনভাবে প্রমাণিত তথ্য নয়। এখানে টুডে টিভি বিডির অনুসন্ধানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—২০২৫ সালের অভিযোগটির তদন্ত হয়েছিল কি না, মোটরসাইকেলটি কখনো উদ্ধার হয়েছিল কি না, তুহিনের বিরুদ্ধে কোনো মামলা আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত হয়েছিল কি না এবং ওই ঘটনার সময় স্থানীয় পুলিশ বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ তাঁর বিষয়ে কী জানত? কারণ যদি আগের অভিযোগের নথি সক্রিয় থাকে, তাহলে তুহিনের অপরাধপ্রবণতার ইতিহাস এবং বর্তমান মামলার আচরণগত ধারাবাহিকতা আরও ভালোভাবে বোঝা যাবে।

‘ক্রাইম সেটাপ’ ও টিকটক: অপরাধের সংস্কৃতির সঙ্গে কি সম্পর্ক?

যুগান্তরের স্থানীয় অনুসন্ধানে তুহিন ও তাঁর সহযোগীদের ‘ক্রাইম সেটাপ’ নামের একটি কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে চলাফেরার কথা এসেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা মোটরসাইকেল নিয়ে এলাকায় ঘুরত এবং নিয়মিত টিকটক করত। পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও বলেছেন, তুহিনের বিরুদ্ধে এলাকায় চুরি ও মাদকের অভিযোগের কথা পাওয়া গেছে এবং তিনি কিছু যুবককে নিয়ে দলবদ্ধভাবে চলাফেরা করতেন। পুলিশ সংবাদ সম্মেলনেও জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা টিকটক করত এবং তাদের কর্মকাণ্ড অনেকটা কিশোর অপরাধী চক্রের মতো। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা জরুরি—টিকটক করা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলবদ্ধ ছবি-ভিডিও থাকা নিজে অপরাধের প্রমাণ নয়। কিন্তু যদি সেই অনলাইন উপস্থিতি বাস্তব অপরাধচক্র, মাদক, অস্ত্র, দখল বা সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে সেটি তদন্তের পারিপার্শ্বিক প্রমাণ হতে পারে।

আরেকটি চাঞ্চল্যকর প্রশ্ন: অপ্রতিমের মা কি লক্ষ্য ছিলেন?

মামলার সবচেয়ে কম আলোচিত কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তদন্ত-সূত্রগুলোর একটি এসেছে অপ্রতিমের মা ড. নাহিদা বেগমের অতীত দায়িত্ব থেকে। তিনি ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের শুরু পর্যন্ত কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টরের দায়িত্বে ছিলেন। স্থানীয় একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় মাদক সেবনের অভিযোগে সালমানপুর এলাকার কয়েকজন কিশোরকে আটক করে প্রক্টরিয়াল কর্তৃপক্ষ; পরে তাদের পুলিশের কাছে দেওয়া হয়। কিছু প্রতিবেদনে এই সংখ্যা আটজন বলা হয়েছে এবং বলা হয়েছে, ওই ঘটনার পর স্থানীয় কিশোর গ্যাং বা মাদকচক্রের কোনো অংশ নাহিদা বেগমের ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছিল কি না, তদন্তকারীরা সেটিও খতিয়ে দেখছেন। এখানে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি হলো—অপ্রতিম কি তাঁর মায়ের কারণে লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল? এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য তথ্য থেকে এটি প্রমাণিত নয়। বরং এটি একটি তদন্ত-সম্ভাবনা হিসেবে উঠে এসেছে। কিন্তু যেহেতু তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নিজেই বলেছেন, “অপ্রতিমের মায়ের ওপর ক্ষুব্ধ কোনো চক্র” জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে, তাই এই সূত্রকে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ারও সুযোগ নেই।

আইফোন ও প্রতিশোধ—দুটো কি একসঙ্গে সত্য হতে পারে?

হ্যাঁ, তদন্তের দৃষ্টিতে দুটো একে অন্যকে বাদ দেয় না। একটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট হতে পারে—তুহিন ও অপ্রতিমের পূর্বপরিচয় ও বিরোধ ছিল; তুহিন সেই পরিচয়ের সুযোগে অপ্রতিমকে নির্জন স্থানে নিয়ে যায়; সেখানে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়; অপ্রতিম বাধা দেয়; সংঘর্ষ বাড়ে এবং হত্যাকাণ্ড ঘটে। অন্য একটি সম্ভাবনা—আইফোন ছিল পরিকল্পনার মূল কারণ, আর পূর্বপরিচয় শুধু ভিকটিমকে নির্জনে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। আরেকটি সম্ভাবনা—আইফোন ছিল একটি অংশ; এর সঙ্গে পূর্বের বিরোধ বা অন্য কোনো ব্যক্তিগত/সাংগঠনিক উদ্দেশ্যও ছিল। বর্তমান তদন্তের প্রকাশ্য তথ্য এই তিনটির মধ্যে কোনটি একমাত্র সত্য, তা এখনো চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করে না।

তিন আসামির ১৬৪ ধারার জবানবন্দি—তবু তদন্ত শেষ নয়

২০ সেপ্টেম্বর রাতে তুহিন, ফাহাদ ও কামরুল আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে পুলিশ ও আদালত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অন্যদিকে সিয়ামকে সরাসরি হত্যায় অংশ নেওয়া ব্যক্তি হিসেবে নয়, ঘটনার কথা জেনেও গোপন করার অভিযোগে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তুহিন হত্যার পর সিয়ামের সঙ্গে প্রায় দেড় ঘণ্টা আড্ডা দিয়েছিল এবং ঘটনা সম্পর্কে তাকে জানিয়েছিল—এটি পুলিশ-সূত্রের দাবি। এখানে আবারও আইনি সীমারেখা গুরুত্বপূর্ণ। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে, কিন্তু তা তদন্তের সব প্রশ্নের বিকল্প নয়। জবানবন্দির বক্তব্য অন্যান্য আলামত, সিসিটিভি, ফোনের তথ্য এবং ময়নাতদন্তের ফলের সঙ্গে মিলতে হবে।

অপ্রতিমের মৃত্যুর আসল মোটিভ বুঝতে যে সাতটি তথ্য এখনো দরকার

এই মামলার প্রকৃত উদ্দেশ্য নির্ধারণে কয়েকটি তথ্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করবে—তুহিন ও অপ্রতিমের আগের বিরোধের প্রকৃতি; হত্যার আগে তাঁদের শেষ যোগাযোগ; অপ্রতিমকে পাহাড়ে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট সময়; তুহিনের বাবার দোকানের সঙ্গে তাঁর পুরোনো সম্পর্ক ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ; ২০২৫ সালের মোটরসাইকেল অভিযোগের পূর্ণ নথি; ‘ক্রাইম সেটাপ’ চক্রের সঙ্গে তাঁদের প্রকৃত সম্পর্ক; এবং ড. নাহিদা বেগমকে ঘিরে আগের কোনো হুমকি বা বিরোধের নথি। এই তথ্যগুলোর কোনোটিই আলাদা করে হত্যার উদ্দেশ্য প্রমাণ করে না। কিন্তু সবগুলো পাশাপাশি রাখলে আইফোন ছিল কারণ, নাকি সুযোগ; পূর্বের বিরোধ ছিল মূল, নাকি পার্শ্ববর্তী; আর অপ্রতিম ছিল লক্ষ্য, নাকি শুধু সুযোগ পাওয়া ভিকটিম—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অনেক বেশি পরিষ্কার হতে পারে।

টুডে টিভি বিডির অনুসন্ধানী পর্যবেক্ষণ

অপ্রতিম হত্যার প্রথমদিকে আইফোনের তত্ত্ব নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ছিল। একটি আইফোন, বিশেষ করে ‘ফাইন্ড মাই’ ও অ্যাক্টিভেশন লকের মতো নিরাপত্তা ব্যবস্থাসম্পন্ন ফোন, চুরি করে সহজে ব্যবহার বা বিক্রি করা যায় না—এটি বাস্তব। কিন্তু ২০ সেপ্টেম্বরের পর ঘটনাটির কিছু প্রমাণ সেই প্রশ্নের জবাবও দিয়েছে। ফোনটি সত্যিই অভিযুক্ত তুহিনের বাড়ি থেকে উদ্ধার হয়েছে। পুলিশের দাবি অনুযায়ী, তুহিন নিজেই প্রথমে ফোনের অবস্থান গোপন করার চেষ্টা করে পরে নিজের বাড়িতে থাকা ফোনের কথা জানায়। তিন আসামি আদালতে হত্যার দায় স্বীকারও করেছে। অতএব আইফোন যে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল, এখন সেটি শক্তিশালী তদন্ত-তথ্য। কিন্তু একই সঙ্গে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা যখন বলছেন—“শুধু আইফোনের জন্য নয়, পূর্বের বিরোধও ছিল”—তখন মামলাটিকে শুধু ‘একটি ফোনের জন্য ১৩ বছরের শিশুকে হত্যা’ শিরোনামে আটকে রাখা উচিত হবে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নতুন সূত্র হলো—অভিযুক্ত তুহিন শুধু এলাকার একজন কিশোর নয়; তিনি অপ্রতিমের পরিবারের সঙ্গে আগে থেকেই পরিচিত ছিলেন এবং অপ্রতিমের বাবার মোবাইল ফোনের দোকানে কাজও করেছেন। এই সম্পর্কের পূর্ণ প্রকৃতি এখনো জনসমক্ষে আসেনি। এ কারণেই অপ্রতিম হত্যার চূড়ান্ত প্রশ্নটি এখন আর শুধু “আইফোনের জন্য কি একটি শিশুকে হত্যা করা যায়?”—এখানে থেমে নেই। বরং প্রশ্নটি হলো—

আইফোন কি ছিল হত্যার উদ্দেশ্য, নাকি হত্যার পর পাওয়া সবচেয়ে দৃশ্যমান আলামত?

অপ্রতিম ও তুহিনের পুরোনো বিরোধটি কী ছিল?

তুহিন পরিবারের সঙ্গে আগে কাজ করায় কি অপ্রতিমের গতিবিধি ও পরিবারের তথ্য সম্পর্কে বিশেষভাবে জানত?

কিশোর গ্যাং ও মাদকচক্রের সঙ্গে এই ঘটনার কোনো সম্পর্ক আছে কি?

অপ্রতিমের মা নাহিদা বেগমের প্রক্টর হিসেবে নেওয়া আগের পদক্ষেপের সঙ্গে কোনো প্রতিশোধের যোগ আছে কি?

আর শেষ পর্যন্ত—অপ্রতিমকে কি কেবল একটি ফোনের জন্য হত্যা করা হয়েছিল, নাকি একটি পুরোনো সম্পর্ক, বিরোধ ও অপরাধী চক্রের জালে পড়ে সে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল?

তিন আসামির স্বীকারোক্তি এবং ফোন উদ্ধারের পর তদন্তের একটি বড় অংশ পরিষ্কার হয়েছে। কিন্তু মোটিভের পূর্ণ ছবি এখনো অসম্পূর্ণ। আর সেই কারণেই তদন্তের পরবর্তী ধাপ হওয়া উচিত শুধু অভিযোগপত্র দ্রুত দেওয়া নয়; বরং অপ্রতিমের সঙ্গে অভিযুক্তদের পূর্বসম্পর্ক, পুরোনো বিরোধ, পারিবারিক পরিচয় এবং স্থানীয় অপরাধচক্রের সংযোগও নথিভুক্তভাবে বের করে আনা। কারণ একটি আইফোনের দাম যতই হোক, একটি ১৩ বছর বয়সী শিশুর জীবনের মূল্য তার চেয়ে অসীম বেশি। আর যদি শেষ পর্যন্ত প্রমাণ হয় যে ফোনটি ছিল কেবল অজুহাত বা তাৎক্ষণিক উপলক্ষ, তাহলে অপ্রতিম হত্যার প্রকৃত গল্প আরও ভয়াবহ হবে। তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, যুগান্তর, দ্য ডেইলি স্টার, সমকাল, জাগোনিউজ২৪, রাইজিংবিডি, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট প্রকাশ্য তথ্য, বাংলাদেশ পুলিশ ও প্রকাশ্য আদালত-সংশ্লিষ্ট তথ্য এবং অ্যাপল সাপোর্টের নিরাপত্তা নির্দেশিকা।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments