কীভাবে করা হয়, কতদিন লাগে, ব্যথা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কী, কারা করতে পারবেন, খরচ কত এবং চিকিৎসা নেওয়ার আগে কী জানতে হবে
স্বাস্থ্য ডেস্ক | TODAY TV BD
মলদ্বারের পাশে বারবার ফোঁড়া হওয়া, পুঁজ পড়া, ক্ষত শুকিয়ে আবার খুলে যাওয়া কিংবা দীর্ঘদিন ধরে ব্যথা ও অস্বস্তি—এসব সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে অ্যানাল ফিস্টুলা বা মলদ্বারের অস্বাভাবিক নালি। এই রোগের চিকিৎসায় প্রচলিত অস্ত্রোপচারের পাশাপাশি আয়ুর্বেদের একটি প্যারাসার্জিক্যাল পদ্ধতি হিসেবে বহু বছর ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে ক্ষারসূত্র থেরাপি।
সহজভাবে বললে, ক্ষারসূত্র হলো বিশেষ ওষুধে প্রলেপ দেওয়া একটি চিকিৎসা-সুতো, যা সাধারণত ফিস্টুলার নালির ভেতর দিয়ে বসানো হয়। এরপর নির্দিষ্ট সময় পরপর সুতো পরিবর্তন করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় রোগাক্রান্ত নালির টিস্যু ধীরে ধীরে কেটে ও পরিষ্কার হতে থাকে এবং একই সঙ্গে ভেতর থেকে ক্ষত শুকানোর প্রক্রিয়া এগোয়।
তবে একটি বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার করা জরুরি—ক্ষারসূত্র সব ধরনের পাইলস, ফিশার বা ফিস্টুলার একক কিংবা নিশ্চিত চিকিৎসা নয়। এর সবচেয়ে বেশি গবেষণা হয়েছে অ্যানাল ফিস্টুলা নিয়ে। পাইলস ও মলদ্বারের ফাটল বা ফিশারের ক্ষেত্রে গবেষণা তুলনামূলকভাবে ছোট এবং সীমিত। তাই রোগ নির্ণয় না করে শুধু নাম শুনে এই চিকিৎসা শুরু করা ঠিক নয়।
ক্ষারসূত্রে কী থাকে?
প্রচলিত ও বহুল গবেষণাকৃত ক্ষারসূত্রে একটি সার্জারির উপযোগী সুতোতে কয়েক ধরনের ভেষজ উপাদানের প্রলেপ দেওয়া হয়।
এর মধ্যে থাকে—
অপামার্গ ক্ষার: অপামার্গ গাছ থেকে তৈরি এক ধরনের ক্ষারীয় পদার্থ। এর রাসায়নিক ধর্ম টিস্যুর ওপর স্থানীয়ভাবে ক্ষয় বা পরিষ্কার করার প্রভাব ফেলতে পারে।
স্নুহী গাছের দুধসদৃশ রস: সুতোয় প্রলেপ ধরে রাখতে এটি ব্যবহৃত হয় এবং স্থানীয় টিস্যুর ওপরও প্রভাব ফেলে।
হলুদের গুঁড়া: আয়ুর্বেদে এটি দীর্ঘদিন ধরে ক্ষত পরিচর্যার উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত। ক্ষারসূত্রের রাসায়নিক বিশ্লেষণেও হলুদের প্রধান উপাদান কারকিউমিন শনাক্ত হয়েছে।
অনেক প্রতিষ্ঠানে একটি প্রচলিত পদ্ধতিতে সুতোয় মোট ২১টি প্রলেপ দেওয়া হয়। তবে সব ক্ষারসূত্রের প্রস্তুতিপদ্ধতি একেবারে একই—এমনটি বলা ঠিক নয়। তাই রোগীর জন্য আসল বিষয় হলো সুতোটি মানসম্মত, জীবাণুমুক্ত এবং প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত কি না।
ক্ষারসূত্র কি শুধু সুতো বেঁধে রাখার চিকিৎসা?
না। এটি সাধারণ বাঁধন নয়।
ফিস্টুলার নালির মধ্যে সুতো বসানোর পর ক্ষারযুক্ত প্রলেপ স্থানীয়ভাবে টিস্যুর ওপর কাজ করে। একই সঙ্গে সুতোয় টান থাকার কারণে নালির টিস্যু ধীরে ধীরে আলাদা হতে থাকে। এর পেছনে ক্ষত শুকানোর প্রক্রিয়াও চলতে থাকে। অর্থাৎ ধীরে কাটা এবং একই সঙ্গে ক্ষত শুকানো—এই দুই প্রক্রিয়া একসঙ্গে চলাই ক্ষারসূত্রের মূল ধারণা।
তাই এটিকে “একবার সুতো লাগালেই রোগ শেষ” ধরনের চিকিৎসা ভাবা ভুল।
ফিস্টুলা আসলে কী?
ফিস্টুলা হলো মলদ্বারের ভেতরের অংশ থেকে আশপাশের ত্বক পর্যন্ত তৈরি হওয়া একটি অস্বাভাবিক নালি। অনেক ক্ষেত্রে আগে মলদ্বারের পাশে ফোঁড়া হয়। ফোঁড়া ফেটে পুঁজ বের হওয়ার পর ক্ষত শুকিয়ে গেলেও ভেতরে একটি নালি থেকে যেতে পারে। পরে সেই নালি দিয়ে বারবার পুঁজ বা তরল বের হতে থাকে।
সাধারণ লক্ষণ হলো—
মলদ্বারের পাশে বারবার ফোঁড়া হওয়া, পুঁজ বা দুর্গন্ধযুক্ত তরল পড়া, একটি ছোট ছিদ্র থাকা, মাঝে মাঝে ব্যথা বা ফুলে যাওয়া এবং কিছুদিন পর পর একই জায়গায় সমস্যা ফিরে আসা।
সব ফিস্টুলা এক রকম নয়। কোনোটি ত্বকের কাছাকাছি ও ছোট, আবার কোনোটি মলদ্বারের নিয়ন্ত্রণকারী পেশির ভেতর দিয়ে যেতে পারে। জটিল ফিস্টুলায় একাধিক শাখা থাকতে পারে, আবার কিছু রোগের সঙ্গে এর সম্পর্কও থাকতে পারে। তাই চিকিৎসার আগে ফিস্টুলার পথ জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ক্ষারসূত্র কীভাবে করা হয়?
সাধারণত প্রথমে রোগীকে পরীক্ষা করে নিশ্চিত করা হয় যে সমস্যাটি ফিস্টুলা কি না এবং নালিটি কোথায় গেছে।
এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী মলদ্বারের পরীক্ষা, আল্ট্রাসনোগ্রাফি বা চৌম্বকীয় অনুরণনভিত্তিক বিশেষ পরীক্ষা করা হতে পারে। বিশেষ করে পুরোনো, বারবার হওয়া বা জটিল ফিস্টুলার ক্ষেত্রে ভেতরের পথ বোঝার জন্য এমন পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
চিকিৎসার সময় উপযুক্ত অবেদন দেওয়া হয়। এরপর একটি সরু যন্ত্র দিয়ে ফিস্টুলার বাহিরের মুখ থেকে নালির পথ অনুসরণ করে সুতোটি ভেতরের মুখ পর্যন্ত নেওয়া হয়। তারপর সুতোটি এমনভাবে বাঁধা হয় যাতে সেটি নালির ভেতরে থেকে ধীরে ধীরে কাজ করতে পারে।
এরপর রোগীকে নিয়মিত পরবর্তী সাক্ষাতে আসতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রায় এক সপ্তাহ পর পুরোনো সুতো বদলে নতুন ক্ষারসূত্র দেওয়া হয়। এভাবে নালিটি ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসে এবং শুকিয়ে যায়। একটি ছোট গবেষণায় সপ্তাহে একবার করে ১২ বার সুতো পরিবর্তনের পর প্রায় তিন মাসে সম্পূর্ণ নিরাময়ের উদাহরণ পাওয়া গেছে।
অর্থাৎ পুরো চিকিৎসা কয়েক দিনেই শেষ হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
কতদিন লাগে?
এটি রোগভেদে অনেকটাই বদলায়।
ভারতীয় চিকিৎসা গবেষণা পরিষদের নেতৃত্বে বহু-কেন্দ্রিক একটি গবেষণায় ২৬৫ রোগীর ক্ষারসূত্র চিকিৎসায় সবার ক্ষত সম্পূর্ণ শুকিয়েছিল, তবে মাঝারি সময় হিসেবে প্রায় ৮ সপ্তাহ লেগেছিল। প্রচলিত অস্ত্রোপচার করা ২৩৭ রোগীর ক্ষেত্রে সময় ছিল প্রায় ৪ সপ্তাহ। অর্থাৎ ক্ষারসূত্রে নিরাময় ধীর হতে পারে।
আরেকটি ৫০ রোগীর তুলনামূলক গবেষণায় ক্ষারসূত্রে গড়ে ৫৩ দিন এবং প্রচলিত ফিস্টুলা কাটার অস্ত্রোপচারে গড়ে ৩৫ দশমিক ৭ দিন সময় লেগেছিল। তবে ক্ষারসূত্র নেওয়া রোগীরা দৈনন্দিন কাজ থেকে গড়ে মাত্র ২ দশমিক ৭ দিন দূরে ছিলেন, যেখানে অস্ত্রোপচারের রোগীদের ক্ষেত্রে ছিল প্রায় ১৫ দশমিক ৫ দিন।
অর্থাৎ ক্ষারসূত্রের একটি সম্ভাব্য সুবিধা হলো—চিকিৎসার পুরো সময়কাল দীর্ঘ হলেও অনেক রোগী দৈনন্দিন জীবনে তুলনামূলক দ্রুত ফিরতে পারেন।
ব্যথা কতটা হয়?
ক্ষারসূত্রকে “ব্যথাহীন চিকিৎসা” বলা ঠিক নয়।
সুতো বসানোর সময় অবেদন দেওয়া হয়। কিন্তু পরে স্থানীয় জ্বালা, টান, অস্বস্তি এবং পায়খানার সময় ব্যথা হতে পারে। বিশেষ করে সুতো পরিবর্তনের সময় কিছুটা অস্বস্তি হওয়া স্বাভাবিক।
বহু-কেন্দ্রিক গবেষণায় ক্ষারসূত্র নেওয়া অধিকাংশ রোগীর স্থানীয় জ্বালাপোড়া ও ফিস্টুলার মুখ দিয়ে বাড়তি তরল বা পুঁজ বের হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
আরেকটি তুলনামূলক গবেষণায় প্রচলিত অস্ত্রোপচারের তুলনায় ক্ষারসূত্রের রোগীদের তীব্র ব্যথা কম ছিল। তবে ক্ষারসূত্রে ক্ষত শুকাতে বেশি সময় লেগেছিল এবং তরল বের হওয়ার প্রবণতা কিছুটা বেশি ছিল।
তাই বাস্তব চিত্র হলো—ব্যথা একেবারে নেই নয়, আবার বড় অস্ত্রোপচারের মতো দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতও সব ক্ষেত্রে হয় না।
কী কী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে?
ক্ষারসূত্রকে ঝুঁকিমুক্ত চিকিৎসা মনে করা উচিত নয়।
সাধারণ সমস্যা হিসেবে স্থানীয় জ্বালাপোড়া, অস্বস্তি, তরল বা পুঁজ বের হওয়া এবং অল্প রক্তপাত হতে পারে। সুতো ভুল জায়গায় বসানো হলে বা চিকিৎসা যথাযথভাবে না হলে অতিরিক্ত টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হলো মল ধরে রাখার ক্ষমতার সমস্যা। কিছু গবেষণায় ক্ষারসূত্রের পর সামান্য মল বা গ্যাস নিয়ন্ত্রণের সমস্যা দেখা গেছে। বড় গবেষণায় ক্ষারসূত্র নেওয়া আটজন রোগীর হালকা মল নিয়ন্ত্রণের সমস্যা হয়েছিল; অস্ত্রোপচারের গ্রুপে এমন সমস্যা হয়েছিল ১৩ জনের।
এ থেকে বোঝা যায়, ক্ষারসূত্রে ঝুঁকি কম হতে পারে, কিন্তু ঝুঁকি একেবারেই নেই—এমন দাবি করা ঠিক নয়।
কার ক্ষেত্রে বেশি সতর্কতা প্রয়োজন?
যাদের আগে থেকেই মল ধরে রাখার সমস্যা আছে, বারবার ফিস্টুলা হয়েছে, ফিস্টুলা খুব জটিল, একাধিক শাখা রয়েছে, মলদ্বারের নিয়ন্ত্রণকারী পেশির বড় অংশ জড়িত, কিংবা ক্রোন রোগের মতো অন্ত্রের প্রদাহজনিত রোগের সন্দেহ আছে—তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসা নির্বাচনের বিষয়টি আরও সতর্কভাবে দেখতে হয়। আন্তর্জাতিক মলদ্বার ও বৃহদান্ত্র সার্জারি বিশেষজ্ঞদের নির্দেশিকাতেও ফিস্টুলার পথ ও নিয়ন্ত্রণকারী পেশির অবস্থা বিবেচনা করে চিকিৎসা নির্বাচন করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গর্ভবতী নারী, রক্তপাতের সমস্যা আছে এমন ব্যক্তি, রক্ত পাতলা করার ওষুধ ব্যবহারকারী বা গুরুতর অন্য রোগে আক্রান্ত কেউ ক্ষারসূত্র নেবেন কি না, সেটি চিকিৎসকের মূল্যায়নের ভিত্তিতেই ঠিক করা উচিত।
কোনো ওষুধ নিজে থেকে বন্ধ করে ক্ষারসূত্র শুরু করা যাবে না।
ফোঁড়া বা পুঁজ জমে থাকলে কী হবে?
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ফিস্টুলার সঙ্গে যদি তীব্র ব্যথাযুক্ত ফোঁড়া বা পুঁজ জমে থাকে, তখন শুধু ক্ষারসূত্রের ওপর নির্ভর না করে আগে পুঁজ বের করার প্রয়োজন হতে পারে। মলদ্বারের আশপাশে তীব্র ফোঁড়ার ক্ষেত্রে দ্রুত পুঁজ বের করা চিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে আন্তর্জাতিক নির্দেশিকায় উল্লেখ আছে।
অর্থাৎ ব্যথা, ফুলে যাওয়া ও জ্বরসহ নতুন ফোঁড়া হলে আগে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।
পাইলসের চিকিৎসায় ক্ষারসূত্র কতটা কার্যকর?
পাইলসের ক্ষেত্রে ক্ষারসূত্র নিয়ে কিছু গবেষণা হয়েছে। একটি ছোট গবেষণায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় মাত্রার পাইলসের ২০ জন রোগীকে নিয়ে ক্ষারসূত্র ও রাবার ব্যান্ড দিয়ে চিকিৎসার তুলনা করা হয়েছিল। ফলাফল কিছু ক্ষেত্রে ক্ষারসূত্রের পক্ষে গেলেও গবেষণায় রোগী ছিল মাত্র ২০ জন এবং অনুসরণকাল ছিল মাত্র চার সপ্তাহ। তাই এটিকে শক্ত প্রমাণ বলা যায় না।
আরেকটি গবেষণায় ক্ষারসূত্রের সঙ্গে পাইলস কাটার অস্ত্রোপচারের তুলনা করা হয়েছিল এবং ইতিবাচক ফল পাওয়া যায়। কিন্তু এই গবেষণাগুলোর সংখ্যা ও পরিসর সীমিত।
তাই পাইলস হলেই ক্ষারসূত্র করতে হবে—এমন সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিকভাবে সমর্থন করা যায় না। পাইলসের মাত্রা, ভেতরের না বাইরের পাইলস, রক্তপাত ও মাংসপিণ্ড বেরিয়ে আসে কি না—এসব দেখে চিকিৎসা নির্বাচন করতে হয়।
মলদ্বারে ফাটল বা ফিশারের ক্ষেত্রে?
এখানেও প্রমাণ সীমিত।
৩০ জন রোগী নিয়ে একটি এলোমেলোভাবে ভাগ করা গবেষণায় ক্ষারসূত্রের সঙ্গে মলদ্বারের নিয়ন্ত্রণকারী পেশির একটি প্রচলিত অস্ত্রোপচার পদ্ধতির তুলনা করা হয়েছিল। দুই দলেই উন্নতি হয়েছিল, কিন্তু ক্ষারসূত্রের ক্ষেত্রে ব্যথা কমা, রক্তপাত বন্ধ হওয়া এবং ক্ষত শুকাতে তুলনামূলক বেশি সময় লেগেছিল। গবেষকেরা প্রচলিত অস্ত্রোপচারকে তুলনামূলকভাবে ভালো ফলদায়ক হিসেবে দেখেছেন।
তাই দীর্ঘদিনের মলদ্বারের ফিশারের চিকিৎসায় ক্ষারসূত্রকে নিশ্চিত বা সবার জন্য উপযোগী চিকিৎসা বলা যাবে না।
পাইলোনাইডাল সাইনাসে ব্যবহার?
নিতম্বের মাঝের উপরের দিকে চামড়ার নিচে ছোট নালি বা গর্ত তৈরি হয়ে চুল, ময়লা ও পুঁজ জমে যে সমস্যা হয়, তাকে পাইলোনাইডাল সাইনাস বলা হয়।
এ ক্ষেত্রেও ক্ষারসূত্র ব্যবহারের কিছু রোগীভিত্তিক প্রতিবেদন পাওয়া যায়। কিন্তু অধিকাংশ প্রমাণ ছোট গবেষণা বা একক রোগীর প্রতিবেদনের পর্যায়ে। তাই ফিস্টুলার মতো শক্ত গবেষণা এখানে নেই।
ক্ষারসূত্রের পক্ষে গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
ক্ষারসূত্র নিয়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য গবেষণাগুলোর একটি ১৯৯১ সালে ভারতীয় চিকিৎসা গবেষণা পরিষদের সহায়তায় চারটি কেন্দ্রে করা হয়েছিল। সেখানে মোট ২৬৫ জন ক্ষারসূত্র এবং ২৩৭ জন প্রচলিত অস্ত্রোপচারের রোগী ছিলেন। দুই দলেই সম্পূর্ণ নিরাময় হয়েছিল। ক্ষারসূত্রে নিরাময় পেতে বেশি সময় লাগলেও এক বছরের হিসাবের জন্য পাওয়া ১৫০ জন করে রোগীর তথ্য বিশ্লেষণে পুনরায় ফিস্টুলা হওয়ার হার ছিল ক্ষারসূত্রে ৪ শতাংশ এবং অস্ত্রোপচারে ১১ শতাংশ।
কিন্তু এখানেও একটি সতর্কতা আছে। এই গবেষণা তিন দশকের বেশি পুরোনো। আধুনিক অস্ত্রোপচার পদ্ধতি, রোগী নির্বাচন, চিত্রভিত্তিক পরীক্ষা এবং চিকিৎসা-পরবর্তী পরিচর্যা অনেক বদলেছে। তাই পুরোনো গবেষণার ফল আজকের সব রোগীর ক্ষেত্রে হুবহু প্রযোজ্য হবে—এমন দাবি করা যায় না।
তাহলে ক্ষারসূত্রের বড় সুবিধা কী?
গবেষণাগুলো থেকে মোটামুটি তিনটি বিষয় সামনে আসে।
প্রথমত, কিছু ফিস্টুলায় বড় খোলা ক্ষত তৈরি না করেও ধীরে ধীরে নালির চিকিৎসা করা সম্ভব হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, অনেক রোগী চিকিৎসার মধ্যেই দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে যেতে পারেন।
তৃতীয়ত, কিছু গবেষণায় পুনরায় ফিস্টুলা হওয়ার হার নিয়ে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে অসুবিধাও আছে—চিকিৎসা দীর্ঘ হতে পারে, বারবার হাসপাতালে বা ক্লিনিকে যেতে হয়, সুতো বদলাতে হয় এবং জ্বালা বা তরল বের হওয়ার মতো অস্বস্তি থাকতে পারে।
আধুনিক চিকিৎসার তুলনায় ক্ষারসূত্র কোথায় দাঁড়ায়?
এখানে “কোনটি সবার জন্য ভালো”—এমন সহজ উত্তর নেই।
সাধারণ ও নিচু ফিস্টুলার ক্ষেত্রে মলদ্বারের নিয়ন্ত্রণকারী পেশির খুব সামান্য অংশ জড়িত থাকলে প্রচলিত ফিস্টুলা কাটার অস্ত্রোপচার এখনও আন্তর্জাতিক চিকিৎসা নির্দেশিকায় গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা হিসেবে রয়েছে। আবার জটিল ফিস্টুলায় নিয়ন্ত্রণকারী পেশি রক্ষা করে অন্য পদ্ধতি বেছে নেওয়া হতে পারে।
ক্ষারসূত্রও কিছু রোগীর জন্য একটি বিকল্প হতে পারে। কিন্তু সিদ্ধান্তটি হওয়া উচিত রোগের নকশা, পেশির জড়িত থাকার মাত্রা, আগে চিকিৎসা ব্যর্থ হয়েছে কি না, রোগীর অন্যান্য অসুস্থতা এবং রোগীর নিজের পছন্দ বিবেচনা করে।
খরচ কত?
ক্ষারসূত্রের খরচ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা অঙ্কের কথা দেখা যায়। কিন্তু বাংলাদেশে বর্তমানে সবার জন্য প্রযোজ্য একটি নির্দিষ্ট সরকারি মূল্যতালিকা পাওয়া যায়নি।
একটি ভারতীয় গবেষণায় ২০১০–২০১১ সালের রোগীদের ক্ষেত্রে ক্ষারসূত্রের গড় চিকিৎসা খরচ ভারতীয় ১৬৬ রুপি এবং প্রচলিত অস্ত্রোপচারের ৪৬৪ রুপি ছিল। কিন্তু প্রায় দেড় দশক আগের এই অঙ্ক দিয়ে এখনকার বাংলাদেশে চিকিৎসার খরচ বোঝানো যাবে না।
বাংলাদেশে মোট খরচ নির্ভর করতে পারে রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ, সুতো পরিবর্তনের সংখ্যা, অবেদন, ওষুধ, dressing এবং ফলোআপের ওপর।
তাই চিকিৎসা শুরু করার আগে লিখিতভাবে জেনে নেওয়া উচিত—মোট খরচে কী কী অন্তর্ভুক্ত এবং কতবার সুতো পরিবর্তন করতে হবে।
বাংলাদেশে কোথায় খোঁজ করবেন?
ঢাকার মিরপুর-১৩-এ সরকারি ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বর্তমান প্রতিষ্ঠান তালিকায় হাসপাতালটির ঠিকানা মিরপুর-১৩, ঢাকা-১২১৬ এবং যোগাযোগ নম্বর হিসেবে ০২-৯০৩২০৪৮ ও ০১৭৪০৫৬৬৮২৭ দেওয়া আছে। প্রতিষ্ঠানটির সরকারি ওয়েবসাইট অনুযায়ী সেখানে ১০০ শয্যার হাসপাতাল, চিকিৎসা, শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম রয়েছে।
তবে বর্তমানে সেখানে ক্ষারসূত্র চিকিৎসা নিয়মিতভাবে চালু আছে কি না, তা সরকারি ওয়েবসাইটে স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়নি। তাই যাওয়ার আগে ফোন করে শল্যতন্ত্র বিভাগে ক্ষারসূত্র চিকিৎসা, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক এবং মোট সম্ভাব্য খরচ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া উচিত।
সম্প্রতি প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এই সরকারি হাসপাতালে কম খরচে বিভিন্ন বিশেষায়িত আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা সেবা দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে; তবে সেটিও ক্ষারসূত্রের নির্দিষ্ট মূল্যতালিকা নয়।
চিকিৎসা নিতে গেলে কোন চিকিৎসক খুঁজবেন?
ক্ষারসূত্রের ক্ষেত্রে আয়ুর্বেদিক শল্যচিকিৎসায় প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, বিশেষ করে শল্যতন্ত্র বিষয়ে অভিজ্ঞ চিকিৎসক খোঁজা যুক্তিযুক্ত।
একই সঙ্গে জটিল ফিস্টুলা, বারবার ফিরে আসা রোগ, মল নিয়ন্ত্রণের আগের সমস্যা কিংবা মলদ্বারের নিয়ন্ত্রণকারী পেশি জড়িত থাকার সন্দেহ থাকলে মলদ্বার ও বৃহদান্ত্রের অস্ত্রোপচার বিশেষজ্ঞের মতামতও নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
দুই ধরনের চিকিৎসার মতামত নেওয়া রোগীর জন্য বিভ্রান্তিকর নয়; বরং নিজের রোগের অ্যানাটমি ও বিকল্পগুলো বোঝার সুযোগ বাড়ায়।
রোগীর সবচেয়ে বড় ভুলগুলো কী?
ফিস্টুলাকে পাইলস ভেবে বছরের পর বছর ওষুধ খাওয়া, ফোঁড়া হলে শুধু ব্যথার ওষুধ খেয়ে রাখা, অনলাইনে পাওয়া ক্ষারসূত্র কিনে নিজেরা ব্যবহার করা এবং চিকিৎসার মাঝখানে সুতো নিজে কেটে ফেলা—এসব বিপজ্জনক হতে পারে।
ক্ষারসূত্র একটি চিকিৎসা-প্রক্রিয়া, ঘরোয়া পদ্ধতি নয়।
কখন দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে?
ক্ষারসূত্র চলাকালে হালকা জ্বালা বা অস্বস্তি থাকতে পারে। কিন্তু প্রচণ্ড ব্যথা, দ্রুত বাড়তে থাকা ফোলা, বেশি রক্তপাত, জ্বর বা কাঁপুনি, পুঁজ আটকে গিয়ে নতুন করে বড় ফোঁড়া হওয়া, প্রস্রাবের সমস্যা কিংবা হঠাৎ মল বা গ্যাস ধরে রাখতে না পারার মতো সমস্যা হলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
রোগীর জন্য শেষ কথা
ক্ষারসূত্রকে ঘিরে অতিরঞ্জিত প্রচারণা যেমন ঠিক নয়, তেমনি এটিকে পুরোপুরি অকার্যকর বলাও গবেষণার সঙ্গে মেলে না।
অ্যানাল ফিস্টুলায় ক্ষারসূত্র নিয়ে উল্লেখযোগ্য চিকিৎসা-গবেষণা রয়েছে। বড় একটি পুরোনো বহু-কেন্দ্রিক গবেষণায় এর কার্যকারিতা দেখা গেছে, পরবর্তী ছোট গবেষণাগুলোতেও কিছু ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। তবে চিকিৎসাটি ধীরগতির হতে পারে এবং জ্বালা, তরল বের হওয়া, ব্যথা ও বিরল ক্ষেত্রে মল নিয়ন্ত্রণের সমস্যার মতো ঝুঁকি রয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ফিস্টুলা কী ধরনের, কতটা জটিল এবং মলদ্বারের নিয়ন্ত্রণকারী পেশির সঙ্গে এর সম্পর্ক কী—তা না জেনে শুধু চিকিৎসার নাম দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
ক্ষারসূত্র নেওয়ার আগে রোগীর অন্তত এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা উচিত—
আমার রোগটি কি সত্যিই ফিস্টুলা?
নালিটি কোথা দিয়ে গেছে?
মল নিয়ন্ত্রণকারী পেশি কতটা জড়িত?
আমার ক্ষেত্রে ক্ষারসূত্রের বিকল্প কী?
কত সপ্তাহ চিকিৎসা চলবে?
কতবার সুতো বদলাতে হবে?
এবং সব মিলিয়ে আনুমানিক কত খরচ হবে?
এই তথ্যগুলো পরিষ্কারভাবে জেনে চিকিৎসা শুরু করাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
তথ্যসূত্র:
১. ভারতীয় চিকিৎসা গবেষণা পরিষদের বহু-কেন্দ্রিক এলোমেলোভাবে নিয়ন্ত্রিত গবেষণা—ফিস্টুলা চিকিৎসায় ক্ষারসূত্র ও প্রচলিত অস্ত্রোপচারের তুলনা। ইন্ডিয়ান জার্নাল অব মেডিকেল রিসার্চ, ১৯৯১। ২. কলকাতার আর জি কর মেডিকেল কলেজের গবেষণা—ক্ষারসূত্র ও ফিস্টুলা কাটার অস্ত্রোপচারের তুলনামূলক গবেষণা। ৩. ক্ষারসূত্রে ব্যবহৃত সুতোর রাসায়নিক বিশ্লেষণ—জার্নাল অব এথনোফার্মাকোলজি, ১৯৯০। ৪. ফিস্টুলায় ক্ষারসূত্র-পরবর্তী আল্ট্রাসনোগ্রাফিভিত্তিক ছোট গবেষণা। ৫. দ্বিতীয় ও তৃতীয় মাত্রার পাইলসের ক্ষেত্রে ক্ষারসূত্র ও রাবার ব্যান্ড চিকিৎসার তুলনামূলক গবেষণা। ৬. দীর্ঘস্থায়ী মলদ্বারের ফিশারে ক্ষারসূত্র ও অস্ত্রোপচারের তুলনামূলক গবেষণা। ৭. মলদ্বারের ফোঁড়া ও ফিস্টুলা ব্যবস্থাপনায় মলদ্বার ও বৃহদান্ত্র সার্জারি বিশেষজ্ঞদের ২০২২ সালের চিকিৎসা নির্দেশিকা। ৮. বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিষ্ঠান তালিকা—সরকারি ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মিরপুর-১৩, ঢাকা। ৯. সরকারি ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সরকারি ওয়েবসাইট।
স্বাস্থ্য-সতর্কতা: এই প্রতিবেদন জনসচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি। এটি কোনো নির্দিষ্ট রোগীর রোগ নির্ণয় বা ব্যক্তিগত চিকিৎসার বিকল্প নয়। ক্ষারসূত্র প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের মূল্যায়ন ও যথাযথ চিকিৎসা-পরিবেশে করানো উচিত।




