Homeটুডে নেশনএলএনজি টার্মিনালে স্বস্তি ফিরলেও কাটেনি গ্যাস সংকট

এলএনজি টার্মিনালে স্বস্তি ফিরলেও কাটেনি গ্যাস সংকট

মহেশখালীর দুই ভাসমান টার্মিনাল থেকে সরবরাহ ১,০১৫ মিলিয়ন ঘনফুট, জাতীয় চাহিদার তুলনায় ঘাটতি এখনো বড়

মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ আবার প্রায় স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরেছে। চলতি সপ্তাহে দুটি টার্মিনাল মিলিয়ে দৈনিক সরবরাহ প্রায় ১ হাজার ১৫ মিলিয়ন ঘনফুটে উঠেছে, যা তাদের সম্মিলিত সক্ষমতার প্রায় ৯২ শতাংশ। তবে টার্মিনাল স্বাভাবিক হওয়া সত্ত্বেও দেশে গ্যাসের সামগ্রিক ঘাটতি কাটেনি। শনিবার দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয় পর্যায়ে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ২ হাজার ৬২৪ মিলিয়ন ঘনফুট, যেখানে আনুমানিক চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট।

গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় মহেশখালীর এই দুটি ভাসমান টার্মিনাল গুরুত্বপূর্ণ। টার্মিনালে এলএনজি পৌঁছানোর পর তা রিগ্যাসিফাই করে জাতীয় গ্যাস নেটওয়ার্কে দেওয়া হয়। টার্মিনালের সক্ষমতা কমে গেলে সরাসরি বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা, সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক গ্রাহকের ওপর চাপ পড়ে। এখন টার্মিনাল দুটি প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরলেও জাতীয় চাহিদার তুলনায় মোট সরবরাহের ঘাটতি থেকেই গেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশে

বাংলাদেশের গ্যাস পরিস্থিতির সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সরাসরি যোগসূত্র তৈরি হয়েছে এলএনজি আমদানির মাধ্যমে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং মধ্যপ্রাচ্যের এলএনজি সরবরাহে বড় ধাক্কায় এশিয়ার স্পট বাজারে এলএনজির দাম বেড়ে প্রায় ৩০ ডলার প্রতি এমএমবিটিইউতে উঠেছে। যুদ্ধের আগে এই দাম ছিল প্রায় ১০ ডলারের কাছাকাছি।

বাংলাদেশের মোট গ্যাস প্রবাহের প্রায় দুই-পঞ্চমাংশ এখন আমদানি করা এলএনজি থেকে আসে। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে আমদানির ওপর এই নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। কাতার বাংলাদেশকে বড় পরিমাণ এলএনজি সরবরাহ করে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দুটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকে বাংলাদেশ প্রায় ৪ দশমিক ১৫ মিলিয়ন টন এলএনজি পেয়েছে।

স্পট মার্কেটে বাড়ছে আমদানি ব্যয়

গ্যাস সরবরাহ ধরে রাখতে বাংলাদেশকে বিকল্প এলএনজি কার্গো কিনতে হচ্ছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে অনুমোদিত চারটি স্পট এলএনজি কার্গোর মধ্যে সবচেয়ে ব্যয়বহুলটির দাম ছিল প্রতি এমএমবিটিইউ ২৮ দশমিক ০৩ ডলার। আগস্টের শেষ দিকে অনুমোদিত দুটি কার্গোর দাম ছিল ২৪ দশমিক ৬২ ও ২৪ দশমিক ২৫ ডলার। অর্থাৎ অল্প সময়ের মধ্যেই প্রতি ইউনিটে কয়েক ডলার বাড়তি ব্যয় হয়েছে।

এলএনজির এই বাড়তি দাম শুধু আমদানি বিল বাড়াচ্ছে না, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পের ওপরও চাপ তৈরি করছে। রয়টার্স জানিয়েছে, বাংলাদেশে আমদানি করা এলএনজির ওপর উচ্চ নির্ভরতার কারণে গ্যাসের ঘাটতি শিল্প উৎপাদন ও বিদ্যুৎ সরবরাহে প্রভাব ফেলছে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক কারখানা উৎপাদন কমিয়েছে বা সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। পোশাক শিল্পেও শিপমেন্ট বিলম্ব এবং উৎপাদন কমার খবর এসেছে।

টার্মিনাল ঠিক হলেও জাতীয় ঘাটতি কেন

গ্যাস বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যায়, এলএনজি টার্মিনাল কতটা গ্যাস পাঠাতে পারছে আর দেশে মোট কত গ্যাস আছে—দুটো বিষয় এক নয়। টার্মিনালে সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন কম থাকলে জাতীয় চাহিদা পূরণ হয় না। বর্তমানে দেশীয় ক্ষেত্র থেকে প্রায় ১ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং আমদানি করা এলএনজি থেকে প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। ফলে সরবরাহ ও চাহিদার ব্যবধান থেকেই যাচ্ছে।

বিকল্প হিসেবে ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও চীনসহ অন্য বাজার থেকে এলএনজি সংগ্রহের চেষ্টা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিশ্ববাজারে সরবরাহ কমে গেলে শুধু সরবরাহকারী বদলালেই দাম কমবে না। বাংলাদেশকে তখনও একই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মধ্যে কার্গো কিনতে হবে।

দেশের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো, আমদানির উৎস বৈচিত্র্য আনা এবং উচ্চমূল্যের এলএনজির ওপর নির্ভরতা কমানো—দীর্ঘমেয়াদে এই তিনটি বিষয়ই গ্যাস ব্যবস্থাপনায় বড় হয়ে উঠছে। আপাতত মহেশখালীর টার্মিনালে সরবরাহ বাড়ায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে, কিন্তু জাতীয় গ্যাস ঘাটতি এখনো বড়ই রয়ে গেছে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স, দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, বিডিনিউজ২৪, প্রথম আলো।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments