মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুটগুলোতে জাহাজ চলাচল আরও কমেছে। সৌদি আরবের অনুরোধের পর হুথি হামলা নিয়ন্ত্রণে ইরানকে প্রভাব খাটাতে বলেছে বেইজিং—এদিকে বিকল্প পথে তেল পাঠানোর চেষ্টা কিছুটা স্বস্তি দিলেও সরবরাহ ঝুঁকি কাটেনি।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল আরও কমে বুধবার মাত্র তিনটিতে নেমে এসেছে। ১৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, এর আগের দিন এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে ১২টি বাণিজ্যিক জাহাজ পার হয়েছিল। গত ১০ দিনের গড় ছিল ১৭টি। জাহাজ চলাচলের এই পতন মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
রয়টার্সের জাহাজ-ট্র্যাকিং তথ্য বলছে, বুধবার হরমুজ দিয়ে যাওয়া তিনটি জাহাজের মধ্যে একটি সুপ্রাম্যাক্স শ্রেণির শুকনা পণ্যবাহী জাহাজ ইরানের দিকের রুট ব্যবহার করে ঢোকে। একটি পেট্রোলিয়াম পণ্যবাহী ট্যাংকার অদৃশ্য বা ‘ডার্ক’ রুট ব্যবহার করে প্রবেশ করে এবং একটি পানাম্যাক্স ট্যাংকার একই ধরনের অদৃশ্য রুটে বেরিয়ে যায়। ফলে প্রকাশ্য ট্র্যাকিংয়ে যে সংখ্যা দেখা যাচ্ছে, বাস্তবে চলাচল কিছুটা বেশি হতে পারে। অনেক জাহাজ নিরাপত্তার কারণে এআইএস ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখছে।
হরমুজের পাশাপাশি বাব আল-মানদেবেও কমছে চলাচল
শুধু হরমুজ নয়, লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বাব আল-মানদেব প্রণালিতেও জাহাজ চলাচল কমেছে। রয়টার্সের হিসাবে বুধবার এই রুটে ২১টি জাহাজ পার হয়েছে, আগের দিন ছিল ২৪টি। ফলে বিশ্ব বাণিজ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ একই সময় নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ায় জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতির পেছনে ইয়েমেনের হুথিদের সামরিক তৎপরতা গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ। সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনা ও শহরে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পাশাপাশি লোহিত সাগর উপকূলেও হুথিদের অগ্রগতি আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। সৌদি আরবও পাল্টা বিমান হামলা চালাচ্ছে।
সৌদি অনুরোধের পর বেইজিংয়ের কূটনৈতিক তৎপরতা
রয়টার্সের তিনটি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, হুথিদের সামরিক অভিযান এবং লোহিত সাগরের নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে সৌদি আরব চীনের কাছে সহায়তা চেয়েছে। এর পর বেইজিং ব্যক্তিগত কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে ইরানকে হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রভাব খাটাতে বলেছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
চীনের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটি ইরানের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার এবং উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করে। হরমুজ ও বাব আল-মানদেব—দুই রুটেই বড় ধরনের বিঘ্ন হলে চীনের আমদানি ব্যয় এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ বাড়তে পারে। ফলে বেইজিং প্রকাশ্যে সংযম ও সংলাপের আহ্বান জানালেও পর্দার আড়ালে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে ইরান চীনের এই আহ্বানে কতটা সাড়া দেবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। হুথিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক রয়েছে, কিন্তু তাদের সামরিক কর্মকাণ্ডের ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণের মাত্রা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে।
তেলের বাজারে কিছুটা স্বস্তি, কিন্তু ঝুঁকি রয়ে গেছে
অন্যদিকে, হরমুজের জাহাজ চলাচল কমলেও ১৭ সেপ্টেম্বর তেলের বাজারে কিছুটা চাপ কমেছে। রয়টার্সের হিসাবে ওই দিন ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০৩ দশমিক ১৩ ডলারে নেমে আসে। সৌদি আরব ওমানের মাধ্যমে বিকল্প পথে তেল পাঠানোর চেষ্টা করছে এবং দেশটির পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনও দ্রুত চালুর উদ্যোগ চলছে—এতে সরবরাহ নিয়ে তাৎক্ষণিক উদ্বেগ কিছুটা কমেছে।
কিন্তু বাজারে অনিশ্চয়তা এখনো বড়। হরমুজ ও বাব আল-মানদেব—দুই নৌপথের ঝুঁকি, সৌদি অবকাঠামোয় হামলা এবং আঞ্চলিক সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকায় জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হয়েছে—এমন নিশ্চয়তা এখনো নেই।
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার আরেকটি কারণ হলো হরমুজ দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও এলএনজি পরিবহন হয়। এই রুটে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন হলে শুধু জ্বালানির দাম নয়, জাহাজ ভাড়া, বিমা, পরিবহন ব্যয় এবং শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের ভোক্তা বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
তথ্যসূত্র: Reuters, Associated Press (AP), Al Jazeera




