জিন্নাহকে ঘিরে বাংলাদেশের আবেগ মূলত ভাষা ও পাকিস্তানের স্মৃতি থেকে তৈরি; কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, একমাত্র মেয়ে দিনা ওয়াদিয়া এবং বাবা-মেয়ের সম্পর্কের ইতিহাস জানলে এই চরিত্রটিকে একমাত্রিকভাবে দেখা আর সম্ভব থাকে না
ঢাকা | ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | বিশেষ ফিচার
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে গত কয়েক দিনে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটি এখন আর শুধু একটি ছবির উপস্থিতি বা অপসারণের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। সংগ্রহশালার সংস্কারের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একক ছবির পরিবর্তে জিন্নাহর তিনটি ছবি যুক্ত করা হয়। এর পর ১৪ সেপ্টেম্বর এক শিক্ষার্থী ছবিগুলো ছিঁড়ে প্রতিবাদ করেন; পরদিন কয়েকজন শিক্ষার্থী জিন্নাহ ও গোলাম আযমের ছবি মেঝেতে রেখে প্রতিবাদ জানান। একই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলও জিন্নাহর ছবি সরানোর দাবি তোলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালা কোন ইতিহাস কীভাবে তুলে ধরবে, সেই প্রশ্নও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
এই বিতর্কের কেন্দ্রে তাই একটি বড় প্রশ্ন রয়েছে—জিন্নাহকে কি শুধুই পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে দেখব, নাকি দক্ষিণ এশিয়ার উপনিবেশ-পরবর্তী ইতিহাসের একটি জটিল রাজনৈতিক চরিত্র হিসেবে দেখব? আর যদি তাঁকে ইতিহাসের অংশ হিসেবে সংগ্রহশালায় রাখা হয়, তাহলে তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি তাঁর সময়ের বিরোধ, পূর্ব বাংলার ভাষা-প্রশ্ন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রচিন্তা এবং তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের দিকগুলোও কি একই সঙ্গে দেখানো উচিত নয়?
ডাকসুতে জিন্নাহর ছবি কেন এত দ্রুত বিস্ফোরক হয়ে উঠল?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সঙ্গে পাকিস্তান ও ভাষা আন্দোলনের সম্পর্ক সরাসরি। ১৯৪৮ সালের মার্চে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল হিসেবে ঢাকায় এসে জিন্নাহ প্রকাশ্যে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। তাঁর এই অবস্থান পূর্ব বাংলায় তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং ভাষা আন্দোলনের রাজনৈতিক ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করে। পরে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির রক্তাক্ত ঘটনার মধ্য দিয়ে ভাষার প্রশ্নটি আরও গভীর জাতীয় রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত হয়।
সুতরাং ঢাকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি দেখা মাত্রই অনেকে সেটিকে শুধু একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তির ছবি হিসেবে দেখেননি; বরং ১৯৪৮ সালের ভাষা-প্রশ্ন, পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামো এবং ১৯৫২-এর স্মৃতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছেন। এ কারণেই ছবিটি নিয়ে প্রতিক্রিয়াও এত তীব্র হয়েছে।
তবে ইতিহাসের সংগ্রহশালা আর রাজনৈতিক পোস্টারের মধ্যে পার্থক্য আছে। একটি সংগ্রহশালার কাজ কাউকে সম্মানিত করা নয়; ইতিহাসের প্রাসঙ্গিক চরিত্র ও ঘটনাকে দলিলসহ সংরক্ষণ করা। সেই নীতিতে জিন্নাহর ছবি রাখা হলে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের পাশাপাশি তাঁর বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলোকেও ব্যাখ্যা করার দায়িত্বও তৈরি হয়।
জিন্নাহ: পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা, কিন্তু পূর্ব বাংলার ভাষা-প্রশ্নে বিরোধিতার মুখ
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ছিলেন অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের প্রধান রাজনৈতিক নেতা এবং পাকিস্তান আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তিনি রাষ্ট্রটির প্রথম গভর্নর জেনারেল হন। কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত তাঁর ভূমিকা তাঁকে পূর্ব বাংলার মানুষের কাছে সবসময় একই অর্থে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারেনি।
১৯৪৮ সালের ভাষা-প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট। তিনি বলেছিলেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। বাংলা ভাষাভাষী সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর বাস্তবতার সঙ্গে এই অবস্থানের সংঘর্ষ খুব দ্রুত প্রকাশ্যে আসে। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এ কারণেই জিন্নাহর নাম একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু বিতর্কিত অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত।
এখানে একটি ঐতিহাসিক জটিলতা আছে। জিন্নাহর রাজনৈতিক প্রকল্পের কেন্দ্র ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি রাষ্ট্রের ধারণা, কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের পর খুব দ্রুত প্রশ্ন ওঠে—রাষ্ট্রটি কি সাংস্কৃতিক বহুত্বকে জায়গা দেবে, নাকি একটি কেন্দ্রীয় পরিচয়ের অধীনে সবাইকে একীভূত করবে? পূর্ব বাংলার ভাষা-সংগ্রাম সেই দ্বন্দ্বের প্রথম বড় প্রকাশগুলোর একটি।
কিন্তু জিন্নাহর পরিবারের গল্পটি অন্য রকম
এই রাজনৈতিক চরিত্রের ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অধ্যায় তাঁর একমাত্র সন্তান দিনা ওয়াদিয়া। দিনা জন্মেছিলেন লন্ডনে ১৫ আগস্ট ১৯১৯ সালে। তিনি ছিলেন জিন্নাহ ও তাঁর স্ত্রী রতনবাই ‘রুটি’ পেটিটের একমাত্র সন্তান। রতনবাই ছিলেন পারসি পরিবারের মেয়ে এবং ১৯২৯ সালে মারা যান; তখন দিনার বয়স ছিল মাত্র নয়। পরে দিনা মূলত তাঁর মাতামহী ও পরিবারের তত্ত্বাবধানে বড় হন।
বাবার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ, আবার জটিলও। এর সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায় দিনার বিয়ে। ১৯৩৮ সালে তিনি পারসি ব্যবসায়ী নেভিল ওয়াদিয়াকে বিয়ে করেন। বিয়েটি নিয়ে জিন্নাহ অসন্তুষ্ট ছিলেন এবং তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিতও ছিলেন না। তবে পরে বাবা-মেয়ের সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে যায়নি—এই প্রচলিত সরল গল্পটি ঐতিহাসিক নথিতে টেকে না। দিনা ও জিন্নাহ পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন, চিঠি লিখতেন এবং বিভিন্ন সময়ে দেখা করতেন।
গবেষক ও ইতিহাসবিদ অ্যান্ড্রু হোয়াইটহেড ২০০২ সালে নিউইয়র্কে দিনা ওয়াদিয়ার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। প্রায় পাঁচ বছর চেষ্টা করার পর পাওয়া সেই সাক্ষাৎকারে দিনা তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, বাবা জিন্নাহ, মা রতনবাই এবং উপমহাদেশের রাজনৈতিক নেতাদের সম্পর্কে নানা স্মৃতি শেয়ার করেছিলেন। হোয়াইটহেডের ভাষ্য অনুযায়ী, তখনও দিনার ডেস্কে তাঁর বাবার ছবি ছিল এবং তিনি জিন্নাহকে নিয়ে গর্বের সঙ্গে কথা বলেছিলেন।
বাবার মতো তিনিও বিয়ে করেছিলেন অমুসলিমকে
দিনা ওয়াদিয়ার জীবনের সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্ত ছিল তাঁর বিয়ে। নেভিল ওয়াদিয়া ছিলেন পারসি পরিবারে জন্মানো একজন ব্যবসায়ী; পরবর্তীতে তিনি খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ আছে। ১৯৩৮ সালে তাঁদের বিয়ে হয়। এই বিয়ে জিন্নাহকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল।
কিন্তু ঘটনাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে একটি অন্য কারণে। জিন্নাহ নিজেও অমুসলিম পারসি নারী রতনবাইকে বিয়ে করেছিলেন। ফলে বাবা-মেয়ের এই দ্বন্দ্বে ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় পরিচয়ের প্রশ্ন একসঙ্গে এসে দাঁড়ায়। দিনার নিজের জীবনকে নিজের মতো করে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত যেন তাঁর বাবার ব্যক্তিগত ইতিহাসকেই অন্য এক আয়নায় ফিরিয়ে দিয়েছিল।
বিয়ের পর বাবা-মেয়ের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হলেও সময়ের সঙ্গে সম্পর্কের পুনর্মিলনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। দিনার ১৯৪৭ সালের চিঠিগুলোর মধ্যে তাঁর বাবাকে লেখা আন্তরিক সম্বোধনের প্রমাণ রয়েছে। অর্থাৎ “বিয়ে করায় মেয়েকে ত্যাগ করেছিলেন এবং আর কোনো সম্পর্ক ছিল না”—এমন সরল বর্ণনা ইতিহাসের পুরো চিত্র নয়।
‘আমরা পাকিস্তান পেয়েছি’—বাবাকে লেখা দিনার সেই চিঠি
১৯৪৭ সালের ২৮ এপ্রিল দিনা জিন্নাহকে যে চিঠি লিখেছিলেন, সেখানে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক সাফল্যে তিনি বাবাকে অভিনন্দন জানান। অ্যান্ড্রু হোয়াইটহেডের প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী, চিঠিতে দিনা তাঁর বাবার পরিশ্রমের জন্য গর্ব প্রকাশ করেছিলেন এবং ভবিষ্যতের কথাও লিখেছিলেন।
এই চিঠিটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি বাবা-মেয়ের সম্পর্ক সম্পর্কে প্রচলিত অতিরিক্ত নাটকীয় গল্পের বাইরে আরেকটি বাস্তবতা দেখায়। রাজনৈতিক মত ও পারিবারিক অভিমান থাকতে পারে, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে সম্পর্কের সব দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।
দিনার কাছে জিন্নাহ শুধু পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন তাঁর বাবা।
জিন্নাহ মারা গেলে প্রথমবার পাকিস্তানে গেলেন দিনা
১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বর জিন্নাহ মারা গেলে দিনা পাকিস্তানে যান তাঁর শেষ বিদায়ে অংশ নিতে। পরে তিনি তাঁর ফুফু ফাতিমা জিন্নাহকে দেখতে আরও দুবার পাকিস্তানে যান। অর্থাৎ পাকিস্তানে তাঁর যাতায়াত পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ছিল না।
কিন্তু পাকিস্তানকে কখনো নিজের স্থায়ী আবাস করেননি দিনা। তিনি নিজেকে মূলত বোম্বের মানুষ হিসেবে ভাবতেন এবং জীবনের বিভিন্ন সময় লন্ডন ও নিউইয়র্কেও থেকেছেন। হোয়াইটহেডকে তিনি জানিয়েছিলেন, পাকিস্তানে রাষ্ট্রীয় অতিথি বা প্রতীকে পরিণত হতে তিনি আগ্রহী ছিলেন না। পাকিস্তানের বিভিন্ন রাজনৈতিক সরকার তাঁকে আমন্ত্রণ জানালেও তিনি দীর্ঘ সময় সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেননি।
২০০৪ সালে অবশ্য তিনি আবার করাচি যান, বাবার সমাধি পরিদর্শন করেন এবং ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট কূটনীতির একটি পর্বেও উপস্থিত ছিলেন।
বাবার উত্তরাধিকার নিয়ে দিনার নিজেরও অস্বস্তি ছিল
দিনা ওয়াদিয়ার সবচেয়ে আকর্ষণীয় মন্তব্যগুলোর একটি ছিল জিন্নাহকে নিয়ে পাকিস্তানের অতিরিক্ত পূজা-সদৃশ স্মরণপ্রথা সম্পর্কে তাঁর আপত্তি। অ্যান্ড্রু হোয়াইটহেডের বর্ণনায়, দিনা তাঁর বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে শ্রদ্ধা করলেও তাঁকে ‘পূজা’ করার সংস্কৃতি পছন্দ করতেন না।
এই মন্তব্যটি বর্তমান ডাকসু বিতর্কে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।
কারণ ইতিহাসের একজন ব্যক্তিকে হয় সম্পূর্ণ নায়ক, নয় সম্পূর্ণ খলনায়ক হিসেবে দেখার প্রবণতা ইতিহাসকে সরল করে ফেলে। দিনা ওয়াদিয়ার নিজের স্মৃতিতে তাঁর বাবা একই সঙ্গে একজন রাজনৈতিক নেতা এবং একজন মানুষ—যিনি ভুল করেছেন, জেদ দেখিয়েছেন, আবার পরিবারের মানুষ হিসেবেও ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন।
দিনার চোখে গান্ধী, প্যাটেল, নেহরু ও মাউন্টব্যাটেন
দিনা শুধু বাবার কথাই বলেননি। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতাদের নিয়েও তাঁর ব্যক্তিগত স্মৃতি ছিল। হোয়াইটহেডের সঙ্গে কথোপকথনে তিনি মহাত্মা গান্ধীকে নিয়ে উষ্ণ স্মৃতির কথা বলেছিলেন এবং জানিয়েছিলেন, তাঁর বাবা গান্ধীকে পছন্দ করতেন। সরদার প্যাটেলকে তিনি সোজাসাপ্টা মানুষ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। জওহরলাল নেহরু সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ন ছিল অনেক বেশি কঠোর; তিনি মনে করতেন নেহরুকে সহজে তোষামোদ করা যেত। আর লর্ড মাউন্টব্যাটেন সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য ছিল আরও নেতিবাচক।
এই ব্যক্তিগত স্মৃতিগুলো কোনো ইতিহাসের চূড়ান্ত মূল্যায়ন নয়। এগুলো একজন প্রত্যক্ষ পারিবারিক সাক্ষীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। কিন্তু ইতিহাসের মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও পারিবারিক স্মৃতিকে বোঝার ক্ষেত্রে এগুলো মূল্যবান।
দিনা ওয়াদিয়া: পাকিস্তানের ভেতর থেকেও দূরে থাকা এক উত্তরাধিকারী
পাকিস্তানের ইতিহাসে দিনা ছিলেন একটি অদ্ভুত অবস্থানের মানুষ। তিনি ছিলেন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতার একমাত্র সন্তান, কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতীকে পরিণত হতে চাননি। তাঁর জন্ম ভারতে, শৈশব ও যৌবনের বড় অংশ বোম্বেতে, পরবর্তী জীবন লন্ডন ও নিউইয়র্কে; অথচ তাঁর পরিচয়ের সবচেয়ে বড় অংশ জুড়ে ছিলেন পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা জিন্নাহ।
২০০৪ সালে তাঁর শেষ পাকিস্তান সফরের পরও এই দূরত্বের বৈপরীত্য থেকে যায়। বাবার সমাধিতে গিয়ে তিনি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন, কিন্তু রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক ব্যবহারের অংশ হতে আগ্রহ দেখাননি।
এখানেই হয়তো দিনার জীবন দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রীয় স্মৃতির একটি আলাদা অধ্যায় হয়ে ওঠে—একজন প্রতিষ্ঠাতার উত্তরাধিকারী, যিনি প্রতিষ্ঠাতার রাষ্ট্রের বাইরে থেকে তাঁর বাবাকে মনে রেখেছেন।
১৯৪৮-এর জিন্নাহ আর ২০২৬-এর ডাকসু: ইতিহাসের দুই প্রান্ত
আজ ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি নিয়ে যে উত্তেজনা, তার শিকড় আসলে বহু পুরোনো। ১৯৪৮ সালে জিন্নাহ ঢাকায় এসে যে ভাষানীতি ঘোষণা করেছিলেন, সেটি পরবর্তী কয়েক দশকে পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক বঞ্চনার অনুভূতির সঙ্গে জড়িয়ে যায়। ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসনের দাবি এবং শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা—এই দীর্ঘ রাজনৈতিক ধারাবাহিকতায় পাকিস্তানি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে জিন্নাহর নামও বিতর্কের অংশ হয়ে থাকে।
তাই বাংলাদেশের একজন শিক্ষার্থীর কাছে জিন্নাহর ছবি মানেই শুধু একটি পুরোনো ঐতিহাসিক প্রতিকৃতি নয়। কারও কাছে এটি পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার স্মৃতি, কারও কাছে এটি ভাষা আন্দোলনের বিরোধিতা, আবার কারও কাছে এটি উপমহাদেশের ইতিহাসের একটি অপরিহার্য চরিত্র।
এই ভিন্ন স্মৃতিগুলোই স্বাভাবিক। সমস্যা হয় তখন, যখন একটি স্মৃতিকে সম্পূর্ণ ইতিহাস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়।
সংগ্রহশালার কাজ মুছে ফেলা নয়, ব্যাখ্যা করা
ডাকসুর সংগ্রহশালা নিয়ে বর্তমান বিতর্ক থেকে একটি শিক্ষা নেওয়া যায়। জিন্নাহর ছবি সেখানে থাকলে প্রশ্ন উঠবে—কেন রাখা হয়েছে? কী প্রেক্ষাপটে রাখা হয়েছে? ছবির পাশে কি ১৯৪৮ সালের ভাষা-ঘোষণার তথ্য থাকবে? ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের সম্পর্ক কি ব্যাখ্যা করা হবে? পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের পাশাপাশি পূর্ব বাংলার মানুষের আপত্তিও কি একই জায়গায় থাকবে?
একইভাবে কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তির ছবি সরিয়ে ফেললেও প্রশ্ন থাকবে—কোন ইতিহাস বাদ পড়ছে এবং কেন?
একটি ভালো সংগ্রহশালা ইতিহাসকে আরামদায়ক করে না। বরং একই ব্যক্তির গৌরব, ভুল, বিরোধিতা, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং সামাজিক প্রভাব—সবকিছু পাশাপাশি দেখায়।
জিন্নাহকে দেখাতে হলে তাঁর পাকিস্তান আন্দোলন দেখাতে হবে। তাঁর সঙ্গে ১৯৪৮ সালের ভাষা-প্রশ্নও দেখাতে হবে। তাঁর রাজনৈতিক সাফল্য যেমন থাকবে, তেমনি তাঁর সিদ্ধান্তের বিরোধিতাও থাকবে। আর চাইলে তাঁর পারিবারিক জীবনও দেখানো যেতে পারে—বিশেষত দিনা ওয়াদিয়ার গল্প, যা তাঁর ব্যক্তিগত চরিত্রের অনেক অদৃশ্য দিক সামনে আনে।
দিনা ওয়াদিয়ার গল্প কেন আজও প্রাসঙ্গিক?
কারণ এটি একজন রাষ্ট্রনায়কের পারিবারিক জীবনের গল্প হওয়ার পাশাপাশি একটি বড় মানবিক সত্যের গল্প।
একজন মানুষ ইতিহাসে যত বড়ই হোন, তাঁর ঘর থাকে, সন্তান থাকে, অভিমান থাকে, সম্পর্ক থাকে।
জিন্নাহ ছিলেন পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা। কিন্তু তাঁর মেয়ের কাছে তিনি একই সঙ্গে ছিলেন বাবা।
দিনা ওয়াদিয়া তাঁর বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে অস্বীকার করেননি। আবার সেই উত্তরাধিকারকে পূজা করতেও চাননি।
এই দ্বৈত অবস্থানটিই হয়তো আজকের বাংলাদেশের জন্যও শিক্ষণীয়।
আমরা ইতিহাসের মানুষদের নিয়ে তীব্র আবেগ অনুভব করতে পারি। কারও প্রতি শ্রদ্ধা থাকতে পারে, কারও প্রতি তীব্র বিরোধিতা থাকতে পারে। কিন্তু ইতিহাস বোঝার জন্য আবেগের পাশাপাশি দলিলও দরকার।
শেষ কথা: ছবির চেয়ে বড় হলো ইতিহাস
ডাকসুর সংগ্রহশালার দেয়ালে জিন্নাহর ছবি থাকবে কি থাকবে না—এটি শেষ পর্যন্ত একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু সেই ছবিকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটি তার চেয়ে বড়।
কারণ ছবিটি আমাদের আবার ১৯৪৮-এ ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
ফিরিয়ে নিয়ে যায় ভাষা আন্দোলনের কাছে।
পাকিস্তানের জন্মের কাছে।
পূর্ব বাংলার ক্ষোভের কাছে।
আর একই সঙ্গে নিয়ে যায় নিউইয়র্কের একটি অ্যাপার্টমেন্টে, যেখানে বহু বছর পর এক ব্রিটিশ সাংবাদিকের সামনে এক বৃদ্ধা নারী তাঁর বাবার ছবি দেখিয়ে বলেছিলেন, তিনি তাঁর বাবাকে নিয়ে গর্বিত—কিন্তু তাঁকে পূজা করার সংস্কৃতি পছন্দ করেন না।
সেই নারী দিনা ওয়াদিয়া।
জিন্নাহর একমাত্র সন্তান।
তাঁর গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিকে বোঝার জন্য তাঁর রাজনৈতিক বক্তৃতা যতটা দরকার, তাঁর সময়, তাঁর সিদ্ধান্ত, তাঁর বিরোধ এবং তাঁর মানুষ হয়ে থাকার ইতিহাসও ততটাই দরকার।
ডাকসুর সংগ্রহশালা যদি সত্যিই ইতিহাসের সংগ্রহশালা হতে চায়, তাহলে সেখানে জিন্নাহর ছবি নিয়ে সবচেয়ে ভালো উত্তর হতে পারে ছবি ছিঁড়ে ফেলা নয়, আবার চোখ বন্ধ করে মহিমান্বিত করাও নয়।
উত্তর হতে পারে—তথ্য, প্রেক্ষাপট এবং ইতিহাসকে পাশাপাশি রাখা।
তাহলেই দর্শক নিজেই বুঝতে পারবেন, ১৯৪৮-এর জিন্নাহ কে ছিলেন, ১৯৫২-এর পূর্ব বাংলার কাছে তাঁর অবস্থান কী অর্থ বহন করেছিল, আর তাঁর মেয়ে দিনা ওয়াদিয়া কেন সারাজীবন তাঁর বাবাকে মনে রেখেও বাবার রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হতে চাননি।
তথ্যসূত্র: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডাকসু সংগ্রহশালা নিয়ে bdnews24.com, প্রথম আলো, The Daily Star ও অন্যান্য সাম্প্রতিক প্রতিবেদন; Banglapedia-এর ভাষা আন্দোলন ও একুশে ফেব্রুয়ারি বিষয়ক নিবন্ধ; Andrew Whitehead-এর দিনা ওয়াদিয়ার সঙ্গে ২০০২ সালের নিউইয়র্ক সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে ২০১৭ সালে প্রকাশিত লেখা; Dawn, Geo News, Indian Express ও অন্যান্য ঐতিহাসিক প্রতিবেদন।




