মৃত্যুর রহস্য থেকে হত্যা মামলা—বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সেই অসমাপ্ত সুপারস্টার
বিশেষ কভার স্টোরি | শোবিজ টুডি
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এমন কিছু নাম আছে, যাদের জনপ্রিয়তা কোনো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আটকে থাকে না। সালমান শাহ তাঁদেরই একজন। পর্দায় তাঁর উপস্থিতির সময় ছিল খুব অল্প—মাত্র কয়েক বছর। কিন্তু সেই অল্প সময়েই তিনি এমন এক সাংস্কৃতিক প্রভাব তৈরি করে গেছেন, যা মৃত্যুর ৩০ বছর পরও অম্লান।
৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬। সালমান শাহর চলে যাওয়ার ৩০ বছর পূর্ণ হলো। ১৯৯৬ সালের এই দিনেই মাত্র ২৪ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন বাংলা চলচ্চিত্রের এই জনপ্রিয় নায়ক। তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে তিন দশক ধরে চলেছে প্রশ্ন, তদন্ত, মামলা ও পাল্টাপাল্টি দাবি। আর সেই দীর্ঘ ইতিহাসে ২০২৫ সালে এসে নতুন মোড় নেয় ঘটনাটি—আদালতের নির্দেশে তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা বাতিল করে হত্যা মামলা হিসেবে তদন্তের পথ খুলে যায়।
আর ২০২৬ সালে সেই মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন সালমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহশিল্পী আশরাফুল হক ডন। ফলে মৃত্যুর তিন দশক পরও সালমান শাহর নাম আবারও দেশের সংবাদ ও জনআলোচনার কেন্দ্রে।
কিন্তু আইনি প্রশ্নের বাইরে আরেকটি বাস্তবতাও আছে—সালমান শাহ নেই, অথচ তাঁর তারকাখ্যাতি এখনও বেঁচে আছে।
ইমন থেকে সালমান শাহ
সালমান শাহর আসল নাম চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন। ১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটের দাড়িয়াপাড়ায় জন্ম তাঁর। বাবা কমর উদ্দিন চৌধুরী এবং মা নীলা চৌধুরী। পরিবারের বড় সন্তান ছিলেন তিনি।
শৈশব থেকেই সংস্কৃতি ও বিনোদনের প্রতি আগ্রহ ছিল তাঁর। পরবর্তী সময়ে মডেলিংয়ের মাধ্যমে বিনোদন অঙ্গনে প্রবেশ করেন। টেলিভিশনেও কাজ করেছেন। কিন্তু তাঁর প্রকৃত উত্থান আসে চলচ্চিত্রে।
সেই সময়ের তরুণ ইমন খুব অল্প সময়ের মধ্যেই হয়ে ওঠেন সালমান শাহ—একটি নাম, যা নব্বইয়ের দশকের বাংলাদেশের তারুণ্য, ফ্যাশন ও চলচ্চিত্রের সঙ্গে প্রায় সমার্থক হয়ে গিয়েছিল।
প্রথম সিনেমাতেই নতুন নায়কের জন্ম
১৯৯৩ সালে মুক্তি পায় সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’। এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় সালমান শাহর। তাঁর সঙ্গে একই সিনেমায় অভিষেক ঘটে মৌসুমী ও গায়ক আগুনেরও।
প্রথম সিনেমাতেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান সালমান। এরপর আর তাঁকে পেছনে তাকাতে হয়নি।
‘অন্তরে অন্তরে’, ‘তুমি আমার’, ‘সুজন সখী’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘বিক্ষোভ’, ‘তোমাকে চাই’, ‘স্বপ্নের পৃথিবী’, ‘সত্যের মৃত্যু নেই’, ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’, ‘আনন্দ অশ্রু’, ‘বুকের ভেতর আগুন’—একের পর এক সিনেমায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন তিনি।
মাত্র চার বছরে ২৭ ছবি
সালমান শাহর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক তাঁর কাজের পরিমাণ।
প্রায় চার বছরের চলচ্চিত্রজীবনে তিনি ২৭টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। তাঁর বেশির ভাগ ছবিই ব্যবসায়িকভাবে সফল হয় এবং তাঁকে নব্বইয়ের দশকের অন্যতম বড় তারকায় পরিণত করে।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এর চেয়ে বড় বিষয় ছিল তাঁর তারকা-প্রভাব।
একটি সিনেমা মুক্তি পেলেই শুধু সিনেমা হল নয়—ফ্যাশন, গান, চুলের স্টাইল, পোশাক ও তরুণদের দৈনন্দিন কথাবার্তায়ও তার প্রভাব পড়ত।
শাবনূরের সঙ্গে জুটি, আর দর্শকের নতুন উন্মাদনা
সালমান শাহর জনপ্রিয়তার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে আছে শাবনূর-এর নাম। তাঁদের জুটি নব্বইয়ের দশকের বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় চলচ্চিত্র জুটিগুলোর একটি হয়ে ওঠে।
মৌসুমী, শাবনূরসহ বিভিন্ন নায়িকার সঙ্গে কাজ করলেও শাবনূরের সঙ্গে তাঁর পর্দার রসায়ন দর্শকদের মধ্যে আলাদা সাড়া ফেলেছিল।
সালমান-শাবনূর জুটির ছবিগুলো শুধু ব্যবসা করেনি, তাঁদের গান ও চরিত্রও জনপ্রিয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছিল।
অভিনয়ের সঙ্গে বদলে দিয়েছিলেন নায়ক হওয়ার ধারণাও
সালমান শাহর সবচেয়ে বড় অবদান হয়তো অভিনয়ের বাইরেও।
তাঁর আগে বাংলাদেশের মূলধারার নায়কের একটি নির্দিষ্ট চেহারা ও পর্দার ভাষা ছিল। সালমান সেই চেনা কাঠামোতে পরিবর্তন আনেন। ক্যাজুয়াল পোশাক, আধুনিক চুলের কাট, সানগ্লাস, জিনস, জ্যাকেট এবং স্বাভাবিক অভিনয়ের ভঙ্গি তাঁকে তরুণ প্রজন্মের কাছে আলাদা করে তোলে।
তাঁকে শুধু নায়ক হিসেবে নয়, ফ্যাশন আইকন হিসেবেও দেখা শুরু হয়। তাঁর মৃত্যুর তিন দশক পরও পুরোনো ছবি, দৃশ্য ও পোশাকের অনুকরণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যায়।
৬ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬: হঠাৎ থেমে গেল সবকিছু
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার ইস্কাটনের বাসায় সালমান শাহকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।
মাত্র ২৪ বছর বয়স।
তাঁর মৃত্যুর পর থেকেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে—এটি কি আত্মহত্যা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো ঘটনা ছিল?
সরকারি তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে আত্মহত্যার কথা বলা হলেও সালমানের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে সেই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি। তাঁর মা নীলা চৌধুরীসহ পরিবারের সদস্যরা মৃত্যুটিকে হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করে আসছেন।
এভাবেই একটি মৃত্যু পরিণত হয় বাংলাদেশের বিনোদন অঙ্গনের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী রহস্যগুলোর একটিতে।
২৯ বছর পর বদলে গেল মামলার ধরন
দীর্ঘ আইনি ও তদন্ত প্রক্রিয়ার পর ২০ অক্টোবর ২০২৫ ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় আগের অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা বাতিল করে ঘটনাটি হত্যা মামলা হিসেবে নেওয়ার নির্দেশ দেন।
পরদিন, ২১ অক্টোবর ২০২৫, সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তাঁর মামা মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম রমনা থানায় ১১ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। মামলায় দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়।
আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সালমানের সাবেক স্ত্রী সামিরা হক, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই, অভিনেতা আশরাফুল হক ডনসহ আরও কয়েকজন।
এখানে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, মামলায় আসামি হওয়া বা গ্রেপ্তার হওয়া অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার সমান নয়। তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া এখনো চলমান।
বন্ধু ডনের গ্রেপ্তারে আবার আলোচনায় পুরোনো অধ্যায়
চলতি বছরের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা আসে আগস্টে।
৯ আগস্ট ২০২৬ সকালে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আশরাফুল হক ডনকে গ্রেপ্তার করে ইমিগ্রেশন পুলিশ। পরে তাঁকে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
ডন ও সালমান শাহ একসময় ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন এবং একসঙ্গে একাধিক সিনেমায় অভিনয় করেছেন। ফলে তাঁর গ্রেপ্তার মামলাটিকে নতুন করে সাধারণ মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
এরপর ১২ আগস্ট ডনের জামিন আবেদন নামঞ্জুর হয়।
পরে ২৭ আগস্ট আদালত তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
অর্থাৎ সালমান শাহর মৃত্যু নিয়ে দীর্ঘ ৩০ বছরের আলোচনায় ২০২৬ সাল একটি নতুন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যোগ করেছে।
মামলা এখন কোথায়?
মামলার তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ—সিআইডি।
তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ একাধিকবার পিছিয়েছে। সর্বশেষ ৩০ আগস্ট নির্ধারিত সময়েও প্রতিবেদন জমা না হওয়ায় আদালত ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ নতুন সময় নির্ধারণ করেছেন। এ নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা নবমবারের মতো পিছিয়েছে বলে প্রথম আলো জানিয়েছে।
এর আগে সালমান শাহর মরদেহের দেহাবশেষ উত্তোলন করে নতুন করে সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের অনুমতিও দিয়েছিল আদালত। পরে সেই আদেশ বাতিল চেয়ে করা আবেদন আদালতে গৃহীত হয়।
ফলে আজকের দিনে দাঁড়িয়ে মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্য হলো—তদন্ত এখনো শেষ হয়নি এবং আদালতে মৃত্যুর চূড়ান্ত কারণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
তিন দশকেও কেন সালমান শাহ এত প্রাসঙ্গিক?
সালমান শাহর জনপ্রিয়তা বোঝার জন্য শুধু তাঁর সিনেমার সংখ্যা যথেষ্ট নয়।
তিনি এমন একটি সময়ের প্রতিনিধি, যখন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নতুন ধরনের নায়কোচিত উপস্থিতি তৈরি হচ্ছিল। তিনি সেই পরিবর্তনের মুখ হয়ে ওঠেন।
তিনি দর্শকের পোশাক বদলেছেন, ফ্যাশনের রুচি বদলেছেন, গান শোনার ধরনেও প্রভাব ফেলেছেন। তাঁর সিনেমার গান, সংলাপ ও চরিত্র তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—তাঁর সময় থেমে গেছে, কিন্তু তাঁর দর্শক থেমে থাকেনি।
নব্বইয়ের দশকের ভক্তদের সন্তানরাও আজ সালমান শাহর সিনেমা দেখে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর জন্মদিন ও মৃত্যুবার্ষিকীতে নতুন প্রজন্মের ভক্তরা স্মৃতিচারণ করেন। তিন দশক পর এটি একজন অভিনেতার সাংস্কৃতিক প্রভাবের সবচেয়ে শক্ত প্রমাণগুলোর একটি।
তিনি বেঁচে থাকলে কোথায় থাকত বাংলাদেশের চলচ্চিত্র?
এই প্রশ্নের উত্তর নিশ্চিতভাবে দেওয়ার সুযোগ নেই।
তবে একটি বিষয় অনুমান করা যায়—সালমান শাহর ক্যারিয়ার যদি ১৯৯৬ সালে থেমে না যেত, তাঁর সামনে আরও অনেক সম্ভাবনা ছিল।
তিনি শুধু নায়ক হিসেবেই থাকতেন, নাকি প্রযোজনা, পরিচালনা বা নতুন ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণে যুক্ত হতেন—তা আমরা জানি না।
কিন্তু তাঁর প্রথম কয়েক বছরের কাজের গতি ও প্রভাব দেখলে বলা যায়, দীর্ঘ ক্যারিয়ার পেলে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে তাঁর প্রভাব আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
হয়তো তিনি আরও পরিণত চরিত্রে অভিনয় করতেন। হয়তো নব্বইয়ের দশকের পর বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সিনেমার পরিবর্তনের সঙ্গে তিনিও বদলে যেতেন। নতুন প্রজন্মের সঙ্গে কাজ করে তিনি হয়তো হয়ে উঠতেন একজন অভিজ্ঞ শিল্পী।
সেই সম্ভাবনাগুলোই আজ সালমান শাহর গল্পকে আরও বেদনাময় করে তোলে।
একটি অসমাপ্ত অধ্যায়
৩০ বছর আগে যে মানুষটির জীবন থেমে গিয়েছিল, তাঁর চলচ্চিত্রযাত্রার যেন কোনো শেষ দৃশ্য নেই।
কারণ সালমান শাহর শেষ সিনেমা যখন দর্শক দেখেছে, তার অনেক পরও তাঁর প্রভাব থেকে গেছে। তাঁর পোশাক ফিরেছে নতুন ফ্যাশনে। তাঁর গান ফিরে এসেছে নতুন সংগীতচর্চায়। তাঁর সিনেমা এসেছে ইউটিউব ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। আর তাঁর নাম বারবার ফিরে এসেছে নতুন প্রজন্মের আলোচনায়।
আইনের দিক থেকে তাঁর মৃত্যুর প্রশ্ন এখনো নিষ্পত্তিহীন। তদন্ত চলছে, আদালতে মামলাও চলছে।
কিন্তু শিল্পের ইতিহাসে তাঁর অবস্থান ইতোমধ্যে অনেকটাই নিশ্চিত।
সালমান শাহ ছিলেন এমন এক তারকা, যিনি খুব অল্প সময় আলোয় ছিলেন—কিন্তু সেই আলো নিভে যাওয়ার ৩০ বছর পরও তার উজ্জ্বলতা কমেনি।
আজ তাঁর ৩০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাই শোকের পাশাপাশি তাঁকে স্মরণ করা হয় বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের এক অসমাপ্ত সম্ভাবনা হিসেবে।
শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও স্মরণ—চিরসবুজ নায়ক সালমান শাহর প্রতি।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (BSS), প্রথম আলো, bdnews24.com, NTV Online, The Daily Star এবং প্রকাশিত চলচ্চিত্র-তথ্য ও আদালতের নথিভিত্তিক প্রতিবেদন।




