প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ দেওয়ার নির্ধারিত সময় আবারও অনিশ্চিত; ত্রুটি সারানোর নির্দিষ্ট সময় জানাতে পারেনি সরকার
ঢাকা | ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু আবারও পিছিয়ে গেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছেন, প্রথম ইউনিটের দুটি ভালভে ত্রুটি ধরা পড়ায় কমিশনিংয়ের সময়সূচিতে জটিলতা তৈরি হয়েছে। ত্রুটি ঠিক করে কবে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা যাবে, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে পারেননি।
বৃহস্পতিবার আগারগাঁওয়ের আইসিটি টাওয়ারে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোড করার আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক পরীক্ষা ২৮ এপ্রিল থেকে শুরু হয়েছিল। এখন ভালভ-সংক্রান্ত ত্রুটি ঠিক করা এবং পরবর্তী পরীক্ষাগুলো সম্পন্ন করাই কমিশনিংয়ের প্রধান ধাপ।
পারমাণবিক কেন্দ্র চালুর আগে কেন ভালভ এত গুরুত্বপূর্ণ
একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিভিন্ন সিস্টেমের নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে অসংখ্য ভালভ ব্যবহার করা হয়। এগুলো কেবল সাধারণ যান্ত্রিক যন্ত্র নয়; নির্দিষ্ট চাপ, তাপমাত্রা ও প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে এসব উপাদানের কার্যকারিতা সরাসরি যুক্ত থাকতে পারে।
তাই দুটি ভালভে ত্রুটি ধরা পড়াকে ছোটখাটো যান্ত্রিক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে ত্রুটিটি কেন্দ্রের নিরাপত্তায় কতটা প্রভাব ফেলছে বা মেরামতে কত সময় লাগবে—এ বিষয়ে সরকার এখনো বিস্তারিত প্রযুক্তিগত তথ্য প্রকাশ করেনি।
কমিশনিং মানেই শুধু সুইচ টিপে বিদ্যুৎ দেওয়া নয়
রূপপুরের মতো পারমাণবিক স্থাপনায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ দেওয়ার আগে একাধিক ধাপে পরীক্ষা, নিরাপত্তা যাচাই এবং সিস্টেম পরীক্ষণ সম্পন্ন করতে হয়। জ্বালানি লোডিং, যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা, সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন অপারেশনাল পরীক্ষা শেষ করার পরই বাণিজ্যিক উৎপাদনের দিকে যাওয়া সম্ভব।
এই কারণে একটি যন্ত্রাংশে ত্রুটি ধরা পড়লে পরবর্তী একাধিক পরীক্ষা ও অনুমোদনের সময়সূচিও পিছিয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় রূপপুরের প্রত্যাশা বড়
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিট মিলিয়ে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বড় পরিমাণ baseload power যোগ করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটির প্রথম ইউনিট জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে আমদানিকৃত জ্বালানি ও গ্যাসের ওপর বিদ্যুৎ উৎপাদনের চাপ কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশ বর্তমানে গ্যাসের ঘাটতি এবং উচ্চ জ্বালানি ব্যয়ের কারণে বিদ্যুৎ খাতে চাপের মধ্যে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে রূপপুর দ্রুত চালু হলে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় তা একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।
তবে নিরাপত্তার জায়গায় তাড়াহুড়োর সুযোগ নেই
পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে সময়ের চাপ থাকলেও নিরাপত্তা পরীক্ষায় ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও পরিদর্শন সম্পন্ন করেই কেন্দ্রটি গ্রিডে বিদ্যুৎ দেওয়ার পর্যায়ে যেতে হবে।
এ কারণে নির্ধারিত সময় পিছিয়ে গেলেও ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার বিষয়টিকে একটি safety check-এর ফল হিসেবেও দেখা যায়। আসল প্রশ্ন হবে—ত্রুটি কত দ্রুত ও কীভাবে ঠিক করা হচ্ছে এবং পরবর্তী সব পরীক্ষা নির্ধারিত মান পূরণ করছে কি না।
📊 রূপপুর প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা
• ইউনিট: প্রথম ইউনিট
• গ্রিডে বিদ্যুৎ দেওয়ার সময়সূচি: পিছিয়ে গেছে
• সমস্যা: দুটি ভালভে ত্রুটি
• প্রস্তুতিমূলক পরীক্ষা শুরু: ২৮ এপ্রিল
• ত্রুটি সারানোর নির্দিষ্ট সময়: এখনো জানানো হয়নি
🧭 সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ
প্রথমে ত্রুটি শনাক্ত, মেরামত ও পুনরায় পরীক্ষা করতে হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা ও কমিশনিং ধাপগুলো সম্পন্ন হলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের নতুন সময়সূচি ঘোষণা করা সম্ভব হবে।
রূপপুর বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প। তাই দ্রুততার পাশাপাশি নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা ও স্বচ্ছ পরীক্ষার প্রক্রিয়াই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্যসূত্র: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ, The Daily Star।




