Homeটুডে নেশনমক্কা প্যাক্টে ইরানের আপত্তি নেই, বাংলাদেশের জ্বালানি জাহাজ নিয়েও ‘বাধা নেই’ বলল...

মক্কা প্যাক্টে ইরানের আপত্তি নেই, বাংলাদেশের জ্বালানি জাহাজ নিয়েও ‘বাধা নেই’ বলল তেহরান

ঢাকার সম্ভাব্য যোগদানকে হুমকি হিসেবে দেখছে না ইরান; আমন্ত্রণ এলে নিজেরাও যুক্ত হতে প্রস্তুত থাকার বার্তা, হরমুজ নিয়ে মুখোমুখি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বয়ান

ঢাকা | ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের দ্রুত বদলে যাওয়া নিরাপত্তা সমীকরণে বাংলাদেশকে ঘিরে নতুন একটি কূটনৈতিক বার্তা দিয়েছে ইরান। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা চুক্তি—‘মক্কা প্যাক্ট’—এ বাংলাদেশ সম্ভাব্যভাবে যুক্ত হলে তেহরানের আপত্তি নেই বলে জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত ড. জলিল রহিমি জাহানাবাদী। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, এই চুক্তিকে ইরান নিজেদের বিরুদ্ধে কোনো উদ্যোগ হিসেবে দেখছে না।

এর পাশাপাশি বাংলাদেশের LNG, গ্যাস ও জ্বালানিবাহী জাহাজের হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রেও ইরানের পক্ষ থেকে কোনো বাধা নেই বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে একই সময়ে হরমুজকে ঘিরে বাস্তব পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। যুক্তরাষ্ট্র বলছে তারা জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করছে, অন্যদিকে ইরান সাম্প্রতিক সময়ে কিছু জাহাজকে নিষেধাজ্ঞা বা আটক-ঝুঁকির তালিকায় রেখেছে। ফলে কূটনৈতিক আশ্বাস আর সমুদ্রপথের বাস্তব নিরাপত্তার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য থেকেই যাচ্ছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বৈঠক, সামনে এলো দুই বড় বার্তা

বুধবার ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ইরানের রাষ্ট্রদূত। বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে জাহানাবাদী বলেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে তেহরান অবগত এবং ঢাকা একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে বলে তারা মনে করে। সেই কারণে মক্কা প্যাক্টে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ ইরানকে উদ্বিগ্ন করছে না।

ইরানি রাষ্ট্রদূতের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন বাংলাদেশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে মক্কা প্যাক্টে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সংসদে জানিয়েছেন, বাংলাদেশকে সদস্য করার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব এলে তা ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হবে। অন্যদিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানিয়েছেন, বিষয়টি এখনো মূল্যায়নের পর্যায়ে রয়েছে এবং জাতীয় স্বার্থই হবে প্রধান বিবেচনা।

‘মক্কা প্যাক্ট ইরানের বিরুদ্ধে নয়’

মক্কা চুক্তি নিয়ে তেহরানের অবস্থানটি তাৎপর্যপূর্ণ।

৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান চুক্তিটি স্বাক্ষর করে। এর মূল নীতির মধ্যে রয়েছে—তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা। ফলে চুক্তিটিকে ন্যাটোর যৌথ প্রতিরক্ষা নীতির সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। পরবর্তী পর্যায়ে তিন দেশ যৌথ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, সামরিক সমন্বয় ও প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগও নিচ্ছে।

কিন্তু তুরস্ক শুরু থেকেই বলছে, এটি ইরান বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে তৈরি হয়নি। পাকিস্তানও চুক্তিটিকে ‘purely defensive’ বলে বর্ণনা করেছে।

এখন ইরানের রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য সেই অবস্থানকে আরও সামনে আনল।

জাহানাবাদী বলেছেন, তেহরান মক্কা প্যাক্টকে ইরানবিরোধী কোনো উদ্যোগ হিসেবে দেখে না। বরং তাঁর বক্তব্যে, এই চুক্তিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার একটি ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

এই দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ চুক্তির তিন প্রতিষ্ঠাতা দেশের সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ফলে তেহরান চুক্তিটিকে সরাসরি শত্রুতামূলক জোট হিসেবে না দেখে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর নিজেদের নিরাপত্তা কাঠামো তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করছে।

আমন্ত্রণ পেলে ইরানও কি যোগ দেবে?

এখানে আরও বড় একটি বার্তা দিয়েছেন ইরানি রাষ্ট্রদূত।

তিনি বলেছেন, ইরান এখনো নিজের পক্ষ থেকে সদস্য হওয়ার আবেদন করেনি। কিন্তু মক্কা প্যাক্টের সদস্য দেশগুলো আমন্ত্রণ জানালে তেহরান সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করবে।

এটি বাস্তবে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ একটি অবস্থান।

কারণ মক্কা প্যাক্টের বর্তমান কাঠামো সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানকে একসঙ্গে এনেছে। এর মধ্যে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে; একই সঙ্গে সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সংঘাতে ইরান ও উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা হিসাবও পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

তবু যদি তেহরান বলে, “আমন্ত্রণ পেলে আমরাও যোগ দেব”, তাহলে সেটি অন্তত রাজনৈতিকভাবে বোঝাচ্ছে—ইরান চুক্তিটিকে অনিবার্যভাবে একটি anti-Iran bloc হিসেবে বিবেচনা করছে না।

তবে এর বাস্তব সম্ভাবনা নিয়ে এখনই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান ইরানকে সত্যিই সদস্য হিসেবে চাইবে কি না, সেটিই এখানে প্রথম প্রশ্ন।

বাংলাদেশের জ্বালানি জাহাজ নিয়ে ইরানের আশ্বাস

মক্কা প্যাক্টের বাইরে বৈঠকের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক এবং বাংলাদেশের জন্য সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল জ্বালানি সরবরাহ।

রাষ্ট্রদূত জাহানাবাদী বলেছেন, বাংলাদেশের LNG, গ্যাস ও জ্বালানিবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ইরানের পক্ষ থেকে কোনো সমস্যা বা বাধা নেই। এ বিষয়টি বাংলাদেশি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদেরও জানানো হয়েছে বলে তিনি দাবি করেছেন।

বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কারণ খুব সরল—দেশের LNG সরবরাহের একটি বড় অংশ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসে এবং হরমুজ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। যুদ্ধ ও নৌপথের অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশের LNG সরবরাহ ইতোমধ্যেই চাপের মধ্যে পড়েছিল।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ দিয়ে যুদ্ধের আগে বৈশ্বিক তেল ও LNG বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ চলাচল করত। সংঘাতের পর সেই প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমেছে।

কিন্তু হরমুজ কি সত্যিই স্বাভাবিক?

এখানেই বিষয়টির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জটিলতা।

ইরানের রাষ্ট্রদূত বলছেন, বাংলাদেশি জ্বালানি জাহাজের ক্ষেত্রে তেহরানের কোনো বাধা নেই। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে হরমুজ দিয়ে সব বাণিজ্যিক জাহাজ নির্বিঘ্নে চলাচল করছে।

২ সেপ্টেম্বরের রয়টার্স প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান হরমুজ দিয়ে চলাচলের নিয়ম ভঙ্গ করেছে বলে চিহ্নিত আরও ১১টি জাহাজকে কালো তালিকায় যুক্ত করেছে। এতে নিষিদ্ধ জাহাজের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৬। তালিকায় তেলবাহী জাহাজের পাশাপাশি LNG ও LPG বহনকারী জাহাজও রয়েছে। এসব জাহাজ জরিমানা, জব্দ বা আটকের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

অর্থাৎ তেহরানের অবস্থান হলো—সব জাহাজের ওপর সাধারণ নিষেধাজ্ঞা নেই; বরং নির্দিষ্ট কিছু জাহাজ ও নেভিগেশন আচরণকে তারা লক্ষ্য করছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। হোয়াইট হাউস দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রই বর্তমানে হরমুজের সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে এবং তাদের নৌবাহিনী বাণিজ্যিক জাহাজকে সুরক্ষা দিয়ে পার করছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, যারা অবরোধ ভেঙে চলাচলের চেষ্টা করেছে, তাদের কিছু জাহাজ ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ফলে বাস্তবতা দাঁড়াচ্ছে—ইরান বলছে বাংলাদেশি জাহাজের জন্য তাদের কোনো বাধা নেই; যুক্তরাষ্ট্র বলছে জলপথে তারাই কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা দিচ্ছে; আর আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের তথ্য বলছে, হরমুজে স্বাভাবিক বাণিজ্য এখনো ফেরেনি।

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এর অর্থ কী

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে হরমুজ সংকটের অর্থনৈতিক প্রভাবের মুখোমুখি হয়েছে।

কাতারের LNG সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পর বাংলাদেশকে স্পট মার্কেট থেকে বেশি LNG কিনতে হয়েছে। Reuters জানিয়েছিল, ২০২৬ সালের নির্ধারিত LNG সরবরাহ বাংলাদেশে অর্ধেকে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত হয়েছিল এবং ২৮ ফেব্রুয়ারির যুদ্ধ শুরুর পর কাতার থেকে বাংলাদেশগামী কোনো নির্ধারিত কার্গো পৌঁছাতে পারেনি।

এতে শুধু জ্বালানি আমদানির খরচ নয়, সরকারের ভর্তুকির ওপরও চাপ বেড়েছে। একটি সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, LNG ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তা ৬ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছিল।

অর্থাৎ হরমুজে জাহাজ চলাচল বাংলাদেশের জন্য কেবল পররাষ্ট্রনীতির বিষয় নয়। এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, পরিবহন, গ্যাসের সরবরাহ এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি।

বাংলাদেশ এখন কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে

ঢাকার অবস্থান এ পর্যন্ত বেশ সতর্ক।

একদিকে সরকার মক্কা প্যাক্টকে ইতিবাচকভাবে দেখছে এবং আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ পেলে বিষয়টি বিবেচনার কথা বলছে। অন্যদিকে শামা ওবায়েদ জানিয়েছেন, জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এবং এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ আসেনি।

অন্যদিকে ইরান বলছে, বাংলাদেশ মক্কা প্যাক্টে যুক্ত হলেও তেহরান উদ্বিগ্ন হবে না।

এই দুই অবস্থানের মধ্যে বাংলাদেশের জন্য একটি কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি হয়েছে—নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর আলোচনা চালিয়েও কোনো পক্ষকে আনুষ্ঠানিক শত্রু হিসেবে চিহ্নিত না করা।

তবে এই ভারসাম্য কতটা টেকসই হবে, সেটিই আসল প্রশ্ন।

সৌদি আরব, ইরান ও বাংলাদেশের ত্রিমুখী সমীকরণ

বাংলাদেশের জন্য মক্কা প্যাক্টের সবচেয়ে জটিল দিক এখানেই।

সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার ও অর্থনৈতিক অংশীদার। অন্যদিকে ইরান বাংলাদেশের জ্বালানি ও আঞ্চলিক কূটনীতির ক্ষেত্রে সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্যিক সম্পর্কও বাড়ছে।

অতএব ঢাকা এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চাইবে না, যাতে এক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার কারণে অন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় দূরত্ব তৈরি হয়।

ইরানের বর্তমান বার্তা বাংলাদেশের জন্য কিছুটা স্বস্তিদায়ক—তারা মক্কা প্যাক্টকে নিজেদের বিরুদ্ধে দেখছে না। এর ফলে ঢাকা চাইলে এই উদ্যোগকে সরাসরি কোনো anti-Iran arrangement হিসেবে ব্যাখ্যা না করেও আলোচনায় রাখতে পারবে।

ভারতের জন্যও বার্তাটি গুরুত্বপূর্ণ

মক্কা প্যাক্ট নিয়ে ভারতের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে পাকিস্তানের অংশগ্রহণ এবং তুরস্কের সঙ্গে ইসলামাবাদের ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সম্পর্ক। বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ তাই দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যের সঙ্গেও যুক্ত হচ্ছে।

ভারত ইতোমধ্যে জানিয়েছে, বাংলাদেশ মক্কা প্যাক্টে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তারা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

এখন ইরান যদি প্রকাশ্যে বলে, তারা চুক্তিটিকে ইরানবিরোধী মনে করছে না, তাহলে ঢাকার জন্য একটি অতিরিক্ত কূটনৈতিক যুক্তি তৈরি হচ্ছে—মক্কা প্যাক্টে অংশ নেওয়া মানেই কোনো একক আঞ্চলিক শক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়।

তবে ভারতের মূল্যায়ন শেষ পর্যন্ত শুধু ইরানের বক্তব্যের ওপর নির্ভর করবে না। পাকিস্তানের ভূমিকা, চুক্তির ভবিষ্যৎ কাঠামো এবং বাংলাদেশের অংশগ্রহণের ধরনই সেখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে।

‘ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি’ এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা

ইরানের রাষ্ট্রদূত যে বিষয়টির ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছেন, সেটি হলো বাংলাদেশের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি।

এই শব্দবন্ধটি এখন ঢাকার জন্য শুধু কূটনৈতিক পরিচয় নয়; বাস্তব নীতিগত পরীক্ষাও।

বাংলাদেশকে একই সময়ে সৌদি আরবের সঙ্গে শ্রম ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক, তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি সহযোগিতা, পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন করে বাড়তে থাকা যোগাযোগ, ভারতের সঙ্গে নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক, চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।

তার ওপর যুক্ত হয়েছে হরমুজ ও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সংকট।

সামনে কোন প্রশ্নগুলোর উত্তর দরকার

মক্কা প্যাক্ট নিয়ে বাংলাদেশের সিদ্ধান্তের আগে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

চুক্তিতে যুক্ত হলে বাংলাদেশের সামরিক বাধ্যবাধকতা ঠিক কী হবে?

কোনো সদস্য রাষ্ট্র যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে বাংলাদেশ কী ধরনের সহায়তা দিতে বাধ্য হবে?

ইরান যদি ভবিষ্যতে একই কাঠামোয় যুক্ত হতে চায়, তখন চুক্তিটির প্রকৃতি কী হবে?

বাংলাদেশের হরমুজগামী LNG ও জ্বালানি জাহাজের জন্য বাস্তবে কতটা নিরাপদ নৌপথ নিশ্চিত করা সম্ভব?

এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—এই নতুন নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়েও বাংলাদেশ কি তার বহুমুখী কূটনৈতিক ভারসাম্য অক্ষুণ্ন রাখতে পারবে?

শেষ পর্যন্ত বার্তাটা কী

এই মুহূর্তে তেহরানের বার্তা স্পষ্ট—বাংলাদেশ মক্কা প্যাক্টে যোগ দিলেও ইরান সেটিকে নিজেদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে না। বরং আমন্ত্রণ পেলে ইরান নিজেও যোগ দেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের জ্বালানি জাহাজ চলাচলের বিষয়ে তেহরান কোনো বাধা দিচ্ছে না বলে জানিয়েছে।

তবে সমুদ্রপথের বাস্তবতা এখনো সরল নয়। হরমুজে ইরান নির্দিষ্ট জাহাজকে কালো তালিকাভুক্ত করছে, আর যুক্তরাষ্ট্র জলপথের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণের দাবি করছে। ফলে কূটনৈতিক আশ্বাসের পাশাপাশি বীমা, নৌ-নিরাপত্তা, জাহাজের পতাকা, কার্গোর উৎস এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অনুমোদন—সবকিছুই বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহের বাস্তব ঝুঁকিতে প্রভাব ফেলছে।

বাংলাদেশের সামনে তাই এখন একটি অস্বাভাবিক কূটনৈতিক সুযোগ ও একই সঙ্গে কঠিন পরীক্ষা। মক্কা প্যাক্টে যোগ দেওয়া বা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত শুধু সামরিক বিষয় নয়; এটি জ্বালানি নিরাপত্তা, শ্রমবাজার, ভারত-সম্পর্ক, মধ্যপ্রাচ্য কূটনীতি এবং বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যৎ দিকও নির্ধারণ করতে পারে।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়; BSS; Reuters; The Daily Star; TBS; Prothom Alo; AP; White House; আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ও জ্বালানি-বাণিজ্যসংক্রান্ত প্রকাশিত তথ্য।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments