WHO বলছে, দুর্বল পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত হাসপাতালের কারণে বৃষ্টি ও বন্যা হলে রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়বে
গাজা/জেনেভা | ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
গাজায় বর্ষাকাল এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে নতুন স্বাস্থ্য সংকটের আশঙ্কা করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)। দীর্ঘ সংঘাতের কারণে পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বৃষ্টির পানি ও সম্ভাব্য বন্যা অতিরিক্ত স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি। Al Jazeera জানিয়েছে, গাজার পানি ব্যবস্থার বর্তমান দুর্বলতা এবং অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন এরই মধ্যে জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিকে কঠিন করে তুলেছে।
গাজায় ২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও WHO বলছে, স্বাস্থ্য চাহিদা এখনো বিপুল এবং চিকিৎসা সক্ষমতা সীমিত। বহু হাসপাতাল পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারেনি, আর দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের প্রয়োজন রয়েছে এমন রোগীর সংখ্যাও বড়।
বৃষ্টি নামলে সবচেয়ে বড় সমস্যা হতে পারে পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন
গাজার স্বাস্থ্যঝুঁকির বড় অংশ এখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের আক্রমণের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। ক্ষতিগ্রস্ত পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং দুর্বল পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
WHO-এর ২০২৬ সালের স্বাস্থ্য জরুরি মূল্যায়ন অনুযায়ী, দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে এ বছর ২৯ লাখ মানুষের স্বাস্থ্য সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে। গাজায় স্বাস্থ্যব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত থাকায় সামান্য নতুন চাপও বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে।
হাসপাতালগুলো এখনো স্বাভাবিক সক্ষমতায় ফেরেনি
WHO বলছে, গাজার হাসপাতালব্যবস্থা বহু বছর ধরে অতিরিক্ত চাপের মধ্যে রয়েছে। যুদ্ধের ফলে হাসপাতাল ও চিকিৎসা অবকাঠামোর ক্ষতি, ওষুধের ঘাটতি এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর চাপ—সব মিলিয়ে সাধারণ চিকিৎসা কার্যক্রমও কঠিন হয়ে পড়েছে।
২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত WHO-এর Health Resources and Services Availability Monitoring System-এর তথ্যে দেখা যায়, গাজার স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর কার্যকারিতা ও প্রয়োজনীয় সম্পদের ঘাটতি এখনো বড় সমস্যা। তবে সংস্থাটি এটিও জানিয়েছে যে ওই তথ্যের যাচাই ও validation প্রক্রিয়া চলমান।
যুদ্ধবিরতি থাকলেও সহিংসতা পুরোপুরি থামেনি
গাজায় ২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি হলেও নতুন করে সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। মঙ্গলবার ইসরায়েলি বিশেষ বাহিনী গাজা সিটিতে একটি অভিযানে হামাসের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে আটক করেছে বলে ইসরায়েল জানিয়েছে। একই দিনে ইসরায়েলি হামলায় ফিলিস্তিনিদের নিহত হওয়ার খবরও এসেছে; ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্যকর্মীরা হতাহতের তথ্য দিয়েছেন, আর ইসরায়েলি বাহিনী বলেছে তারা হামাসের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করেছে। এসব সংখ্যা ও দাবির কিছু অংশ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এতে বোঝা যাচ্ছে, যুদ্ধবিরতি থাকলেও গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনো এমন একটি পরিবেশে কাজ করছে যেখানে নতুন সহিংসতা ও অবকাঠামোগত ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে।
ক্ষুধা ও পানির সংকটও থেকে গেছে
জুলাইয়ের IPC মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ গাজার দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে থাকতে পারেন। ত্রাণের অর্থায়ন কমে যাওয়া এবং সরবরাহের সীমাবদ্ধতা এই ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে খাদ্য নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাটি জানিয়েছে।
একই সঙ্গে পানি ও স্যানিটেশন অবকাঠামোর দুর্বলতা স্বাস্থ্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। তাই বর্ষার পানি শুধু বন্যার ঝুঁকি নয়; দূষিত পানি ও রোগ সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
শিশু ও দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের ঝুঁকি বেশি
গাজার বর্তমান স্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে শিশু, গর্ভবতী নারী, প্রবীণ এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকতে পারেন। বৃষ্টির সময়ে আশ্রয়কেন্দ্রে অতিরিক্ত ভিড়, অপর্যাপ্ত পানি এবং দুর্বল স্যানিটেশন থাকলে ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ বাড়তে পারে।
WHO জানিয়েছে, স্বাস্থ্য অবকাঠামোর ওপর চাপ কমাতে জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ, পানি ও স্যানিটেশনসহ মৌলিক সেবার ধারাবাহিক সরবরাহ প্রয়োজন।
📊 গাজার স্বাস্থ্য পরিস্থিতি
• ২০২৬ সালে স্বাস্থ্য সহায়তার প্রয়োজন: ২৯ লাখ মানুষ
• স্বাস্থ্য সহায়তার জন্য লক্ষ্য জনগোষ্ঠী: ২৪ লাখ
• হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা: গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত
• বর্ষায় বড় ঝুঁকি: বন্যা, দূষিত পানি ও রোগ বিস্তার
• ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ তীব্র খাদ্যসংকটের সম্ভাব্য ঝুঁকি: ২/৩-এর বেশি জনগোষ্ঠী
🌍 কেন এটি শুধু গাজার সমস্যা নয়
গাজার স্বাস্থ্যসংকট দেখাচ্ছে, যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে যুদ্ধবিরতির পরও জনস্বাস্থ্যের পুনরুদ্ধার কতটা কঠিন। হাসপাতাল দাঁড় করানো, পানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা এবং পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা পুনর্গঠন করতে দীর্ঘ সময় লাগে।
তাই যুদ্ধবিরতি মানেই মানবিক সংকটের অবসান নয়। বরং যুদ্ধের পরবর্তী ধাপে স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো পুনর্গঠনই অনেক ক্ষেত্রে সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
🧭 সামনে কী
বর্ষাকাল শুরু হওয়ার আগে পানি নিষ্কাশন, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং হাসপাতালের জরুরি প্রস্তুতি বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে মানবিক ত্রাণের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা না গেলে স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
তথ্যসূত্র: WHO, Reuters, Al Jazeera, IPC।




