ইরান যুদ্ধের প্রভাবে Brent ৯২ ডলারের ওপরে; জাপানের ১০ বছরের বন্ডের ফলন ৩ শতাংশে, যুক্তরাষ্ট্রেও সুদ বাড়ার আশঙ্কা
নিউইয়র্ক/লন্ডন/টোকিও | ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সেপ্টেম্বরের শুরুতেই বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের নতুন দফার কারণে তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি বিশ্বের প্রধান অর্থনীতিগুলোর সরকারি বন্ডের সুদও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মূল্যস্ফীতি, সুদের হার এবং সরকারি ঋণের বোঝা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মঙ্গলবার বিশ্বব্যাপী শেয়ারবাজারেও চাপ লক্ষ্য করা গেছে।
Brent crude-এর দাম ৯২.৫৯ ডলার এবং U.S. crude-এর দাম ৮৮.১৬ ডলারে উঠেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছরের ট্রেজারি বন্ডের ফলন প্রায় ৪.৭৭ শতাংশ, আর জাপানের ১০ বছরের সরকারি বন্ডের ফলন ৩ শতাংশে পৌঁছেছে—১৯৯৬ সালের পর এ ধরনের মাত্রা আর দেখা যায়নি।
তেল বাড়লে কেন সুদের হার নিয়েও বাজারের ভয় বাড়ে
তেলের দাম বাড়লে সাধারণত পরিবহন, বিদ্যুৎ, শিল্প উৎপাদন এবং পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়ে। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি খরচের একটি অংশ ভোক্তার দামে গিয়ে পড়ে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি আবার বাড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার কমানোর পরিকল্পনা স্থগিত করতে পারে, এমনকি প্রয়োজন হলে বাড়াতেও পারে।
রয়টার্সের বাজার বিশ্লেষণ বলছে, বর্তমানে ঠিক এই আশঙ্কাই বাজারে কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের বন্ডের ফলন বাড়ছে, কারণ বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতি ও সুদের ঝুঁকির জন্য বেশি রিটার্ন চাইছেন।
জাপানে ৩০ বছর পর ৩ শতাংশের নতুন মাইলফলক
জাপানের সরকারি বন্ড বাজারে সাম্প্রতিক পরিবর্তন বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ১০ বছরের বন্ডের ফলন ৩ শতাংশে ওঠা দেশটির দীর্ঘমেয়াদি সুদের ইতিহাসে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। জাপান বহু বছর ধরে অত্যন্ত কম সুদের নীতি অনুসরণ করেছে; তাই বর্তমান ঊর্ধ্বগতি দেশটির আর্থিক ব্যবস্থায় পরিবর্তনের বড় লক্ষণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
একই সঙ্গে জাপানি ইয়েন দুর্বল হওয়ায় দেশটির সরকারকে মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হচ্ছে। জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রীরা ইয়েনের অস্বাভাবিক ওঠানামা নিয়ন্ত্রণে সমন্বয় চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছেন।
ইউরোপেও মূল্যস্ফীতির চাপ নতুন করে ফিরে এসেছে
ইউরোজোনে আগস্টের মূল্যস্ফীতি ৩ শতাংশের ওপরে উঠে গেছে। উচ্চ জ্বালানি ব্যয় এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফলে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে এখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
আগে বাজারে যে প্রত্যাশা ছিল, ভবিষ্যতে সুদের হার কমতে পারে, তা এখন দুর্বল হচ্ছে। উচ্চ তেলের দাম দীর্ঘস্থায়ী হলে সেই প্রত্যাশা আরও বদলে যেতে পারে।
শেয়ারবাজার কেন পিছিয়ে পড়ছে
উচ্চ বন্ডের সুদ সাধারণত শেয়ারবাজারের জন্য চাপ তৈরি করে। কারণ বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে তুলনামূলক নিরাপদ সরকারি বন্ডে অর্থ সরিয়ে নিতে পারেন। একই সঙ্গে উচ্চ সুদের হার কোম্পানিগুলোর ঋণের খরচ বাড়ায় এবং ভবিষ্যৎ লাভের মূল্যায়নকে কম আকর্ষণীয় করে।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সূচকগুলো কমেছে এবং বিশ্বজুড়ে বাজারে দুর্বলতা দেখা গেছে। তেল ও বন্ড—দুই বাজারের একযোগে ঊর্ধ্বগতি এই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়েছে।
সরকারি ঋণও হয়ে উঠছে বড় ঝুঁকি
রয়টার্সের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শুধু মুদ্রাস্ফীতি নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারি ঋণের পরিমাণও বন্ড বাজারে চাপ তৈরি করছে। ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকলে সরকারকে পুরোনো ঋণ পরিশোধ ও নতুন ঋণ নিতে বেশি সুদ দিতে হয়। এতে বাজেটের ওপর চাপ বাড়ে এবং বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি বন্ডে আরও বেশি সুদ দাবি করতে পারেন।
বিশ্বের মোট ঋণের পরিমাণ ইতোমধ্যেই বিশাল। একই সময়ে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর AI-নির্ভর বিনিয়োগের কারণে করপোরেট বন্ড ইস্যুও দ্রুত বেড়েছে।
🇧🇩 বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
বিশ্ববাজারে তেলের দাম ও সুদের হার একসঙ্গে বাড়লে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য চাপ বাড়তে পারে। জ্বালানি আমদানির বিল বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন বাড়বে। আবার বিশ্ববাজারে সুদের হার বেশি থাকলে বৈদেশিক ঋণ ও আন্তর্জাতিক অর্থায়নের খরচও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা যদি বাংলাদেশি রপ্তানি পণ্যের চাহিদা কমিয়ে দেয়, তাহলে রপ্তানি আয়ের ওপরও চাপ পড়তে পারে।
📊 বাজারের গুরুত্বপূর্ণ সূচক
| সূচক | সর্বশেষ অবস্থা |
|---|---|
| Brent crude | $92.59 |
| U.S. crude | $88.16 |
| U.S. 10-year yield | প্রায় 4.77% |
| Japan 10-year yield | 3% |
| Euro zone inflation | 3%-এর ওপরে |
🧭 সামনে নজর কোথায়
আগামী দিনে বাজারের মূল নজর থাকবে তেলের দাম, ইরান সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের পরিসংখ্যানের দিকে। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার—দুই ঝুঁকিই স্থায়ী হতে পারে।
তথ্যসূত্র: Reuters, European Central Bank data, U.S. Treasury, Bank of Japan.




