একদিন ক্যাম্পাসের ক্ষমতার রাজনীতির মাঠে; আজ মায়ের শেষ বিদায়ে কারাগারের বন্দি—বিশ্বজিৎ দাস হত্যা মামলার সাজাপ্রাপ্ত রফিকুল ইসলাম শাকিলের ছবি যেন বলে দেয়, রাজনৈতিক সহিংসতার সবচেয়ে বড় মূল্য শেষ পর্যন্ত কে দেয়
চেনা যায় কি?
ছবির মানুষটিকে প্রথম দেখায় হয়তো অনেকেই চিনতে পারবেন না। একসময়কার তরুণ ছাত্রনেতা—আজ চুল-দাড়িতে বয়সের ছাপ, মুখে ক্লান্তি, হাতে হাতকড়া। পাশে মায়ের মরদেহ। কাঁধে শেষবারের মতো মায়ের খাটিয়া।
তিনি রফিকুল ইসলাম ওরফে শাকিল—২০১২ সালের বহুল আলোচিত বিশ্বজিৎ দাস হত্যা মামলার আসামি এবং পরবর্তীতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের একজন।
গত ১৮ আগস্ট পটুয়াখালী শহরে মায়ের জানাজায় অংশ নিতে প্যারোলে মুক্তি পেয়েছিলেন তিনি। জানাজা শেষে তাঁকে আবার কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। প্রকাশিত ছবিতে মায়ের মরদেহ বহন করার সময় তাঁর হাতে হাতকড়া দেখা যায়।
একজন মানুষের জীবনের দুই প্রান্তকে একই ছবিতে যেন পাশাপাশি দাঁড় করিয়েছে সময়।
একদিকে—একজন সন্তান, মায়ের শেষ বিদায়ে চোখে পানি।
অন্যদিকে—একজন সাজাপ্রাপ্ত বন্দি, যার নিজের জীবনও বহু বছর ধরে কারাগারের চার দেয়ালে আটকে।
এই ছবি শুধু শাকিলের নয়।
এটি বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির জন্যও একটি আয়না।
যে হত্যাকাণ্ড পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল
২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর। বিএনপির ডাকা অবরোধ চলছিল ঢাকায়।
পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কের কাছে পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন ২৪ বছর বয়সী দর্জির দোকানের কর্মচারী বিশ্বজিৎ দাস।
পরবর্তীতে মামলার তদন্ত ও আদালতের কার্যক্রমে উঠে আসে, তাঁকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ—‘শিবির’—সন্দেহে ছাত্রলীগের একদল কর্মী ধাওয়া করে, পিটিয়ে ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে হত্যা করে।
ঘটনার ভিডিওচিত্র ও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি মুহূর্তেই দেশ-বিদেশে আলোড়ন তোলে। প্রত্যক্ষদর্শীদের চোখের সামনে প্রকাশ্য রাস্তায় একজন নিরস্ত্র মানুষকে হত্যার দৃশ্য বাংলাদেশের রাজনীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ভয়াবহ প্রশ্ন তোলে। পরবর্তী সময়ে তদন্তে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের ২১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।
সেই ২১ জনের মধ্যে ছিলেন রফিকুল ইসলাম শাকিল।
তখন শাকিল ছিলেন মাত্র ২০ বছরের তরুণ
শাকিলকে ঘিরে মামলার সময়ের সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতে তাঁকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
আজকের ছবির সঙ্গে সেই সময়ের তরুণ শাকিলের চেহারা মিলিয়ে দেখলে সময়ের নিষ্ঠুরতা আরও স্পষ্ট হয়।
তখন সামনে ছিল পুরো জীবন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা।
বন্ধু।
স্বপ্ন।
ক্যারিয়ার।
পরিবার।
একটি স্বাভাবিক ভবিষ্যৎ।
কিন্তু রাজনৈতিক সহিংসতার এক ভয়াবহ ঘটনায় তাঁর জীবন ঘুরে যায় সম্পূর্ণ অন্যদিকে।
এখানে একটি বিষয়ও স্পষ্ট থাকা জরুরি—বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডকে কোনো রাজনৈতিক পক্ষের সাধারণ কর্মীদের আচরণের প্রতিনিধিত্ব হিসেবে দেখা যায় না। এটি নির্দিষ্ট একটি হত্যা মামলা, যেখানে নির্দিষ্ট আসামিদের বিরুদ্ধে আদালত রায় দিয়েছেন।
আদালতে কী হয়েছিল?
বিশ্বজিৎ দাস হত্যা মামলায় ২১ আসামির বিরুদ্ধে বিচার হয়।
২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪ আটজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।
এরপর আসামিপক্ষের আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের শুনানি হয় হাইকোর্টে।
২০১৭ সালের ৬ আগস্ট হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের রায়ের পরিবর্তন করেন। রফিকুল ইসলাম শাকিল ও রাজন তালুকদারের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়। চারজনের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন করা হয় এবং দুজনকে খালাস দেওয়া হয়। পাশাপাশি যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত ১৩ আসামির মধ্যে আপিলকারী দুজন খালাস পান।
অর্থাৎ শাকিলের ক্ষেত্রে হাইকোর্টেও মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে।
মামলার রায়ে আদালত বিভিন্ন আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য ও ভিডিওচিত্রসহ প্রমাণ বিবেচনা করেছিল। শাকিলের আইনজীবী অবশ্য সেই সময় অভিযোগের প্রমাণ নিয়ে আপত্তি তুলে উচ্চতর আদালতে যাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।
তবে বর্তমান প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী, শাকিল বিশ্বজিৎ হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এবং কারাগারে রয়েছেন। তাঁর ২০১৪ সালের Criminal Appeal No. 86/2014 এবং Jail Appeal No. 23/2014-এর উল্লেখ সুপ্রিম কোর্টের cause list-এ রয়েছে।
১৪ বছর পর মায়ের জানাজায় সেই শাকিল
২০২৬ সালের আগস্ট।
মা সাহিদা বেগম মারা গেলেন।
মায়ের মৃত্যুর পর শেষবারের মতো তাঁর মুখ দেখা এবং জানাজায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পেলেন শাকিল। আইনি প্রক্রিয়ায় তাঁকে সাময়িকভাবে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়। ১৮ আগস্ট পটুয়াখালী শহরের কর ভবন জামে মসজিদের সামনে মায়ের জানাজায় তিনি অংশ নেন। পরে তাঁকে আবার কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয় বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
ছবিটা এখানেই থামিয়ে দেয়।
কারণ মায়ের কফিন কাঁধে তোলা একজন সন্তানের হাতে যদি হাতকড়া থাকে, তখন রাজনীতি, দল, ক্ষমতা—সবকিছুর ওপরে উঠে আসে মানুষের সবচেয়ে সাধারণ পরিচয়টি:
সে একজন সন্তান।
রাজনীতি কি তার কর্মীকে বিপদের দিনে চিনতে পারে?
এটাই হয়তো এই ছবির সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্ন।
শাকিল যে রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, সেই সময়ের রাজনীতি ছিল তীব্র সংঘাতপূর্ণ। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ‘শিবির’, ‘বিরোধী’, ‘শত্রু’—এই ধরনের পরিচয়ে চিহ্নিত করার প্রবণতা ছিল ভয়াবহ।
তারপর শুরু হতো উত্তেজনা।
ধাওয়া।
হামলা।
মামলা।
আর কখনো কখনো প্রাণহানি।
কিন্তু রাজনৈতিক সংঘর্ষের মাঠে যে তরুণটি সামনে থাকে, তাকে সাধারণত মনে হয়—সে অমর।
কিন্তু মানুষ অমর নয়।
নেতৃত্বও চিরস্থায়ী নয়।
ক্ষমতাও নয়।
একটি সরকার যায়, আরেকটি সরকার আসে।
একজন নেতা বিদেশে চলে যেতে পারেন।
আরেকজন অবসর নেন।
কেউ মন্ত্রী হন।
কেউ সংসদ সদস্য।
কেউ আবার দলের গুরুত্বপূর্ণ পদ হারান।
কিন্তু একজন কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হলে, বিচার হলে, সাজা হলে—আইনের সামনে দাঁড়াতে হয় সেই কর্মীকেই।
নেতা কি জেলের দরজা পর্যন্ত সঙ্গে যায়?
এই প্রশ্নটি হয়তো ছাত্ররাজনীতির প্রতিটি তরুণের নিজের কাছে করা উচিত।
নেতা যদি বলেন—
“এগিয়ে যাও।”
“ওদের মোকাবিলা করো।”
“ওরা শত্রু।”
“দলের জন্য কিছু করতে হবে।”
তখন তরুণ কর্মীটি হয়তো ভাবতে পারে—এই কাজই তার রাজনৈতিক কর্তব্য।
কিন্তু যদি পরিস্থিতি উল্টে যায়?
যদি মামলা হয়?
যদি ভিডিও থাকে?
যদি আদালতে প্রমাণ হাজির হয়?
যদি সাজা হয়?
তখন?
নেতা কি তার হয়ে সাজা খাটবেন?
নেতা কি তার পরিবারের সঙ্গে কারাগারের সামনে বসবেন?
নেতা কি তার বৃদ্ধ মা-বাবার চোখের পানি মুছবেন?
বিশ্বজিৎ হত্যার ঘটনাটি এবং শাকিলের দীর্ঘ কারাজীবন তরুণ রাজনীতিকদের জন্য এই প্রশ্নগুলো নতুন করে সামনে আনে।
বিশ্বজিতের পরিবারের দুঃখও কি আমরা ভুলে গেছি?
এখানে আবেগের ভারসাম্যটিও জরুরি।
শাকিলের মায়ের মৃত্যু নিঃসন্দেহে একটি মানবিক ট্র্যাজেডি।
একজন মায়ের শেষ বিদায়ে তাঁর সন্তানের কাঁধে হাতকড়া দেখার দৃশ্য যে কাউকে নাড়া দিতে পারে।
কিন্তু একইসঙ্গে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না—বিশ্বজিৎ দাসও কারও সন্তান ছিলেন।
তাঁর পরিবারও একদিন তাঁকে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষা করেছিল।
তাঁরও ছিল ভবিষ্যৎ।
তাঁরও ছিল স্বপ্ন।
তাঁর মা-বাবা কিংবা স্বজনদের কাছে তাঁর জীবনও ছিল অমূল্য।
তাই একটি মানবিক সমাজের দায়িত্ব হলো—একজন বন্দির প্রতি মানবিক অনুভূতি রাখার পাশাপাশি নিহত ব্যক্তির প্রতি ন্যায়বিচারের প্রশ্নটিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া।
দুজনের মানবিক মর্যাদা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়।
ছাত্ররাজনীতির সবচেয়ে বড় শিক্ষা: নেতার জন্য নয়, নিজের বিবেকের জন্য রাজনীতি
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতি গণতন্ত্রের প্রশিক্ষণক্ষেত্র হতে পারে।
এখান থেকেই তৈরি হতে পারে ভবিষ্যতের সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, প্রশাসক, শিক্ষক, সাংবাদিক, উদ্যোক্তা ও রাষ্ট্রনায়ক।
কিন্তু যদি ছাত্ররাজনীতি শেখায়—
“আমার নেতা যা বলবেন, সেটাই শেষ কথা”—
তাহলে সেটি গণতান্ত্রিক শিক্ষার বদলে আনুগত্যের প্রশিক্ষণে পরিণত হয়।
রাজনীতি যদি শেখায়—
“প্রতিপক্ষকে শত্রু মনে করো”—
তাহলে একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসই সংঘর্ষের মাঠ হয়ে যায়।
আর রাজনীতি যদি শেখায়—
“দলের স্বার্থে আইন ভাঙলেও সমস্যা নেই”—
তাহলে তার পরিণতি হতে পারে আদালত, কারাগার এবং একটি ধ্বংস হয়ে যাওয়া জীবন।
বর্তমান ছাত্ররাজনীতির তরুণদের জন্য একটি সতর্কবার্তা
আজ যারা ছাত্ররাজনীতিতে আছেন, তাঁদের কাছে এই ছবির বার্তা খুব সরল।
রাজনীতি করুন।
কিন্তু নিজের বিবেক বন্ধ করে নয়।
দলের জন্য কাজ করুন।
কিন্তু অপরাধের বিনিময়ে নয়।
নেতাকে সম্মান করুন।
কিন্তু তাঁকে নিজের বিবেকের বিকল্প বানাবেন না।
কেউ যদি আপনাকে বলে, “আমি আছি”—তবুও মনে রাখবেন, আপনার নামে মামলা হলে আদালতে আপনাকেই দাঁড়াতে হবে।
আপনার হাতে হাতকড়া পড়লে আপনার নেতার হাতে নয়, আপনার নিজের হাতেই পড়বে।
আপনি জেলে গেলে আপনার নেতার সন্তান হয়তো পড়াশোনা করবে বিদেশে।
আপনার মা হয়তো আপনার মুক্তির জন্য আদালতের বারান্দায় দাঁড়াবেন।
আপনার বাবা হয়তো মানুষের কাছে হাত পাতবেন।
আপনার সন্তান হয়তো বাবাকে জেলের গেটের ওপারে দেখবে।
এটাই কঠিন বাস্তবতা।
শেষ কথা: রাজনীতি বদলাতে হবে, রাজনীতির জন্য জীবন নয়
বিশ্বজিৎ দাসের হত্যাকাণ্ড আমাদের শেখায়—রাজনৈতিক পরিচয়ের নামে একজন নিরপরাধ মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়া কোনোভাবেই রাজনীতি হতে পারে না।
আর শাকিলের বর্তমান ছবি আমাদের অন্য একটি শিক্ষা দেয়—অপরাধের অভিযোগ ও বিচার শেষ পর্যন্ত ব্যক্তির জীবনেই ফিরে আসে।
১৪ বছর পর মায়ের জানাজায় হাতকড়া হাতে দাঁড়িয়ে থাকা একজন সাজাপ্রাপ্ত তরুণকে দেখে তাই শুধু শাকিলকে নিয়ে আবেগী হওয়ার সুযোগ নেই।
এই ছবির ভেতরে আমাদের নিজেদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রশ্নও আছে।
ক্ষমতার রাজনীতি বদলায়।
দল বদলায়।
সরকার বদলায়।
নেতা বদলায়।
কিন্তু একজন তরুণের জীবনের নষ্ট হয়ে যাওয়া বছর আর ফিরে আসে না।
তাই আজকের ছাত্ররাজনীতির তরুণদের কাছে শেষ কথাটি হোক—
রাজনীতি করুন মানুষের জন্য, আদর্শের জন্য, দেশের জন্য।
কোনো নেতার ব্যক্তিগত স্বার্থে নিজের জীবন বা অন্যের জীবন ধ্বংস করার জন্য নয়।
Think before you act.
Choose your politics carefully.
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিশ্বজিৎ দাস হত্যা মামলার রায় ও পরবর্তী গ্রেপ্তারসংক্রান্ত প্রতিবেদন; বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের cause list; ২০২৬ সালের শাকিলের মায়ের জানাজায় প্যারোলে অংশগ্রহণসংক্রান্ত সাম্প্রতিক প্রতিবেদন।




