‘১ সেপ্টেম্বরের আগে প্রধান সড়ক থেকে অটোরিকশা সরাতে হবে’—দাবি বাস্তবায়ন না হলে ২০ আগস্ট থেকে নিজেদের উদ্যোগে অভিযানের ঘোষণা
ঢাকা | TODAY TV BD | ক্যাম্পাস ডেস্ক
রাজধানীর প্রধান সড়কে অটোরিকশা চলাচল নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের মধ্যে এবার কঠোর অবস্থান নিয়েছেন একদল শিক্ষার্থী। অটোরিকশা মালিকদের একটি কথিত ‘সিন্ডিকেট’ পরিস্থিতি জটিল করার চেষ্টা করছে—এমন অভিযোগ তুলে সরকারের প্রতি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
শিক্ষার্থীদের ঘোষণা অনুযায়ী, ১৯ আগস্ট ২০২৬-এর মধ্যে প্রধান সড়ক থেকে অটোরিকশা অপসারণে কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান না হলে ২০ আগস্ট থেকে নিজেদের উদ্যোগে অটোরিকশার বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করবেন তারা।
একই সঙ্গে আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তাঁদের এই উদ্যোগের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক দলের নাম বা পরিচয় যুক্ত করা হোক—এটি তাঁরা চান না। বরং তাঁরা দাবি করছেন, বিষয়টি রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে রেখে শিক্ষার্থীদের জনস্বার্থভিত্তিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হোক।
‘সরকার সহযোগিতা করছে, কিন্তু সিন্ডিকেটের কাছে ধরাশায়ী’
শিক্ষার্থীদের বক্তব্যে দাবি করা হয়েছে, সরকার তাদের দাবির বিষয়ে সহযোগিতা করার চেষ্টা করছে। তবে অটোরিকশা মালিকদের কথিত প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কারণে সেই উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তাদের ভাষ্য, প্রশাসনের প্রতি তাঁদের বিরোধিতা নেই। বরং সরকারকে তারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন।
শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, “আমরা খুবই ভিতরের Information থেকে জানতে পেরেছি ১লা সেপ্টেম্বরের আগে নতুন Issue create করার চেষ্টা করছিলো Autorickshaw মালিক সমিতির syndicate.”
তবে অটোরিকশা মালিক সমিতির কোনো নির্দিষ্ট পক্ষ ১ সেপ্টেম্বরের আগে নতুন কোনো ইস্যু বা সংকট তৈরির চেষ্টা করেছে—শিক্ষার্থীদের এই অভিযোগের স্বাধীন কোনো প্রমাণ এই প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট মালিক সমিতি বা কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যও পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগটি আপাতত শিক্ষার্থীদের বক্তব্য হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
‘আমাদের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক দলের নাম ব্যবহার করবেন না’
আন্দোলনকারীরা তাঁদের বক্তব্যে রাজনৈতিক দলগুলোর নাম ব্যবহার না করার জন্য সবার প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়েছেন।
তাঁদের বক্তব্য, কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থন বা পরিচয় দিয়ে তাঁদের আন্দোলনকে উপস্থাপন করা হলে সেটি তাঁদের মূল উদ্দেশ্যকে ভিন্নভাবে তুলে ধরতে পারে।
তারা বলছেন, তাঁরা আজ যে অবস্থান নিয়েছেন, তা কোনো রাজনৈতিক দলের হয়ে নয়; বরং শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে একটি নির্দিষ্ট দাবিকে সামনে রেখে।
‘আজ সবার হয়ে মাঠে নামছি, ক্রেডিট চাই না’
শিক্ষার্থীরা আরও জানিয়েছেন, তাঁদের উদ্দেশ্য কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক কৃতিত্ব নেওয়া নয়।
তাঁদের ভাষ্য, তাঁরা “সবার হয়ে” মাঠে নামছেন। দাবি বাস্তবায়িত হলে তাঁরা আবার নিজেদের ক্যাম্পাসে ফিরে যাবেন। আন্দোলনের কৃতিত্বও তাঁরা চান না।
তাঁদের বক্তব্যে বলা হয়েছে, “আমরা আজকে সবার হয়ে মাঠে নামছি এবং আমাদের দাবি বাস্তবায়ন হয়ে গেলে আমরা আমাদের ক্যাম্পাসে ফিরে যাবো। এখানে আমরা কোনো ধরনের কোনো Credit চাই না।”
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশকে ভালোভাবে উপস্থাপন করতে চান শিক্ষার্থীরা
অটোরিকশা নিয়ে তাঁদের দাবির সঙ্গে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির বিষয়টিও যুক্ত করেছেন শিক্ষার্থীরা।
তাঁদের বক্তব্য, ভবিষ্যতে যখন তাঁরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যাবেন, তখন একজন বিদেশির কাছে যেন বাংলাদেশকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে পারেন—এটিও তাঁদের প্রত্যাশার একটি অংশ।
তাঁদের ভাষায়, “আমরা জাস্ট এতোটুকু চাই, আমরা যখন International পর্যায় যাবো আমরা যাতে একজন Foreigner কে আমরা আমাদের দেশটা নিয়ে সুন্দর ভাবে তাদের কাছে represent করতে পারি।”
অর্থাৎ, শিক্ষার্থীদের বক্তব্যে সড়ক ব্যবস্থাপনা, নগরশৃঙ্খলা এবং দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির বিষয়টি একই সঙ্গে উঠে এসেছে।
১৯ আগস্টের মধ্যে প্রধান সড়ক থেকে অটোরিকশা সরানোর দাবি
শিক্ষার্থীরা সরকারের কাছে নির্দিষ্ট সময়সীমাও বেঁধে দিয়েছেন।
তাঁদের দাবি, ১৯ আগস্টের মধ্যে প্রধান সড়ক থেকে অটোরিকশা অপসারণ করতে হবে।
তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, সরকার যদি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়, তাহলে ২০ আগস্ট থেকে তাঁরা নিজেদের উদ্যোগে অটোরিকশার বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করবেন।
তবে এই ‘অভিযান’ কী ধরনের হবে, কোথায় হবে কিংবা কী পদ্ধতিতে পরিচালিত হবে—এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের প্রকাশিত বক্তব্যে বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা জানানো হয়নি।
২০ আগস্ট ঘিরে বাড়ছে প্রত্যাশা ও শঙ্কা
শিক্ষার্থীদের এই ঘোষণার ফলে আগামী ২০ আগস্টকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সরকার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয় এবং শিক্ষার্থীদের ঘোষিত কর্মসূচি বাস্তবে কী রূপ নেয়—সেদিকেই এখন নজর থাকবে।
তবে সাধারণ নাগরিক বা শিক্ষার্থীদের নিজস্ব উদ্যোগে যানবাহন থামানো, অপসারণ করা বা কোনো ধরনের অভিযান পরিচালনা করলে তা আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তার প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনানুগ ও প্রশাসনিক উদ্যোগই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা
আন্দোলনকারীরা তাঁদের পাশে দাঁড়ানো বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।
তাঁদের বক্তব্যে বিশেষভাবে বলা হয়েছে, “আমাদের সকল Private University সহ বাকী সকল University কে সাপোর্ট করার জন্য আপনাদের সবাইকে মনের ভিতর থেকে অসংখ্য ধন্যবাদ।”
এতে বোঝা যাচ্ছে, আন্দোলনকারীরা বিষয়টিকে একটি নির্দিষ্ট ক্যাম্পাসের কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সমর্থনকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
‘৪৮ ঘণ্টায় সমাধান না হলে ২০ আগস্ট দেখা হচ্ছে’
শিক্ষার্থীদের বক্তব্যের শেষাংশে সরকারের প্রতি আবারও কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে।
তাঁদের ভাষ্য, সরকার যদি কথিত অটোরিকশা সিন্ডিকেটের প্রভাব মোকাবিলা করে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়, তাহলে ২০ আগস্ট তাঁরা মাঠে নামবেন।
তাঁদের বক্তব্য, “যদি Govt. এই syndicate এর বেড়া-জালে ৪৮ ঘন্টার মধ্যে ব্যর্থ হয়, তাহলে আপনাদের সবার সাথে ২০ শে আগস্ট দেখা হচ্ছে।”
তবে শিক্ষার্থীদের এই বক্তব্যে কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততার কথা বলা হয়নি। বরং আন্দোলনকে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে রাখার বিষয়টিই তাঁরা বারবার তুলে ধরেছেন।
অটোরিকশা নিয়ে মূল বিরোধ কোথায়
রাজধানীর সড়কে অটোরিকশা চলাচল নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে যানজট, সড়ক ব্যবস্থাপনা, যাত্রী পরিবহন এবং চালক-মালিকদের জীবিকার প্রশ্ন।
প্রধান সড়কে ধীরগতির যান চলাচল নগরীর যানবাহনের গতি কমিয়ে দিতে পারে। আবার অনেক যাত্রীর জন্য অটোরিকশা স্বল্পদূরত্বের যাতায়াতে গুরুত্বপূর্ণ বাহন। ফলে অটোরিকশা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একদিকে যানজট ও সড়কশৃঙ্খলা, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের পরিবহন সুবিধা—দুই বিষয়ই বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
এ কারণে স্থায়ী সমাধানের জন্য কোন সড়কে অটোরিকশা চলবে, কোন রুটে চলবে, কোথায় স্ট্যান্ড থাকবে এবং কীভাবে নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব বিষয়ে কার্যকর ও স্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন।
এখন সরকারের সামনে কী
শিক্ষার্থীদের ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটামের পর সরকারের সামনে এখন দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে—একদিকে প্রধান সড়কে অটোরিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের ঘোষিত কর্মসূচি যেন কোনো ধরনের সংঘাত বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি না ঘটায়, তা নিশ্চিত করা।
অন্যদিকে অটোরিকশা মালিকদের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত ‘সিন্ডিকেট’-সংক্রান্ত অভিযোগও যাচাই করা প্রয়োজন। কোনো সংগঠিত স্বার্থগোষ্ঠী পরিবহন ব্যবস্থাপনায় প্রভাব বিস্তার করছে কি না, থাকলে তার ধরন কী—তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তেই পরিষ্কার হতে পারে।
সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে রুটভিত্তিক পরিবহন ব্যবস্থাপনা, নির্ধারিত স্ট্যান্ড, সড়ক ব্যবহারের নিয়ম এবং আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে একই সঙ্গে যানজট কমানো ও সাধারণ যাত্রীদের পরিবহন সুবিধা বজায় রাখা সম্ভব হতে পারে।
এখন নজর ২০ আগস্টে
শিক্ষার্থীদের ঘোষিত সময়সীমা অনুযায়ী, ১৯ আগস্টের মধ্যে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ দেখার পর ২০ আগস্ট পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণ করবেন তারা।
তবে পরিস্থিতি সংঘাতের দিকে যাওয়ার আগেই আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থীরা যেমন সরকারের সহযোগিতার কথা স্বীকার করেছেন, তেমনি সরকারও চাইলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে নিয়ে দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে পারে।
শেষ পর্যন্ত অটোরিকশা নিয়ে এই বিরোধের স্থায়ী সমাধান নির্ভর করবে সড়ক ব্যবস্থাপনায় আইন প্রয়োগ, পরিবহন খাতের জবাবদিহি এবং সাধারণ মানুষের জন্য বাস্তবসম্মত বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর।
তথ্যসূত্র: শিক্ষার্থীদের প্রকাশিত বক্তব্য ও বিবৃতি; সংশ্লিষ্ট পরিবহন ও সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্য; প্রাসঙ্গিক সংবাদ প্রতিবেদন। অটোরিকশা মালিক সমিতির ‘সিন্ডিকেট’ ১ সেপ্টেম্বরের আগে নতুন ইস্যু তৈরির চেষ্টা করেছে—এ অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এই প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত সম্ভব হয়নি।




