সিংড়ার শতবর্ষী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পুনর্মিলন ও শতবর্ষ পূর্তি উৎসব ঘিরে সাবেক শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের মধ্যে উৎসাহ; নিবন্ধনের শেষ সময় ১৫ আগস্ট
সিংড়া (নাটোর) | TODAY TV BD
নাটোরের সিংড়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী কলম উচ্চ বিদ্যালয়ের শতবর্ষ পূর্তি উৎসব ঘিরে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিক্ষার্থী গড়ে তোলা এই পুরোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শতবর্ষ উদযাপনকে কেন্দ্র করে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা সাবেক শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। আয়োজকদের পক্ষ থেকে উৎসবে অংশগ্রহণের জন্য নিবন্ধন কার্যক্রম চলছে। নিবন্ধনের শেষ সময় ১৫ আগস্ট ২০২৬।
উৎসবের নিবন্ধনের জন্য আয়োজকদের নির্ধারিত ওয়েবসাইট khsaan.org-এ অনলাইনে আবেদন করা যাচ্ছে। বিদ্যালয়ের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে বর্তমানে শতবর্ষ পূর্তি উৎসবের জন্য পৃথক নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু রয়েছে।

শতবর্ষ পেরিয়ে যে প্রতিষ্ঠান আজও এলাকার পরিচয়ের অংশ
চলনবিলের দক্ষিণ প্রান্তের কলম গ্রামে গড়ে ওঠা এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি নাটোরের শিক্ষা ও সামাজিক ইতিহাসের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। বিদ্যালয়ের নিজস্ব ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক উচ্চবিদ্যালয় পর্যায়ের যাত্রা ১৯২৪ সালের ২ জানুয়ারি এবং পরে এটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটের স্বীকৃতি লাভ করে।
তবে বিদ্যালয়ের ইতিহাস নিয়ে প্রচলিত বর্ণনায় আরও পুরোনো একটি অধ্যায়ের উল্লেখ আছে। আয়োজকদের দেওয়া তথ্য ও বিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক বিবরণে বলা হয়েছে, ১৯১৪ সালে বিদ্যালয়টি প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করে এবং ১৯২৪ সালে উচ্চবিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। ফলে শতবর্ষ উদযাপনের হিসাবটি মূলত বিদ্যালয়ের উচ্চবিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠার শতবর্ষকে কেন্দ্র করে।
এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্থানীয় জমিদার হেরম্ভনাথ ভট্টাচার্যের নাম। আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতায় কলমে শিক্ষার বিস্তারের ভিত্তি তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ও বিভিন্ন ব্যক্তির সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিদ্যালয়টি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি, ঐতিহ্যের আরেক মাইলফলক
বিদ্যালয়ের ইতিহাসে ১৯২৪ সালের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটের অনুমোদন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বিদ্যালয়ের নিজস্ব ইতিহাসে হেরম্ভনাথ ভট্টাচার্যের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও তৎকালীন শিক্ষাবিদদের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সে সময় বিদ্যালয়টি শুধু স্থানীয় শিক্ষার্থীদের জন্য একটি প্রতিষ্ঠান ছিল না; দূরদূরান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীদের থাকার ব্যবস্থাও করা হতো। বিদ্যালয়ের ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে, তৎকালীন সময়ে জায়গীর রাখার প্রচলন না থাকায় জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে বহু শিক্ষার্থী প্রতিষ্ঠাতার বাড়িতে অবস্থান করতেন এবং তাঁদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠান-সংশ্লিষ্টরা সহযোগিতা করতেন।
মেধা তৈরির দীর্ঘ ইতিহাস
কলম উচ্চ বিদ্যালয়ের ইতিহাসে শিক্ষার ফলাফলেরও উল্লেখযোগ্য অধ্যায় রয়েছে। বিদ্যালয়ের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ১৯৩৭ সালের ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় শতভাগ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হওয়ার পাশাপাশি শতভাগই প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছিল। পরবর্তী দশকগুলোতেও বিদ্যালয়টি ভালো ফলাফলের ধারাবাহিকতা ধরে রাখে।
বিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছে এবং রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের সম্মিলিত মেধাতালিকাতেও বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা স্থান পেয়েছেন। এর মধ্যে ১৯৭১ সালে মো. হায়দার রশিদ ১৭তম, ১৯৭৪ সালে মো. জশমত উল্যাহ ষষ্ঠ এবং ১৯৯৫ সালে মো. নাজমুল হোসাইন ১৭তম স্থান অর্জন করেন বলে বিদ্যালয়ের ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।
১৯৮৬ সালে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ২০০-তে পৌঁছায় বলেও প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে শিক্ষা বিস্তারের পাশাপাশি কলম গ্রামের সামাজিক পরিচয়ের সঙ্গেও বিদ্যালয়টি গভীরভাবে যুক্ত হয়ে ওঠে।
শতবর্ষ ঘিরে পুরোনো শিক্ষার্থীদের মিলনমেলার প্রস্তুতি
শতবর্ষ উদযাপনকে ঘিরে বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ তৈরি হয়েছে পুনর্মিলন ও স্মৃতিচারণকে কেন্দ্র করে। বিভিন্ন প্রজন্মে যারা এই বিদ্যালয়ে পড়েছেন, তাঁদের অনেকেই বর্তমানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এবং বিদেশে অবস্থান করছেন। শতবর্ষের আয়োজন তাঁদের আবারও পুরোনো বিদ্যালয়, শিক্ষক ও সহপাঠীদের কাছে ফিরিয়ে আনার একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আয়োজকদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে Alumni Committee-সংক্রান্ত তথ্যও রয়েছে। বর্তমানে সেখানে ৩৭ সদস্যের একটি অ্যালামনাই কমিটির তথ্য প্রদর্শিত হচ্ছে।
অনুষ্ঠানের সম্ভাব্য তারিখ ২৬ ডিসেম্বর
বিদ্যালয়ের অফিসিয়াল শতবর্ষ পূর্তি পোর্টালে বর্তমানে অনুষ্ঠানের সম্ভাব্য তারিখ ২৬ ডিসেম্বর ২০২৬ হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। একইসঙ্গে উৎসবের নিবন্ধন কার্যক্রমও অনলাইনে চালু রাখা হয়েছে।
অর্থাৎ, ডিসেম্বরের মূল আয়োজনকে সামনে রেখে এখন চলছে অংশগ্রহণকারী সাবেক শিক্ষার্থী ও পরিবারের সদস্যদের নিবন্ধন, তথ্য সংগ্রহ এবং অ্যালামনাই ব্যবস্থাপনার প্রস্তুতি।
নিবন্ধন চলছে, শেষ সময় ১৫ আগস্ট
শতবর্ষ পূর্তি উৎসবে অংশ নিতে আগ্রহীদের জন্য নিবন্ধন চালু রয়েছে khsaan.org-এ। আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৫ আগস্ট ২০২৬ নিবন্ধনের শেষ তারিখ।
বিদ্যালয়ের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ফি কাঠামো অনুযায়ী, আলামনাই সদস্যদের জন্য নিবন্ধন ফি ২০০ টাকা; স্বামী বা স্ত্রীর জন্য ৫০০ টাকা এবং সন্তানের জন্যও নির্ধারিত ফি রয়েছে। ছয় বছরের কম বয়সী শিশুর জন্য ফি না থাকার তথ্যও ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়েছে।
আয়োজকদের ওয়েবসাইটে শতবর্ষ অনুষ্ঠানের যোগাযোগের জন্য উত্তম কুমার সাহা-র নাম ও ফোন নম্বরও দেওয়া হয়েছে।
শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, একশ বছরের স্মৃতির পুনরাবৃত্তি
শতবর্ষ উদযাপনকে ঘিরে আয়োজকদের মূল লক্ষ্য শুধু একটি আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান আয়োজন নয়; বরং বিদ্যালয়ের দীর্ঘ ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা এবং সাবেক শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের মধ্যে সম্পর্ককে আরও সক্রিয় করা।
একটি শতবর্ষী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এমন আয়োজনের গুরুত্ব শুধু আবেগের জায়গায় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি এলাকার সামাজিক পরিবর্তন, শিক্ষার বিস্তার, প্রজন্মের জীবনযাত্রা এবং স্থানীয় নেতৃত্ব তৈরির ইতিহাস।
কলম উচ্চ বিদ্যালয়ের ইতিহাসেও সেই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা স্পষ্ট। একসময় যেখানে কয়েকজন শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হতো, সেখানে এখন বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিকসহ একাধিক শাখায় শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। বিদ্যালয়ের সরকারি ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, এটি বর্তমানে একটি সহশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনাকারী মাধ্যমিক প্রতিষ্ঠান এবং এর EIIN 124255।
বর্তমান প্রজন্মের কাছে শতবর্ষের বার্তা
শতবর্ষ উদযাপনের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হয়তো এখানেই—একটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে টিকিয়ে রেখেছে, তার হিসাব নেওয়া।
কলম উচ্চ বিদ্যালয়ের শতবর্ষ তাই শুধু অতীতের গৌরব স্মরণের উপলক্ষ নয়; আগামী দিনের শিক্ষাব্যবস্থা, প্রযুক্তি, অবকাঠামো এবং শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে আরও কার্যকর করার নতুন অঙ্গীকারেরও সুযোগ।
এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের পথ পেরিয়ে কলম উচ্চ বিদ্যালয় আজও দাঁড়িয়ে আছে। আর শতবর্ষ পূর্তির প্রস্তুতি সেই দীর্ঘ যাত্রাকে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে—একটি বিদ্যালয় কেবল একটি ভবন নয়; এটি কয়েক প্রজন্মের স্মৃতি, একটি অঞ্চলের শিক্ষার ইতিহাস এবং অসংখ্য মানুষের জীবনের অংশ।
নিবন্ধনের জরুরি তথ্য
অনুষ্ঠান: কলম উচ্চ বিদ্যালয় শতবর্ষ পূর্তি উৎসব
সম্ভাব্য অনুষ্ঠান: ২৬ ডিসেম্বর ২০২৬
নিবন্ধনের শেষ তারিখ: ১৫ আগস্ট ২০২৬
নিবন্ধন: khsaan.org
বিদ্যালয়: কলম উচ্চ বিদ্যালয়, কলম, সিংড়া, নাটোর
EIIN: 124255
তথ্যসূত্র: কলম উচ্চ বিদ্যালয়ের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ও শতবর্ষ পূর্তি নিবন্ধন পোর্টাল; আয়োজকদের দেওয়া তথ্য।




