মাত্র দুই দিনের ব্যবহারের পর RTX 5090 GPU পুড়ে যাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন এক ক্রেতা। বিক্রেতা হিসেবে Star Tech কোনো রিপ্লেসমেন্ট বা স্পষ্ট সমাধান না দেওয়ায় বিষয়টি ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে বিক্রয়োত্তর সেবা, ওয়ারেন্টি নীতি এবং প্রিমিয়াম হার্ডওয়্যার বিক্রির দায়বদ্ধতা নিয়ে।
বাংলাদেশের প্রযুক্তি বাজারে উচ্চমূল্যের কম্পিউটার হার্ডওয়্যার কেনা গ্রাহকদের জন্য বিক্রয়োত্তর সেবার মান কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা নতুন করে আলোচনায় এসেছে Star Tech-এ কেনা একটি RTX 5090 GPU ঘিরে ওঠা অভিযোগে। এক ক্রেতা দাবি করেছেন, প্রায় ৮ লাখ টাকার একটি কাস্টম বিল্ডে ব্যবহৃত PNY GeForce RTX 5090 32GB GPU মাত্র দুই দিনের মাথায় পুড়ে যায়, কিন্তু বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো ওয়ারেন্টি বা রিপ্লেসমেন্ট সমাধান পাননি।
অভিযোগকারী জানিয়েছেন, ১২ জুলাই ২০২৬ তারিখে Star Tech থেকে কেনা বিল্ডটি প্রতিষ্ঠানটির সহায়তায় অ্যাসেম্বল করা হয়। বিল্ডে ছিল MSI MEG Ai1300P 1300W Platinum PSU, AMD Ryzen 9 9950X CPU এবং 64GB DDR5 RAM। তাঁর দাবি, প্রথমবার চালুর পর প্রায় ছয় ঘণ্টা স্বাভাবিক ব্যবহার হয়, তবে পরদিন সাধারণ ব্রাউজিংয়ের সময় হঠাৎ কম্পিউটার বন্ধ হয়ে যায়। পুনরায় চালু করতে গেলে GPU-এর পাওয়ার কেবলের সংযোগস্থল থেকে ধোঁয়া ও আগুনের ফুলকি দেখা যায়। এরপর তিনি পুরো ইউনিটটি Star Tech-এ নিয়ে যান।
ব্যবহারকারীর অভিযোগ: “কোনো ওভারক্লকিং ছিল না”
ক্রেতার বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো ধরনের ওভারক্লকিং, হার্ডওয়্যার পরিবর্তন বা অস্বাভাবিক ব্যবহার করা হয়নি। তিনি দাবি করেছেন, পিসিটি কেনার সময় Star Tech-এর সামনে প্রায় তিন ঘণ্টা টেস্ট করা হয়েছিল এবং তখন কোনো সমস্যা ধরা পড়েনি। তাঁর আরও দাবি, ঘটনার সময় শুধু সাধারণ ব্রাউজিং চলছিল।
অভিযোগে বলা হয়েছে, Star Tech-এর পক্ষ থেকে প্রথমে সম্ভাব্য আর্থিং সমস্যা, ওভারভোল্টেজ বা ওভারক্লকিংয়ের কথা বলা হয়। তবে ক্রেতার যুক্তি, যেহেতু পুরো বিল্ডটি Star Tech থেকেই নেওয়া এবং তারাই অ্যাসেম্বল করেছে, তাই দায়বদ্ধতার প্রশ্নে বিক্রেতার ভূমিকাই মুখ্য।
ওয়ারেন্টি নিয়ে মতবিরোধ
সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে ওয়ারেন্টি নীতি নিয়ে। ক্রেতার অভিযোগ, GPU পুড়ে গেলে Star Tech সেটিকে ওয়ারেন্টির আওতার বাইরে বলেছে এবং সরাসরি সাপ্লায়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছে। কিন্তু ক্রেতার দাবি, কেনার সময় প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছিল তারা সংশ্লিষ্ট ব্র্যান্ডের সরাসরি সরবরাহ চ্যানেল থেকে পণ্য আনে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, Banani শাখার সেলস ম্যানেজারের সঙ্গে প্রায় চার ঘণ্টা আলোচনা করেও সমাধান মেলেনি। পরে উচ্চপর্যায়ে ই-মেইল করলেও দ্রুত একটি টেমপ্লেটধর্মী উত্তর পাওয়া যায় বলে দাবি করেছেন ক্রেতা।
Star Tech-এর অভ্যন্তরীণ নীতি বা সংশ্লিষ্ট পক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এই প্রতিবেদনে স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
“Burn damage” বনাম “manufacturing defect”
এই ঘটনায় প্রযুক্তিগতভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—পুড়ে যাওয়া GPU-টি কি সত্যিই ব্যবহারজনিত ক্ষতি, নাকি তাতে কোনো উৎপাদনগত ত্রুটি ছিল?
ক্রেতার দাবি, GPU ছাড়া বাকি সিস্টেম ঠিকভাবে কাজ করছে এবং পাওয়ার সাপ্লাই বা কেবলে কোনো পোড়ার চিহ্ন নেই। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি সম্ভবত GPU-র ভেতরের কোনো defect বা কনেক্টর-সংক্রান্ত ব্যর্থতার ফল।
অন্যদিকে বিক্রেতার অবস্থান, burn damage সাধারণত ওয়ারেন্টি কাভার করে না। তবে এই ধরনের অভিযোগে সাধারণত স্বাধীন কারিগরি পরীক্ষা, লগ বিশ্লেষণ, কনেক্টর-ইনস্পেকশন এবং সাপ্লাই চেইন যাচাই প্রয়োজন হয়। সেসব তথ্য প্রকাশিত না হওয়ায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
নতুন জেনারেশনের GPU ঘিরে ঝুঁকি
RTX 5090-এর মতো অত্যাধুনিক GPU-গুলো উচ্চ ক্ষমতার সঙ্গে উচ্চ তাপ, উচ্চ বিদ্যুৎচাহিদা এবং জটিল পাওয়ার ডেলিভারি সিস্টেমের ওপর নির্ভরশীল। এই ধরনের কার্ডে কেবল GPU নয়, PSU, কেবল, কানেক্টর, কেস এয়ারফ্লো এবং ইনস্টলেশনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিশেষ করে PCIe 5.0 ও নতুন 12V-2×6 বা অনুরূপ পাওয়ার সংযোগ ব্যবস্থায় সঠিক বসানো, পর্যাপ্ত কেবল সাপোর্ট এবং তাপ নিয়ন্ত্রণ না থাকলে ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। তবে অভিযোগকারী দাবি করেছেন, ব্যবহৃত PSU ছিল MSI MEG Ai1300P 1300W Platinum, যা ক্ষমতার দিক থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি ইউনিট।
বিক্রেতার দায় কতটা?
উচ্চমূল্যের হার্ডওয়্যার বিক্রিতে শুধু পণ্য বিক্রি নয়, পরবর্তী সেবাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্রাহকের অভিযোগ যদি সঠিক হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠছে—দুই দিনের মধ্যেই নষ্ট হওয়া একটি প্রিমিয়াম GPU-র ক্ষেত্রে বিক্রেতা কতটা তদন্ত করবে, আর কতটা দায় নেবে?
তবে আইনি ও বাণিজ্যিক দিক থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সাধারণত নির্ভর করে—
- পণ্যের প্রকৃত ক্ষতির ধরন
- ইনস্টলেশনের মান
- ব্যবহারজনিত ত্রুটি ছিল কি না
- ওয়ারেন্টি কার্ডে কী শর্ত লেখা ছিল
- ম্যানুফ্যাকচারার নীতি কী বলছে
এই তথ্যগুলো ছাড়া এখনই দায় নির্ধারণ করা যাচ্ছে না।
গ্রাহকের সামনে সম্ভাব্য করণীয়
এ ধরনের পরিস্থিতিতে সাধারণত গ্রাহকরা কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে পারেন। প্রথমত, লিখিত অভিযোগ ও প্রতিক্রিয়া সংরক্ষণ করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, GPU, PSU, কেবল এবং সিস্টেমের পুরো ঘটনার ছবি ও ভিডিও নথিবদ্ধ করা উচিত। তৃতীয়ত, স্বাধীন সার্ভিস সেন্টার বা থার্ড-পার্টি কারিগরি মতামত নেওয়া যেতে পারে।
এছাড়া, কেনার ইনভয়েস, ওয়ারেন্টি শর্ত, দোকানের ই-মেইল এবং চ্যাট ইতিহাস সব সংরক্ষণ করা দরকার। যদি সমাধান না মেলে, তাহলে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ সংস্থা বা সংশ্লিষ্ট আইনগত পথে যাওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
প্রযুক্তি বাজারে বড় প্রশ্ন
বাংলাদেশের প্রিমিয়াম হার্ডওয়্যার বাজারে ক্রেতারা এখন শুধু পণ্যের পারফরম্যান্স নয়, বিক্রয়োত্তর সেবার মানও মূল্যায়ন করছেন। RTX 5090 ঘিরে এই অভিযোগ সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে।
একটি ৮ লাখ টাকার বিল্ডে যদি দুই দিনের ব্যবহারে GPU নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই গ্রাহকের প্রত্যাশা থাকে দ্রুত তদন্ত ও সমাধান। সেই সমাধান না মিললে শুধু একটি বিক্রি নয়, পুরো ব্র্যান্ড-আস্থার প্রশ্ন তৈরি হয়।
তথ্যসূত্র
ক্রেতার প্রকাশিত অভিযোগ, সরবরাহকৃত ছবি ও বার্তা, এবং সংশ্লিষ্ট হার্ডওয়্যার পণ্যের সাধারণ প্রযুক্তিগত তথ্য।




