মসজিদের মাইকে ঘোষণা—‘যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে নদীপাড়ে চলে আসেন’; মানুষের হাতে আপাতত ঠেকল বাঁধ ধস, স্থায়ী সমাধান এখনো অনিশ্চিত
TODAY TV BD | কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলায় ব্রহ্মপুত্র নদের ভয়াল স্রোত আবারও হুমকির মুখে ফেলেছে শত শত পরিবারকে। নদীর ডান তীর রক্ষা বাঁধে আকস্মিক ধস শুরু হতেই এক প্রবীণ বাসিন্দা ছুটে গিয়ে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেন—“যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে নদীপাড়ে চলে আসেন, বাঁধ ভাঙছে।” সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই কয়েক শ মানুষ জিও ব্যাগে বালু ভরে ভাঙন ঠেকানোর কাজে নেমে পড়েন। স্থানীয়দের এই তাৎক্ষণিক উদ্যোগে আপাতত বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো গেলেও পুরো এলাকা এখনো চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
সোমবার (২০ জুলাই) সন্ধ্যায় চিলমারী উপজেলার রানীগঞ্জ ইউনিয়নের সড়কটারী এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদের ডান তীর রক্ষা বাঁধের প্রায় ৩০ মিটার ব্লক পিচিং ধসে নদীগর্ভে বিলীন হতে শুরু করে। প্রবল স্রোত ও নদীর ঘূর্ণির কারণে মুহূর্তেই পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক মিনিটের মধ্যেই একের পর এক কংক্রিট ব্লক নদীতে তলিয়ে যেতে থাকে।
মাইকের ঘোষণায় ছুটে আসেন শত শত মানুষ
৭০ বছর বয়সী ফরজ উদ্দিন তখন নদীর পাড়েই ছিলেন। নিজের চোখের সামনে বাঁধের অংশ ধসে যেতে দেখে তিনি দ্রুত পাশের সড়কটারী জামে মসজিদে গিয়ে মাইকে ঘোষণা দেন, “যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে নদীপাড়ে চলে আসেন।”
স্থানীয়দের দাবি, ঘোষণার আধা ঘণ্টার মধ্যেই প্রায় পাঁচ শতাধিক মানুষ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। কেউ জিও ব্যাগ টানেন, কেউ বালু ভরেন, আবার কেউ নদীতে নেমে ব্যাগ ফেলতে সহায়তা করেন। রাতভর চলে ভাঙন ঠেকানোর এই স্বেচ্ছাশ্রম।
ফরজ উদ্দিন বলেন, নদীর ঘূর্ণিতে একের পর এক ব্লক তলিয়ে যাচ্ছিল। তখন ঘটনাস্থলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাউকে দেখা যায়নি। তাই মানুষকে ডেকে এনে নিজেরাই ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করেছেন। তাঁর মতে, স্থানীয়রা এগিয়ে না এলে ওই রাতেই বাঁধের আরও বড় অংশ ভেঙে যেতে পারত।
এক মাসে চারবার ধস, আতঙ্কে কয়েক হাজার পরিবার
এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, চলতি জুলাই মাসেই একই বাঁধের বিভিন্ন অংশে অন্তত চারবার ধসের ঘটনা ঘটেছে। গত সপ্তাহেও প্রায় ৬০ মিটার অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়। বর্তমানে কাঁচকোল থেকে সড়কটারী পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার এলাকায় একাধিক ঝুঁকিপূর্ণ স্থান তৈরি হয়েছে।
এলাকাবাসীর আশঙ্কা, বাঁধ ভেঙে গেলে কাঁচকোল, চিলমারী ও আশপাশের বিস্তীর্ণ জনপদে ভয়াবহ নদীভাঙন ও বন্যা দেখা দিতে পারে। ঝুঁকিতে রয়েছে হাজার হাজার পরিবার, বিস্তীর্ণ কৃষিজমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, গ্রামীণ সড়ক এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।
‘জিও ব্যাগে হবে না, চাই স্থায়ী টি-বাঁধ’
স্থানীয়দের দাবি, প্রতি বর্ষা মৌসুমে জিও ব্যাগ ফেলে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হলেও স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।
ফরজ উদ্দিন বলেন, “১০-২০ হাজার জিও ব্যাগ ফেলে লাভ হবে না। নদীর গতিপথ নিয়ন্ত্রণে স্থায়ী টি-বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। না হলে প্রতি বছর একই দুর্ভোগ চলতেই থাকবে।”
একই দাবি করেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও কৃষকেরাও। তাঁদের মতে, জরুরি মেরামতের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি নদী ব্যবস্থাপনা ছাড়া এ সংকট কাটবে না।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের জরুরি অভিযান
মঙ্গলবার সকাল থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ঘটনাস্থলে জিও ব্যাগ ডাম্পিং শুরু করেছে। একই সঙ্গে প্রকৌশলীরা নদীর গভীরতা, তলদেশের গঠন এবং স্রোতের গতিপ্রকৃতি পরিমাপ করছেন।
ভাঙন প্রতিরোধকাজে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি সর্দার মজিবুর রহমান জানান, ১ জুলাই প্রথম ধসের পর থেকে চার দফায় ২৪ হাজার জিও ব্যাগ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে নদীর তীব্র স্রোতের কারণে ফেলা ব্যাগ অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকরভাবে অবস্থান ধরে রাখতে পারছে না।
তিনি বলেন, পুরো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা রক্ষায় অন্তত এক লাখ জিও ব্যাগ এবং তিনটি টি-বাঁধ নির্মাণ প্রয়োজন। তাহলেই নদীর মূল স্রোত তীর থেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
‘ভিটেমাটি হারানোর ভয় কাটছে না’
৭৫ বছর বয়সী ফেলানী বেওয়া বলেন, বিকেলের দিকে হঠাৎ নদীর পানি ফুলে ওঠে। এরপরই ব্লকগুলো একের পর এক নদীতে পড়ে যেতে থাকে।
তিনি বলেন, “এই বয়সে যদি আবার ভিটেমাটি হারাই, তাহলে কোথায় যাব? সরকারের কাছে একটাই অনুরোধ—আমাদের নদীভাঙন থেকে বাঁচান।”
স্থানীয়দের ভাষ্য, বর্ষা এলেই তাঁদের দিন কাটে আতঙ্কে। রাতের ঘুম ভেঙে যায় নদীর শব্দ শুনে। অনেকেই ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় মালামাল গুছিয়ে রাখছেন, যাতে পরিস্থিতি খারাপ হলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যেতে পারেন।
৪৪৮ কোটি টাকার প্রকল্প, তবুও মিলছে না স্থায়ী সুরক্ষা
পাউবো সূত্র জানায়, ২০১৬ সালে প্রায় ৪৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের ডান তীর রক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। কিন্তু নির্মাণের মাত্র দুই বছর পর থেকেই বিভিন্ন স্থানে ধস দেখা দিতে শুরু করে।
এরপর একাধিকবার জরুরি সংস্কার, ব্লক প্রতিস্থাপন ও জিও ব্যাগ ফেলার কাজ হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। ফলে প্রায় প্রতি বর্ষাতেই একই ধরনের সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রহ্মপুত্র একটি গতিশীল নদী। নদীর তলদেশে চর জেগে ওঠা, মূল স্রোতের দিক পরিবর্তন, অতিবৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা পানির চাপ—সব মিলিয়ে নদীর আচরণ দ্রুত বদলে যায়। সে কারণে শুধু জরুরি মেরামত নয়, নদীর প্রবাহ বিশ্লেষণ করে দীর্ঘমেয়াদি প্রকৌশলভিত্তিক সমাধান প্রয়োজন।
পাউবোর ব্যাখ্যা
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, ব্রহ্মপুত্র নদের পূর্ব তীরে নতুন চর জেগে ওঠায় মূল স্রোত এখন পশ্চিম তীর ঘেঁষে প্রবাহিত হচ্ছে। এর ফলে বাঁধের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে এবং চলতি মাসে একাধিক স্থানে ধস দেখা দিয়েছে।
তিনি জানান, ইতোমধ্যে ২৪ হাজার জিও ব্যাগ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ব্যাগ নদীতে ফেলা হয়েছে এবং কাজ অব্যাহত রয়েছে।
স্থায়ী সমাধানের বিষয়ে তিনি বলেন, পুরো বাঁধ পুনর্বাসনের জন্য আগে একটি প্রকল্প পাঠানো হলেও সেটি অনুমোদন পায়নি। নতুন করে প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন কাজ শুরু করা হবে।
বিশ্লেষণ: প্রশ্নের মুখে নদী ব্যবস্থাপনা
চিলমারীর এই ঘটনা আবারও সামনে নিয়ে এসেছে দেশের নদী ব্যবস্থাপনা ও তীররক্ষা প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন। শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বাঁধ কয়েক বছরের ব্যবধানে বারবার ধসে পড়লে শুধু জরুরি মেরামত নয়, প্রকল্পের নকশা, বাস্তবায়নের মান, নদীর পরিবর্তিত গতিপথ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা—সবকিছুই নতুন করে মূল্যায়নের দাবি উঠছে।
স্থানীয়দের মতে, প্রতি বছর বর্ষা এলে একই সংকট, একই জিও ব্যাগ, একই প্রতিশ্রুতি—কিন্তু স্থায়ী সমাধান এখনো অধরাই রয়ে গেছে।
নিউজ সোর্স: প্রথম আলো, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), স্থানীয় প্রশাসন, স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য



