২০০৬ থেকে ২০২৬—প্রতি বিশ্বকাপেই আলাদা এক গল্প, আলাদা এক মেসি; আর সব গল্প মিলিয়ে একটাই নাম: আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ-চরিত্র
স্পোর্টস ডেস্ক | TODAY SPORTS
লিওনেল মেসির বিশ্বকাপ যাত্রা কোনো সোজা রেখা নয়; এটি ছয়টি আলাদা অধ্যায়, যেখানে প্রতিটি আসরেই তাঁর ভূমিকা বদলেছে—কিশোর প্রতিভা, মাঝপথের দার্শনিক, হতাশ অধিনায়ক, বিদ্রোহ-ফেরত নায়ক, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, আর এখন ৩৯ বছর বয়সে শেষবারের মতো ট্রফির দুয়ারে দাঁড়িয়ে থাকা এক কিংবদন্তি। ফিফা-সমর্থিত ও স্বীকৃত রেকর্ড অনুযায়ী, মেসি এখন প্রথম পুরুষ খেলোয়াড় যিনি ছয়টি বিশ্বকাপে খেলেছেন, বিশ্বকাপে সর্বাধিক ২৬টি ম্যাচ খেলেছেন এবং বিশ্বকাপে ২১ গোল ও ১২ অ্যাসিস্ট মিলিয়ে ৩৩টি গোল-অবদান গড়েছেন। ২০২৬ আসরে তিনি আর্জেন্টিনাকে স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালে তুলেছেন, যেখানে তাঁর নামের পাশে এখন ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট।
২০০৬: ১৮ বছরের কিশোর, যাঁর নামের সঙ্গে প্রথমবার লেখা হলো বিশ্বকাপ
জার্মানির ২০০৬ বিশ্বকাপ ছিল মেসির প্রথম বড় আন্তর্জাতিক মঞ্চ। তখন তিনি আর্জেন্টিনার সিনিয়র দলে নবাগত, আর ১৬ জুন সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে বদলি নেমে হয়ে যান বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে মাঠে নামা সবচেয়ে কম বয়সী খেলোয়াড়। একই ম্যাচে তাঁর করা গোল তাঁকে আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপে গোল করা সবচেয়ে কম বয়সী ফুটবলারও বানায়। কিন্তু গল্পটি সেখানেই থামেনি; জার্মানির বিপক্ষে কোয়ার্টার-ফাইনালে তাঁকে বেঞ্চেই রাখা হয়, আর আর্জেন্টিনা পেনাল্টিতে বিদায় নেয়। সেই সিদ্ধান্ত পরে জোসে পেকারম্যানকে তীব্র সমালোচনার মুখে ফেলে।
এই আসর মেসিকে বিশ্বমঞ্চে পরিচয় করিয়ে দেয়, কিন্তু তাঁকে পুরোপুরি মুক্ত করেনি। ১৮ বছর বয়সে তাঁর প্রতিভা স্পষ্ট ছিল, তবে আর্জেন্টিনা তখনও তাঁকে কেন্দ্র করে দল গড়েনি। ২০০৬-এর মেসি ছিলেন ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি—যে প্রতিশ্রুতির আভাস দেখেই বিশ্ব বুঝে গিয়েছিল, সামনে এক বিরাট অধ্যায় আসছে।
২০১০: ম্যারাডোনার অধীনে এক ট্যাকটিক্যাল পরীক্ষা, কিন্তু গোলশূন্য হতাশা
দক্ষিণ আফ্রিকার ২০১০ বিশ্বকাপে মেসি প্রথমবার আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সির দায়ও অনুভব করেন। ডিয়েগো ম্যারাডোনার অধীনে আর্জেন্টিনা তাঁকে নিয়ে নানা জায়গায় পরীক্ষা চালায়, এমনকি নিজস্ব “এনগাঞ্চে” ভূমিকায় সাজানোর চেষ্টাও হয়। মেসি টুর্নামেন্টে একটি গোলও করতে পারেননি, যদিও তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ৪–১ জয়ে আক্রমণের চারটি গোলেই জড়িত ছিলেন এবং FIFA তাঁকে টুর্নামেন্টের দশ সেরা খেলোয়াড়ের মধ্যে রাখে। কিন্তু শেষ আটে জার্মানির কাছে আর্জেন্টিনার ৪–০ হারে এই আসর তাঁর জন্য হয়ে যায় “নিয়ন্ত্রণহীন প্রতিভা”র প্রতীক।
এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি ছিল মেসির জন্যও, আর্জেন্টিনার জন্যও—কেবল প্রতিভা যথেষ্ট নয়; সিস্টেমও দরকার। বার্সেলোনার মতো নিখুঁত পরিবেশের বাইরে জাতীয় দলে তাঁর উজ্জ্বলতা তখনও পুরোপুরি ফুটে ওঠেনি। তাই ২০১০ বিশ্বকাপ আজও মনে করা হয় সেই আসর, যেখানে মেসি মহাতারকা হয়ে উঠলেও, জাতীয় দলের ভার তাঁর কাঁধে পুরোপুরি নেমে আসেনি।
২০১৪: অধিনায়ক মেসি, গোল্ডেন বল মেসি, কিন্তু ফাইনালের বিষাদের রাত
২০১১ সালে আলেহান্দ্রো সাবেলা মেসিকে অধিনায়ক করেন, আর ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে তিনি আর্জেন্টিনাকে টেনে নেন ফাইনালে। গ্রুপ পর্বে তাঁর খেলায় ধার ছিল, তিনি প্রথম চার ম্যাচেই ম্যাচসেরা হন এবং ইরানের বিপক্ষে ইনজুরি-টাইমে যে গোল করেন, তা আর্জেন্টিনাকে নকআউটে পৌঁছে দেয়। এরপর নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা ফাইনালে ওঠে, কিন্তু মারাকানায় জার্মানির বিপক্ষে ১–০ হারে শিরোপা অধরা থেকে যায়।
তবু ২০১৪ ছিল মেসির ব্যক্তিগত স্বীকৃতির আসর। FIFA তাঁকে গোল্ডেন বল দেয়, অর্থাৎ টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি। তবে এই পুরস্কার তখনও বিতর্কমুক্ত ছিল না, কারণ মেসি নকআউটের বড় ম্যাচগুলোতে গোল করতে পারেননি। তবু সেটি প্রমাণ করে—বিশ্বকাপের বড় মঞ্চে তিনি কেবল গোলদাতা নন, পুরো আসরের ভার নিয়েও সেরা হতে পারেন।
২০১৮: অবসরের দ্বার থেকে ফিরে এসে, কিন্তু রাশিয়ায় ভাঙনের রাত
২০১৬ সালের কোপা আমেরিকা ফাইনাল হারের পর মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা বলেছিলেন, কিন্তু আর্জেন্টিনার জনচাপ ও নিজের টান তাঁকে ফেরায়। ২০১৮ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ইকুয়েডরের বিপক্ষে তাঁর হ্যাটট্রিক আর্জেন্টিনাকে রাশিয়ার টিকিট দেয়, আর সেটিই ছিল এক দলের জীবনে শেষ মুহূর্তের বাঁচা-টিকে থাকার কাহিনি। কিন্তু রাশিয়ায় সেই আশা আর ছন্দ টেকেনি। ক্রোয়েশিয়ার কাছে ৩–০ হার আর্জেন্টিনাকে ধাক্কা দেয়, নাইজেরিয়ার বিপক্ষে মেসির গোল বাঁচায়, কিন্তু শেষ ষোলোয় ফ্রান্সের বিপক্ষে দল বিদায় নেয়।
২০১৮ ছিল মেসির জন্য এক ধরনের থ্রেশহোল্ড টুর্নামেন্ট—যেখানে তিনি আবারও প্রমাণ করেন যে আর্জেন্টিনাকে ফুটবল বিশ্বকাপ থেকে সরিয়ে দেওয়া যায় না, কিন্তু দলগত ভারসাম্য না থাকলে একা কোনো সুপারস্টারও টিকতে পারেন না। এই আসর শেষে তাঁকে নিয়ে অবসর-গুঞ্জন আবারও ফিরে আসে, কিন্তু সে গুঞ্জনই পরবর্তী পুনর্জাগরণের ভূমিকা তৈরি করে।
২০২২: কাতারে মুক্তির পূর্ণতা—একটি ক্যারিয়ারের চূড়ান্ত উত্তর
কাতার ২০২২ ছিল মেসির মুক্তির বিশ্বকাপ। সৌদি আরবের কাছে শুরুর ধাক্কা খেয়েও আর্জেন্টিনা ঘুরে দাঁড়ায়, আর মেসি একে একে মেক্সিকো, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, ক্রোয়েশিয়া ও শেষে ফ্রান্সের বিপক্ষে দলকে এগিয়ে নেন। ফাইনালে তিনি গোল করেন, অতিরিক্ত সময়ে আবার গোল করেন, আর শেষ পর্যন্ত পেনাল্টিতেও দায়িত্ব নেন। আর্জেন্টিনা ৩–৩ সমতায় ম্যাচ শেষ করে পেনাল্টিতে ৪–২ ব্যবধানে বিশ্বকাপ জেতে।
এই টুর্নামেন্টে মেসির ৭ গোল, ৩ অ্যাসিস্ট, ৫ বার ম্যাচসেরার পুরস্কার, দ্বিতীয় গোল্ডেন বল—সব মিলিয়ে সেটি তাঁর ক্যারিয়ারের চূড়ান্ত পরিণতি। ওই ফাইনালে তাঁর ২৬তম বিশ্বকাপ ম্যাচ বিশ্বরেকর্ড গড়ে, আর ১৩ গোল ও ৮ অ্যাসিস্ট মিলিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোল-অবদানকারী খেলোয়াড়। কাতার তাই শুধু ট্রফি জয়ের গল্প নয়; এটি ছিল “মেসিকে কি সর্বকালের সেরা বলা যায়?”—এই প্রশ্নেরও সবচেয়ে জোরালো উত্তর।
২০২৬: বিদায়ের আগে শেষ মহাযজ্ঞ, আরেকটি ফাইনালের দুয়ারে
২০২৬ বিশ্বকাপে মেসি এখন ৩৯ বছর বয়সে, এবং Reuters ও AP—দুই সংবাদমাধ্যমই তাঁকে “likely playing his final World Cup” হিসেবে বর্ণনা করেছে। ২৮ মে ২০২৬-এ আর্জেন্টিনার ২৬ সদস্যের স্কোয়াডে তাঁকে রাখা হয়, আর এখন তিনি আর্জেন্টিনাকে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে ২–১-এর নাটকীয় জয়ে তুলে এনে স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালে পৌঁছে দিয়েছেন। এই আসরে তাঁর নামের পাশে এখন ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট, আর বিশ্বকাপজুড়ে গোল-অবদান ৩৩—২১ গোল, ১২ অ্যাসিস্ট।
২০২৬-এর মেসি আর কেবল তরুণ প্রতিভা বা ট্রফিহীন সুপারস্টার নন; তিনি এখন অভিজ্ঞতার এক জীবন্ত ছায়া, যার প্রতিটি পাসে আর্জেন্টিনা বাঁচে, প্রতিটি সিদ্ধান্তে ম্যাচের ছন্দ বদলায়। Reuters বলেছে, তিনি শেষ চারটি নকআউট ম্যাচে প্রতিটি মিনিট খেলেছেন, আর AP জানিয়েছে, তাঁর দুটি অ্যাসিস্ট আর্জেন্টিনাকে আরেকটি ফাইনালে পৌঁছে দিয়েছে। এই বিশ্বকাপ তাই তাঁর বিদায়ের কাহিনি হতে পারে—অথবা হতে পারে, ফুটবলের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর বিদায়-উপাখ্যানের শেষ অধ্যায়।
TODAY SPORTS বিশ্লেষণ: ছেলেটি, অধিনায়ক, মুক্তিদাতা, আর এখন উত্তরাধিকার
মেসির বিশ্বকাপ যাত্রা দেখলে একটা কথা পরিষ্কার হয়—এই গল্প কখনোই শুধু গোলের ছিল না। ২০০৬-এ ছিল প্রতিভার দেখা, ২০১০-এ ছিল অপূর্ণতার ব্যথা, ২০১৪-এ ছিল সর্বোচ্চ মানের স্বীকৃতি, ২০১৮-এ ছিল ফিরে দাঁড়ানোর লড়াই, ২০২২-এ ছিল মুক্তি, আর ২০২৬-এ আছে বিদায়ের আগে শেষ উল্লাস। তার পরেও একটি পরিসংখ্যান সবকিছুর চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায়: তিনি একাই বিশ্বকাপের ইতিহাসে ২৬ ম্যাচ, ২১ গোল, ১২ অ্যাসিস্ট এবং ৩৩ গোল-অবদান রেখে খেলাটির ব্যাকরণই বদলে দিয়েছেন।
মেসির বিশ্বকাপ কাহিনি শেষ পর্যন্ত একটি দেশকে নিয়েও। আর্জেন্টিনা তাঁর সঙ্গে বদলেছে—একজন কিশোরের প্রতিভা থেকে দলের কাঁধে ভর দেওয়া অধিনায়ক, আর শেষে এমন এক নেতা, যিনি দলকে ফাইনালে তোলেন, রেকর্ড ভাঙেন, এবং প্রতিটি বিশ্বকাপকে নিজের গল্পে পরিণত করেন। ২০২৬-এ স্পেনের বিপক্ষে ফাইনাল এখন শুধু একটি ম্যাচ নয়; এটি মেসির ছয়-অধ্যায়ের বিশ্বকাপ মহাকাব্যের শেষ বাঁকও হতে পারে।



