Homeটুডে বাংলাফরিদপুরে একাকী জীবন শেষে কোয়েল চৌধুরীর মৃত্যু, স্থানীয়দের উদ্যোগে দাফন

ফরিদপুরে একাকী জীবন শেষে কোয়েল চৌধুরীর মৃত্যু, স্থানীয়দের উদ্যোগে দাফন

ফ্ল্যাট থেকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পর মৃত্যু; কানাডাপ্রবাসী বোন ও স্বজনরা না আসায় আলীপুর কবরস্থানে সমাহিত:

ফরিদপুর শহরের পূর্ব খাবাসপুর এলাকার একটি তিনতলা ভবনের ফ্ল্যাট থেকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা কোয়েল চৌধুরী (৫৪) হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা গেছেন। মৃত্যুর পর তাঁর কানাডাপ্রবাসী একমাত্র বোন ও অন্যান্য স্বজনদের খবর দেওয়া হলেও কেউই আসেননি। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় শহরের আলীপুর কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ জানায়, রোববার দুপুরে পূর্ব খাবাসপুরের চৌধুরী ভিলা নামের ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে কোয়েল চৌধুরীকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। পরে তাঁকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

ভাঙা দরজা, নীরব ঘর

প্রতিবেশীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভেতর থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে দরজা ভেঙে তাঁকে উদ্ধার করা হয়। পরে ৯৯৯ নম্বরে ফোন দিয়ে পুলিশকে জানানো হয়।

প্রতিবেশী আশিকুর রহমান খান বলেন, খাবার দিতে গিয়ে ভাড়াটিয়ারা দরজায় সাড়া না পেয়ে খবর দেন। এরপর স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দিলে দরজা ভেঙে কোয়েল চৌধুরীকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। তিনি বলেন, “তাঁর চোখ দিয়ে পানি ঝরার মতো দাগ দেখা যাচ্ছিল। আমরা প্রথমে ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে এবং পরে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই।”

পরিবার ছড়িয়ে গেছে, একা পড়ে যান কোয়েল

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০০০ সালের দিকে হাশমত আলী চৌধুরীআছিয়া খানম দম্পতি এই ভবনটি কিনে বসবাস শুরু করেন। তাঁরা দুজনেই সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন বলে স্থানীয়রা জানান। তাঁদের দুই ছেলে—কোয়েল চৌধুরী ও বাবু চৌধুরী—এবং এক মেয়ে ছিলেন।

স্থানীয়দের দাবি, বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর মেয়েটি কানাডায় চলে যান। এরপর দুই ভাই অনেকটাই একা হয়ে পড়েন। বড় ভাই বাবু চৌধুরী প্রায় দেড় বছর আগে মারা যান। এরপর কোয়েল চৌধুরী বিশাল ফ্ল্যাটে একাই থাকতেন।

ভাড়াটিয়ারা এবং আশপাশের মানুষই তাঁকে নিয়মিত খাবার দিতেন, খোঁজখবর রাখতেন। প্রতিবেশীরা জানান, তিনি এবং তাঁর বড় ভাই দুজনেই মানসিকভাবে কিছুটা দুর্বল ছিলেন, তবে চলাফেরা স্বাভাবিক ছিল এবং কারও সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতেন না। দুই ভাইকে স্থানীয়রা প্রায়ই একসঙ্গে দেখতেন।

স্বজনরা না আসায় দাফনে এগিয়ে আসে পাড়া-প্রতিবেশী

মৃত্যুর খবর কানাডাপ্রবাসী বোনসহ অন্য আত্মীয়দের জানানো হলেও কেউ আসেননি বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। পরে স্থানীয়দের উদ্যোগেই কোয়েল চৌধুরীকে বাবা-মায়ের কবরের পাশে আলীপুর কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

প্রতিবেশীদের ভাষায়, বড় ভাই বাবু চৌধুরীর মৃত্যুর সময়ও একই ধরনের নীরবতা দেখা গিয়েছিল। এবারও স্বজনদের কেউ উপস্থিত না হওয়ায় স্থানীয় মানুষই শেষ পর্যন্ত শেষকৃত্যের দায়িত্ব নেয়।

পুলিশ যা বলছে

ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মাহামুদুল হাসান জানান, ৯৯৯ নম্বরে কল পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কোয়েল চৌধুরীকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে। পরে স্থানীয়রা তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যান। তবে মৃত্যুর পর কেউ থানায় বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানাননি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এক নিঃসঙ্গ জীবনের করুণ পরিণতি

কোয়েল চৌধুরীর মৃত্যু ফরিদপুরের স্থানীয়দের মধ্যে এক ধরনের বিষণ্নতা তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন একাকী জীবন, পরিবারের সদস্যদের দূরে চলে যাওয়া এবং শেষ পর্যন্ত স্বজনহীন দাফন—সব মিলিয়ে ঘটনাটি একটি নিঃসঙ্গ জীবনের করুণ পরিণতি হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এই মৃত্যু শুধু একজন মানুষের মৃত্যু নয়; এটি একটি পরিবারের ভাঙন, একাকীত্ব এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতারও গল্প।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments