Homeটুডে ওয়ার্ল্ডট্রাম্পের সামনে নতুন সংকট: যুদ্ধবিরতি ভেঙে ফের সংঘাত, হরমুজ নিয়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র মুখোমুখি

ট্রাম্পের সামনে নতুন সংকট: যুদ্ধবিরতি ভেঙে ফের সংঘাত, হরমুজ নিয়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র মুখোমুখি

পাল্টাপাল্টি হামলায় ভেস্তে গেল অন্তর্বর্তী সমঝোতা; হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, তেলের বাজার ও যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী রাজনীতি এখন একই সমীকরণে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ৯ জুলাই ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ থামানোর লক্ষ্যে হওয়া অন্তর্বর্তী সমঝোতা কার্যত ভেঙে পড়েছে। নতুন করে পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে আবারও উত্তেজনা চরমে উঠেছে। ফলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য ইরান যুদ্ধ থেকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে বেরিয়ে আসা আগের চেয়ে আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

বুধবার (৯ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্র জানায়, হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল অব্যাহত রাখতে ইরানের বিভিন্ন অবকাঠামোতে নতুন দফায় হামলা চালানো হয়েছে। এর জবাবে ইরান বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে। রয়টার্সের লাইভ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

যুদ্ধবিরতি কার্যত অকার্যকর

সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পায়। যুক্তরাষ্ট্র ওই হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালায়। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তেহরান পাল্টা হামলার ঘোষণা দেয়।

এই পরিস্থিতির পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন, যুদ্ধ অবসানের উদ্দেশ্যে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী সমঝোতা এখন আর কার্যকর নয়।

মাত্র তিন সপ্তাহ আগে দুই পক্ষের মধ্যে স্বাক্ষরিত ওই সমঝোতার লক্ষ্য ছিল একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তির পথে এগিয়ে যাওয়া। কিন্তু নতুন সংঘর্ষ সেই প্রক্রিয়াকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

ট্রাম্পের সামনে কঠিন সমীকরণ

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প এখন এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছেন যেখানে সামরিক ও কূটনৈতিক—দুই পথই ঝুঁকিপূর্ণ।

ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় প্রশাসনের সাবেক মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক মধ্যস্থতাকারী অ্যারন ডেভিড মিলারের ভাষায়, ট্রাম্প এখন নিজেই একটি “ফাঁদের” মধ্যে আটকে গেছেন। তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের কাছ থেকে সামরিক কিংবা কূটনৈতিক কোনো পথেই বড় ধরনের ছাড় আদায় করা কঠিন।

এদিকে নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে। রয়টার্স/ইপসোসের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, তাঁর জনপ্রিয়তা দ্বিতীয় মেয়াদের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।

হরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

বর্তমান সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালি

বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)-এর প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও ইরানের জ্বালানি রপ্তানির জন্য এই পথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইরান দাবি করছে, ভবিষ্যতে এই নৌপথ পরিচালনায় তাদের বিশেষ ভূমিকা থাকবে। এমনকি জাহাজ চলাচলের ওপর ফি আরোপের বিষয়েও তারা ইঙ্গিত দিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার উপসাগরীয় মিত্ররা হরমুজকে আন্তর্জাতিকভাবে উন্মুক্ত ও নিরাপদ জলপথ হিসেবে রাখতে চায়।

তেলের বাজারে নতুন উদ্বেগ

নতুন হামলার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বৈশ্বিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

রয়টার্সের জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, যদি হরমুজ প্রণালিতে অনিশ্চয়তা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং মূল্যস্ফীতির ওপর তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।

নিয়ন্ত্রিত সংঘাতের আশঙ্কা

বর্তমানে আটলান্টিক কাউন্সিলের কর্মকর্তা ও সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জনাথন প্যানিকফ মনে করেন, পরিস্থিতি হয়তো পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেবে না; তবে মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘ সময় ধরে “নিয়ন্ত্রিত অস্থিরতার” মধ্যে থাকতে পারে।

ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (CSIS)-এর বিশ্লেষক জন অলটারম্যানও মনে করেন, ইরান বুঝতে পেরেছে যে ট্রাম্প দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চান না। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আরব মিত্ররাও দ্রুত উত্তেজনা কমানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

খামেনির দাফনের দিনেও উত্তেজনা

নতুন সংঘর্ষের মধ্যেই বৃহস্পতিবার ইরানের নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে দেশটির পবিত্র শহর মাশহাদে দাফন করা হচ্ছে। একই সময়ে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে নতুন বিস্ফোরণ, বুশেহরে বিস্ফোরণের খবর এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা সতর্কতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

যা জানা গেছে

  • যুক্তরাষ্ট্র ইরানে নতুন দফায় সামরিক হামলা চালিয়েছে।
  • পাল্টা জবাবে ইরান বাহরাইন ও কুয়েতে মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার দাবি করেছে।
  • ট্রাম্প অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে কার্যত অকার্যকর ঘোষণা করেছেন।
  • হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ নতুন সংঘাতের প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
  • নতুন উত্তেজনার জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

যা এখনো স্পষ্ট নয়

  • দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা পুনরায় শুরু হবে কি না।
  • হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে নতুন কোনো আন্তর্জাতিক উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না।
  • বর্তমান সংঘাত সীমিত পর্যায়ে থাকবে, নাকি আবারও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেবে।

তথ্যসূত্র: Reuters Live, Reuters Analysis, Reuters Open Interest, Reuters Graphics, Reuters/Ipsos Poll.

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments