২-০ থেকে ৩-২; মেসির জাদু, এনজোর শেষ আঘাত, আর দুটি VAR সিদ্ধান্তে বিশ্বজুড়ে তর্ক—ফুটবলের জয়, নাকি বিতর্কের?
স্পোর্টস ডেস্ক | টুডে স্পোর্টস
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এমন ম্যাচ বহু বছর পর দেখা গেল।
একদিকে ছিল দুই গোলে এগিয়ে থাকা মিশর—যারা প্রায় নিশ্চিত করেই ফেলেছিল টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় অঘটন। অন্যদিকে ছিল বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা—যারা ম্যাচের ৮০ মিনিট পর্যন্ত প্রায় মৃতপ্রায় অবস্থায় ছিল।
তারপর মাত্র ১৩ মিনিট।
ফুটবলের ভাষায় সেটি ছিল এক অলৌকিক প্রত্যাবর্তন। কিন্তু মিশরের চোখে সেটিই হয়ে উঠেছে ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অন্যায়ের প্রতীক।
ম্যাচ শেষে কেউ মেসির নেতৃত্বের প্রশংসা করেছে, কেউ আর্জেন্টিনার মানসিক দৃঢ়তার কথা বলেছে। আবার বিশ্বজুড়ে লক্ষ ফুটবলপ্রেমী প্রশ্ন তুলেছেন—VAR কি একই ম্যাচে দুই দলের জন্য দুই রকম মানদণ্ডে ব্যবহার করা হলো?
শুরু থেকেই আর্জেন্টিনাকে চাপে রেখেছিল মিশর
ম্যাচের প্রথম মিনিট থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, মিশর কোনোভাবেই শুধু রক্ষণ সামলাতে নামেনি।
মোহাম্মদ সালাহ, ওমর মারমুশ এবং মোস্তফা জিকোর গতিময় আক্রমণে বারবার বিপাকে পড়ছিল আর্জেন্টিনার রক্ষণ।
প্রথমার্ধে এগিয়ে যায় মিশর।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে ব্যবধান হয় ২-০।
বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের সামনে তখন বিদায়ের ঘণ্টা প্রায় বেজে গেছে।
যে গোলটি ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিল
৫৮ মিনিটে আবারও আর্জেন্টিনার রক্ষণ ভেঙে দুর্দান্ত এক দলীয় আক্রমণ গড়ে তোলে মিশর।
মারমুশের দৌড়, সালাহর নিখুঁত পাস, আর জিকোর শান্ত ফিনিশ।
বল জালে।
স্কোরবোর্ডে ৩-০।
মিশরের খেলোয়াড়রা উদ্যাপনে মেতে ওঠেন।
কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরই সব বদলে যায়।
VAR রিভিউ শুরু হয়।
রেফারি মাঠের পাশে মনিটরে গিয়ে দেখেন, আক্রমণের শুরুতে মারওয়ান আতিয়া লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে ফাউল করেছিলেন।
ফলে গোল বাতিল।
স্কোর ফিরে আসে ২-০-তে।
নিয়মের মধ্যে সিদ্ধান্ত, কিন্তু বিতর্কেরও জন্ম
IFAB-এর আইন অনুযায়ী গোল হওয়ার আগে একই আক্রমণপর্বে সংঘটিত ফাউল VAR পর্যালোচনা করতে পারে।
অর্থাৎ, নিয়মের দিক থেকে গোল বাতিলের সুযোগ ছিল।
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে অন্য জায়গায়।
ফাউলটি কি সত্যিই এতটা স্পষ্ট ছিল?
আর যদি ছিলও, তাহলে একই ম্যাচে আরেকটি বিতর্কিত ঘটনায় VAR কেন নীরব থাকল?
এখানেই শুরু হয়েছে বিশ্বজুড়ে আলোচনা।
৯২ মিনিটের সেই আক্রমণ
আর্জেন্টিনা তখন ২-২ সমতায়।
অতিরিক্ত সময়ের শুরু।
নিজেদের বক্সের কাছে মোহাম্মদ সালাহ বল নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন।
ঠিক সেই মুহূর্তে হুলিয়ান আলভারেজ বল কেড়ে নেন।
মিশরের দাবি—সালাহকে স্পষ্ট ফাউল করা হয়েছিল।
রেফারি খেলা থামাননি।
VAR-ও হস্তক্ষেপ করেনি।
কয়েক সেকেন্ড পর লাউতারো মার্টিনেজের ক্রস থেকে এনজো ফার্নান্দেজ গোল করেন।
স্কোর ৩-২।
ম্যাচ শেষ।
মিশরের স্বপ্নও শেষ।
মিশরের বিস্ফোরক অভিযোগ
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে মিশরের কোচ হোসাম হাসান নিজের ক্ষোভ লুকাননি।
তিনি বলেন,
“আজ আমরা ফুটবলে সব দিক থেকেই ভালো ছিলাম। কিন্তু কিছু সিদ্ধান্ত ম্যাচের ফল বদলে দিয়েছে। মাঠের ভেতর এবং বাইরের কিছু বিষয় আমাদের হারিয়েছে।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, আর্জেন্টিনার পক্ষে চাপ তৈরি হয়েছিল এবং রেফারির কিছু সিদ্ধান্ত তার প্রভাব বহন করেছে।
কান্নায় ভেঙে পড়লেন জিকো
শেষ বাঁশির পর মিশরের গোলদাতা মোস্তফা জিকো সরাসরি সম্প্রচারেই কান্নায় ভেঙে পড়েন।
তাঁর কণ্ঠে ছিল গভীর হতাশা।
মিশরের ড্রেসিংরুমে তখন কেউ বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না, ২-০ থেকে এগিয়ে থেকেও তারা কীভাবে বিদায় নিল।
বিশেষজ্ঞদের মতও এক নয়
সাবেক ফরাসি কিংবদন্তি থিয়েরি অঁরি মনে করেন, মিশরের গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত কঠোর ছিল এবং এটি আফ্রিকান ফুটবলের জন্যও হতাশাজনক।
সাবেক মেক্সিকান তারকা হাভিয়ের হার্নান্দেজও বলেছেন, ফাউলটি ছিল “সফট”, এমন ঘটনায় গোল বাতিল করা উচিত হয়নি।
অন্যদিকে ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক রয় কিন ভিন্ন মত দেন।
তাঁর মতে, বড় দলগুলো প্রায়ই বিতর্কিত সিদ্ধান্তের সুবিধা পেয়ে থাকে, কিন্তু তাই বলে আর্জেন্টিনার অসাধারণ প্রত্যাবর্তনকে অস্বীকার করা যাবে না।
মেসির উত্তর
ম্যাচ শেষে লিওনেল মেসি বিতর্কে না গিয়ে শুধু দলের মানসিকতার কথাই বলেন।
তিনি জানান, তাঁর দল কখনও হাল ছাড়ে না।
এই জয় সেই বিশ্বাসেরই প্রমাণ।
আর্জেন্টিনা কোচও বলেন, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করার মানসিকতাই তাদের জিতিয়েছে। (We Ain’t Got No History)
তাহলে কি ম্যাচটি রেফারি নির্ধারণ করেছেন?
এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই।
যা নিশ্চিতভাবে বলা যায়—
- মিশরের গোল VAR-এর মাধ্যমে বাতিল হয়েছে, এবং আইন অনুযায়ী এমন পর্যালোচনার সুযোগ ছিল।
- আর্জেন্টিনার তৃতীয় গোলের আগে সালাহর ওপর ফাউলের অভিযোগে VAR হস্তক্ষেপ করেনি।
- এই দুই সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা নিয়েই সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
- তবে রেফারি বা ফিফা ইচ্ছাকৃতভাবে পক্ষপাত করেছে—এমন অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।
এই ম্যাচ ইতিহাসে কী নামে লেখা থাকবে?
কেউ লিখবে—
“মেসির নেতৃত্বে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন।”
আবার কেউ লিখবে—
“যে রাতে মিশরের স্বপ্ন থেমে গিয়েছিল VAR-এর একটি সিদ্ধান্তে।”
কিন্তু একটি বিষয় নিয়ে প্রায় সবাই একমত—
আর্জেন্টিনা–মিশর ম্যাচ শুধু ২০২৬ বিশ্বকাপের সেরা নকআউট লড়াই নয়, এটি এমন একটি ম্যাচ যা ফুটবল, VAR এবং ন্যায়বিচার—এই তিনটি বিষয়কে একই সঙ্গে নতুন করে বিশ্বব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রে এনে দিয়েছে।



