Homeটুডে ওয়ার্ল্ডতাজমহলের নিচে কি সত্যিই মন্দির? নতুন আইনি লড়াইয়ে উত্তপ্ত ভারত, ইতিহাস বদলে...

তাজমহলের নিচে কি সত্যিই মন্দির? নতুন আইনি লড়াইয়ে উত্তপ্ত ভারত, ইতিহাস বদলে যাবে নাকি বিতর্কই বাড়বে?

এলাহাবাদ হাইকোর্টের নোটিশে ফের আলোচনায় বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্য; ‘তেজো মহালয়া’ তত্ত্ব সামনে এনে জরিপের দাবি, তবে মূলধারার ইতিহাসবিদরা এখনো সেই দাবির পক্ষে কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ দেখেন না

নয়াদিল্লি | ৭ জুলাই ২০২৬

বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত স্থাপনা তাজমহলকে ঘিরে ভারতে আবারও শুরু হয়েছে নতুন আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ক। এলাহাবাদ হাইকোর্ট কেন্দ্রীয় সরকার ও আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়াকে (এএসআই) নোটিশ জারি করে জানতে চেয়েছে—তাজমহলের নিচে কথিত প্রাচীন হিন্দু মন্দিরের অস্তিত্ব যাচাইয়ে জরিপ কেন করা হবে না।

আদালতের এই পদক্ষেপের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজনৈতিক অঙ্গন পর্যন্ত নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, এটি কি কেবল একটি প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের দাবি, নাকি ভারতের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ঘিরে চলমান বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ?

কী দাবি করা হয়েছে?

আবেদনকারী পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন হিন্দুত্ববাদী আইনজীবী হরিশঙ্কর জৈন। তাদের দাবি, তাজমহল আসলে মোগল সম্রাট শাহজাহানের নির্মিত সমাধিসৌধ নয়; বরং এটি বহু আগে নির্মিত ভগবান শিবের মন্দির, যার নাম ছিল ‘তেজো মহালয়া’

তাদের বক্তব্য অনুযায়ী—

  • এটি ১১৫৫-৫৬ খ্রিষ্টাব্দে রাজা পরমর্দি দেব নির্মাণ করেছিলেন।
  • পরবর্তীতে মোগলরা সেটি দখল করে বর্তমান তাজমহলে রূপান্তর করে।
  • তাদের কাছে ১০৯টি তথাকথিত প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ রয়েছে।
  • আদালতের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ জরিপ ও ভিডিওগ্রাফি করতে চান তারা।

আদালতে কী হচ্ছে?

এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি রোহিতরঞ্জন আগরওয়ালের বেঞ্চ আবেদনটি গ্রহণ করে কেন্দ্রীয় সরকার ও এএসআইয়ের কাছে জবাব চেয়েছে।

এর আগে আগ্রার নিম্ন আদালত পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে একই ধরনের আবেদন খারিজ করে দিয়েছিল। এবার সেই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে নতুন করে আবেদন করা হয়েছে।

এখনও আদালত কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি যে তাজমহলে জরিপ হবে কি না। বিষয়টি বিচারাধীন রয়েছে।

ইতিহাস কী বলে?

মূলধারার ইতিহাসবিদ, প্রত্নতত্ত্ববিদ এবং এএসআই দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে—

  • তাজমহল ১৬৩২ থেকে ১৬৫৩ সালের মধ্যে নির্মিত হয়।
  • মোগল সম্রাট শাহজাহান তাঁর স্ত্রী মমতাজ মহলের স্মৃতিতে এটি নির্মাণ করেন।
  • এই তথ্য সমসাময়িক মোগল নথি, শিলালিপি, বিদেশি পর্যটকদের বিবরণ এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিলে উল্লেখ রয়েছে।
  • বর্তমানে তাজমহল ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত।

এ পর্যন্ত মূলধারার প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় তাজমহল পূর্বে কোনো হিন্দু মন্দির ছিল—এমন দাবির পক্ষে গ্রহণযোগ্য ও সর্বসম্মত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

তাহলে ‘তেজো মহালয়া’ তত্ত্ব কোথা থেকে এলো?

এই তত্ত্ব নতুন নয়।

গত কয়েক দশক ধরে কিছু লেখক ও সংগঠন দাবি করে আসছে যে তাজমহল আসলে একটি প্রাচীন শিবমন্দির ছিল।

তবে অধিকাংশ ইতিহাসবিদ এই দাবিকে ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত বলে গ্রহণ করেন না। তাদের মতে, এ ধরনের দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত নথি, প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য কিংবা বৈজ্ঞানিক গবেষণা নেই।

তাজমহল কি ভেঙে মন্দির করা হবে?

বর্তমানে এমন কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত নেই।

এ মুহূর্তে যা হয়েছে তা হলো—

  • আদালতে একটি আবেদন হয়েছে।
  • আদালত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য চেয়েছে।
  • জরিপ হবে কি না, সেটিও এখনো নির্ধারিত হয়নি।
  • তাজমহল ভাঙা, রূপান্তর করা বা মন্দির ঘোষণা করার মতো কোনো আদেশ আদালত দেয়নি।

অতএব, “তাজমহল ভেঙে মন্দির করা হচ্ছে”—এমন দাবি বর্তমানে বাস্তবসম্মত বা প্রমাণিত নয়।

কেন আবারও এমন বিতর্ক?

বিশ্লেষকদের মতে, রাম জন্মভূমি-বাবরি মসজিদ মামলার রায়ের পর ভারতের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থাপনার আদি পরিচয় নিয়ে একের পর এক মামলা হচ্ছে।

এর আগে জ্ঞানবাপী মসজিদ, শাহী ঈদগাহসহ আরও কয়েকটি স্থাপনাকে ঘিরেও একই ধরনের আইনি বিতর্ক দেখা গেছে।

তাজমহলকে ঘিরে নতুন মামলাকে সেই ধারাবাহিকতার অংশ বলেই মনে করছেন অনেক পর্যবেক্ষক।

আন্তর্জাতিক গুরুত্ব

তাজমহল শুধু ভারতের নয়, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা।

  • ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য
  • বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের একটি
  • প্রতিবছর লাখো দেশি-বিদেশি পর্যটকের গন্তব্য
  • ভারতের পর্যটন অর্থনীতির অন্যতম প্রধান প্রতীক

এ কারণে তাজমহলকে ঘিরে যেকোনো আইনি বা রাজনৈতিক বিতর্ক আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হয়।

সামনে কী হতে পারে?

এখন কেন্দ্রীয় সরকার ও এএসআই আদালতে তাদের জবাব দেবে।

এরপর আদালত সিদ্ধান্ত নেবে—

  • জরিপের আবেদন গ্রহণ করা হবে কি না,
  • নতুন তদন্ত প্রয়োজন কি না,
  • নাকি আবেদন খারিজ করা হবে।

সুতরাং তাজমহলের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। বর্তমানে বিষয়টি একটি বিচারাধীন আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।

সংক্ষেপে

  • এলাহাবাদ হাইকোর্ট তাজমহল নিয়ে জরিপের দাবিতে কেন্দ্রীয় সরকার ও এএসআইকে নোটিশ দিয়েছে।
  • আবেদনকারী পক্ষের দাবি, তাজমহল আসলে ‘তেজো মহালয়া’ নামে একটি প্রাচীন শিবমন্দির।
  • মূলধারার ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা এখনো এই দাবিকে সমর্থন করে না।
  • আদালত এখনো জরিপের নির্দেশ দেয়নি এবং তাজমহল ভাঙা বা মন্দিরে রূপান্তরের কোনো সিদ্ধান্তও হয়নি।
  • মামলার পরবর্তী শুনানি ও আদালতের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ অগ্রগতি।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments