Homeটুডে ওয়ার্ল্ডখামেনির রাষ্ট্রীয় বিদায়: সাত দিনের শোকাচার, প্রতিশোধের হুঙ্কার আর সম্ভাব্য ৩ হাজার...

খামেনির রাষ্ট্রীয় বিদায়: সাত দিনের শোকাচার, প্রতিশোধের হুঙ্কার আর সম্ভাব্য ৩ হাজার মৃত্যুর অজানা শঙ্কা

সাত দিনব্যাপী আয়োজনে কোটির বেশি মানুষের ঢল, অতিরিক্ত কবর প্রস্তুত, উত্তরসূরি মোজতবার উপস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা, আর মহররমের শোকপর্বের সাথে মিলিয়ে দাফনের প্রতীকী বার্তা

তেহরান | ০৫ জুলাই ২০২৬

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় নিহত হন ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। যুদ্ধের প্রথম দিনেই পরিবারের কয়েকজন সদস্য ও শীর্ষ কর্মকর্তাসহ ৮৬ বছর বয়সী এই নেতার মৃত্যু ইরানের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় গভীর প্রভাব ফেলে। মূলত মার্চেই তার দাফন সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের কারণে তা কয়েক মাস পিছিয়ে যায়। পাঁচ সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার প্রায় চার মাস পর, ৩ জুলাই থেকে শুরু হয়েছে সাত দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান, যা শেষ হবে আগামী ৯ জুলাই মাশহাদে দাফনের মধ্য দিয়ে।

এই আয়োজন শুধু একজন নেতার বিদায় নয় — এটি হয়ে উঠেছে ইরানের রাষ্ট্রীয় ঐক্য প্রদর্শনের এক বিশাল মঞ্চ, পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জের বার্তা, এবং একই সঙ্গে সম্ভাব্য মানবিক বিপর্যয়ের এক অজানা শঙ্কার নাম।

🔎 দাফনের সূচি: তেহরান থেকে মাশহাদ পর্যন্ত দীর্ঘ যাত্রা

খামেনির মরদেহ নিয়ে শোকযাত্রার একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় ও ভৌগোলিক রুট নির্ধারণ করা হয়েছে। তেহরানে তিন দিন কফিন জনসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখার পর তা নেওয়া হবে শিয়া ধর্মীয় নগরী কোমে। এরপর প্রতিবেশী দেশ ইরাকের নাজাফ ও কারবালায় নেওয়া হবে কফিন — এই দুটি স্থান শিয়া মুসলিমদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র, ইমাম আলী (রা.) ও ইমাম হুসাইনের (রা.) মাজার সেখানে অবস্থিত। ইরাক থেকে ফিরিয়ে আনার পর আগামী ৯ জুলাই খামেনির নিজ শহর মাশহাদে তাকে চূড়ান্তভাবে সমাহিত করা হবে।

এই দীর্ঘ ও বহু-স্তরীয় শোকযাত্রা কাঠামো ইরান সরকারের জন্য একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক-ধর্মীয় প্রদর্শনী হিসেবেও কাজ করছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। প্রতিটি স্টপেজ — তেহরান, কোম, নাজাফ, কারবালা, মাশহাদ — শিয়া বিশ্বের একেকটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, এবং প্রতিটি স্থানেই বিপুল জনসমাগমের মধ্য দিয়ে সরকার তার বৈধতা ও ধর্মীয়-রাজনৈতিক প্রভাব তুলে ধরার চেষ্টা করছে।

💬 তেহরানের রাজপথে ক্ষোভ, শোক আর প্রতিশোধের প্রতিজ্ঞা

শনিবার (৪ জুলাই) সকাল থেকেই তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লা ধর্মীয় কমপ্লেক্স ও তার আশপাশের এলাকায় মানুষের ঢল নামে। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভোর থেকেই কমপ্লেক্সের প্রধান প্রাঙ্গণ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়, আর তেহরানের বিভিন্ন মেট্রো স্টেশনের বাইরে হাজারো মানুষ মেট্রো চালুর অপেক্ষায় দাঁড়িয়েছিলেন।

তীব্র গরম আর প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যেও জনতার উপস্থিতি কমেনি। সমবেত নারী-পুরুষদের শীতল রাখতে কৃত্রিমভাবে পানি ছিটানো হচ্ছিল, আর কঠোর লিঙ্গ-বিভাজন মেনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে শোকাতুর মানুষ বুক চাপড়ে শোক প্রকাশ করছিলেন। মূল মঞ্চের সামনে রাখা হয়েছিল খামেনির কফিন, যার ওপর শোভা পাচ্ছিল তার ঐতিহ্যবাহী কালো পাগড়ি। পাশেই রাখা হয়েছিল হামলায় নিহত তার পরিবারের আরও চারজন সদস্যের কফিন — যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি দৃষ্টি কেড়েছে তার মাত্র ১৪ মাস বয়সী নাতনি জাহরা মোহাম্মদী গোলপায়গানির ছোট্ট কফিনটি।

জনতার কণ্ঠে মুহুর্মুহু ধ্বনিত হচ্ছিল “আমেরিকার মৃত্যু হোক” ও “প্রতিশোধ, প্রতিশোধ” স্লোগান। রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গ্র্যান্ড মোসাল্লা প্রাঙ্গণে উপস্থিত ৪০ বছর বয়সী আরশ রাহিমি বলেন, তারা নিজেদের নেতার রক্তের প্রতিশোধ নেবেনই, এবং উপস্থিত প্রত্যেকেই সর্বোচ্চ নেতার হত্যার বিচার চান। তিনি আরও বলেন, খামেনি নিজেই সবসময় বলতেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক “রক্তের শত্রুতা”র, তাই আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।

হামাদান প্রদেশ থেকে তেহরানে আসা হামিদ তেইমোরি নামের আরেক ব্যক্তি আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, নিজের বাবার মৃত্যুর সময়ও তিনি এতটা কাঁদেননি, যতটা কেঁদেছেন সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর খবর শুনে। জানাজায় অংশ নেওয়া সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা মানুষ — সবার কাছেই খামেনির মৃত্যু যেন কেবল একজন রাষ্ট্রনায়কের প্রয়াণ নয়, বরং পারিবারিক অভিভাবক হারানোর চেয়েও বড় এক ট্র্যাজেডি।

শোক প্রকাশের প্রতীক হিসেবে জনতা কালো পোশাক পরিধান করেছেন এবং হাতে নিয়েছেন “রক্ত-লাল” পতাকা, যা শিয়া ঐতিহ্যে প্রতিশোধ ও ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। কর্তৃপক্ষের ধারণা অনুযায়ী, শুধু রাজধানী তেহরানেই এক কোটিরও বেশি মানুষের সমাগম ঘটতে পারে — যা ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির জানাজার পর ইরানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গণজমায়েত হতে যাচ্ছে।

📊 সংক্ষিপ্ত তথ্যছক

বিষয়তথ্য
নিহতের তারিখ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বয়স৮৬ বছর
শাসনকালপ্রায় সাড়ে তিন দশক (১৯৮৯ থেকে)
শোক কর্মসূচি শুরু৩ জুলাই ২০২৬
দাফনের তারিখ৯ জুলাই ২০২৬
দাফনস্থলমাশহাদ (জন্মস্থান)
যাত্রাপথতেহরান → কোম → নাজাফ/কারবালা (ইরাক) → মাশহাদ
প্রত্যাশিত সমাগম (শুধু তেহরানে)১ কোটির বেশি
সম্ভাব্য মৃত্যু (অসমর্থিত, গোপন চিঠি অনুযায়ী)১৫০০–৩০০০
সর্বশেষ তুলনীয় গণজমায়েত১৯৮৯, আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির জানাজা

📌 নিরাপত্তা শঙ্কা: অতিরিক্ত কবর প্রস্তুত, গোপন চিঠির বরাতে ৩ হাজার মৃত্যুর আশঙ্কা

এই বিশাল আয়োজনকে ঘিরে সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য এসেছে জার্মান সংবাদমাধ্যম ওয়েল্টের একটি প্রতিবেদন থেকে। শনিবার প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বলা হয়, তেহরানের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাংবাদিক একটি গোপন সরকারি চিঠি সংবাদমাধ্যমটির কাছে পাঠিয়েছেন। চিঠিটি দাবি অনুযায়ী পাঠানো হয়েছে ইরানের রেডক্রস ও জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে, প্রাপক ফার্স্ট ভাইস-প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফ।

চিঠির বিষয়বস্তু অনুযায়ী, সাতদিনব্যাপী এই রাষ্ট্রীয় বিদায় অনুষ্ঠানে বিপুল জনসমাগমের কারণে ১৫০০ থেকে ৩ হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ নিখোঁজ হওয়ারও আশঙ্কা করা হয়েছে চিঠিতে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতিমধ্যে একটি বিশেষ ইউনিট গঠন করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে, যেটি সম্ভাব্য মৃত্যু ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করবে।

আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো, তেহরানের বেহেস্ত-ই জাহরা কবরস্থানে ইতিমধ্যে নতুন করে কয়েক হাজার কবর প্রস্তুত করা হয়েছে। তেহরান পৌরসভার এক কর্মীর বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, এই নতুন কবরগুলো বাস্তবেই খনন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, এত বিশাল আয়োজনে তিন হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যুও হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে — কারণ তীব্র গরমের মধ্যে এত বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগমে ঠিক কী পরিস্থিতি তৈরি হবে, তা কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারছেন না

সম্পাদকীয় সতর্কতা: এই সংখ্যা — ১৫০০ থেকে ৩ হাজার সম্ভাব্য মৃত্যু — এখনো কোনো সরকারি বা স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য সূত্র থেকে নিশ্চিত হয়নি। এটি একটি নাম-প্রকাশ-না-করা সাংবাদিকের সরবরাহ করা অপ্রকাশিত চিঠির বরাতে দেওয়া তথ্য, যা এখনো ইরান সরকারের পক্ষ থেকে স্বীকার বা অস্বীকার করা হয়নি। পাঠকদের এই তথ্যকে একটি “সম্ভাব্য ঝুঁকি নির্দেশক প্রতিবেদন” হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত, চূড়ান্ত সত্য হিসেবে নয়।

📌 উত্তরাধিকার প্রশ্ন: প্রকাশ্যে অনুপস্থিত মোজতবা খামেনি

খামেনির মৃত্যুর পর সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তার একটি হলো তার মনোনীত উত্তরসূরি ছেলে মোজতবা খামেনির ভূমিকা নিয়ে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, মোজতবা খামেনি কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন যে তিনি বাবার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নিতে চান, বিশেষ করে ৯ জুলাইয়ের দাফন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু ইসরায়েলি হামলার আশঙ্কা এবং তার গোপন অবস্থান ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে এখনো তার এই অনুরোধ মঞ্জুর করা হয়নি।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, যুদ্ধের প্রথম দিনেই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় মোজতবা খামেনির স্ত্রী, কিশোর ছেলে ও অন্যান্য স্বজন নিহত হন। বুধবার তাদের স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানেও তিনি উপস্থিত ছিলেন না। এই ধারাবাহিক অনুপস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে যে, তিনি আদৌ দেশের নেতৃত্ব সামলাচ্ছেন কিনা। ইরানের কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে তাকে এখনো প্রকাশ্যে আসতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে।

তবে শুক্রবার (৩ জুলাই) দেশটির শীর্ষ নেতারা বিদেশি প্রতিনিধিদের স্বাগত জানিয়ে নিজেদের মধ্যে ইস্পাতকঠিন একতা প্রদর্শন করেছেন। এই আলোচনায় অংশ নেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং নবনিযুক্ত রেভল্যুশনারি গার্ডসের প্রধান আহমদ ওয়াহিদি, যারা জনগণকে দলে দলে অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ইরানের এই প্রতিশোধের কণ্ঠস্বর যেন গোটা বিশ্বে পৌঁছায়।

📌 স্বাধীনতা দিবসের সঙ্গে মিলে যাওয়া তারিখ: কাকতালীয় নাকি বার্তা?

খামেনির দাফনের তারিখ যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস, ৪ জুলাইয়ের সঙ্গে সময়ের দিক থেকে মিলে যাওয়ায় বিভিন্ন মহলে জল্পনা তৈরি হয়েছিল। তবে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ ফেলো মোহাম্মদ ইসলামি এই ধারণা নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, দাফন অনুষ্ঠিত হচ্ছে মহররম মাসের প্রথম ১০ দিনের শোকপর্ব শেষ হওয়ার পর, যে সময়টায় শিয়া মুসলিমরা তৃতীয় ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শাহাদাত স্মরণ করেন।

মোহাম্মদ ইসলামির ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের জন্য এই সময়টি গভীর ধর্মীয় ও প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে, এবং দাফনের তারিখ নির্ধারণে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস কোনোভাবেই বিবেচ্য বিষয় ছিল না। তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, ইরান মূলত বিশ্বজুড়ে থাকা নিজেদের অনুসারীদের উদ্দেশে একটি নির্দিষ্ট বার্তা দিতে চায় — আর সেই বার্তা হলো, আলী খামেনির শাহাদাতকে তারা ইমাম হুসাইনের (আ.) শাহাদাতের আদর্শিক ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করছে। এভাবে ধর্মীয় বয়ান ও রাজনৈতিক প্রতীকীবাদকে একসূত্রে গেঁথে ইরান সরকার খামেনির মৃত্যুকে একটি ঐতিহাসিক শাহাদাতের ধারাবাহিকতা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।

📌 আন্তর্জাতিক উপস্থিতি: বিশ্বজুড়ে মিত্র ও সমমনা রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব

খামেনির শেষ বিদায় অনুষ্ঠানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মকর্তারা অংশ নিয়েছেন, যা এই আয়োজনকে একটি বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক মাত্রা দিয়েছে। ইরানি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, উপস্থিত রয়েছেন —

  • ইরাকের প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট স্পিকার
  • পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, সিনেট চেয়ারম্যান ও সেনাপ্রধান
  • আফগানিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী
  • আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী
  • তুরস্কের ভাইস প্রেসিডেন্ট
  • সৌদি আরবের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী
  • কাতারের শুরা কাউন্সিলের স্পিকার
  • ওমানের স্টেট কাউন্সিলের চেয়ারম্যান
  • ইয়েমেনের ভাইস প্রেসিডেন্ট
  • মিসরের সিনেট স্পিকার

এ ছাড়া রাশিয়া, চীন, বেলারুশ, জর্জিয়া, সার্বিয়া, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, ভারত, বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, বুরকিনা ফাসো, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, নামিবিয়া ও নিকারাগুয়ার প্রতিনিধিরাও উপস্থিত রয়েছেন। পাশাপাশি সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও), ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) ও ডেভেলপিং-৮ (ডি-৮)-এর প্রতিনিধিরা, ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদ, হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং লেবাননের রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরাও তেহরানে অবস্থান করছেন খামেনির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে।

এই বিপুল আন্তর্জাতিক উপস্থিতি স্পষ্টতই ইঙ্গিত দেয় যে, ইরান এই আয়োজনকে কেবল একটি অভ্যন্তরীণ শোক অনুষ্ঠান হিসেবে না দেখিয়ে, বরং প্রতিরোধ অক্ষ ও সমমনা রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংহতি প্রদর্শনের একটি বৈশ্বিক মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে।

📌 রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ: বৈধতার পরীক্ষা ও আঞ্চলিক উত্তেজনার শঙ্কা

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাড়ে তিন দশক ধরে ইরান শাসন করা খামেনির এই বিশাল শেষকৃত্য আয়োজনকে সরকার জনগণের আবেগ ও ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে একটি অভূতপূর্ব জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে। বিশেষ করে গত জানুয়ারিতে দেশজুড়ে ঘটে যাওয়া গণবিক্ষোভ এবং তা কঠোরভাবে দমনের পর, এই বিশাল জমায়েতকে সরকার পরিচালনার বৈধতা প্রমাণের একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

একই সঙ্গে, মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় সর্বোচ্চ নেতার এই আকস্মিক মৃত্যু মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এবং ওয়াশিংটন-তেহরান সম্পর্ককে আরও গভীর সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। যদিও পাঁচ সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি বলবৎ রয়েছে, তবে উভয় পক্ষই যেকোনো মুহূর্তে পুনরায় যুদ্ধ শুরুর হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মূল অনুষ্ঠান শুরুর আগে তেহরানের চিরচেনা যানজটপূর্ণ রাস্তাগুলো ছিল তুলনামূলকভাবে ফাঁকা। জানা গেছে, অনেক সাধারণ বাসিন্দা এই দীর্ঘ শোক-কর্মসূচি চলাকালীন সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা এড়াতে সাময়িকভাবে শহর ছেড়ে চলে গেছেন — যা একদিকে যেমন জনসাধারণের নিরাপত্তা-সচেতনতার প্রতিফলন, তেমনি সরকারের প্রচারিত “জাতীয় ঐক্যের” চিত্রের সঙ্গে একটি সূক্ষ্ম বৈপরীত্যও তৈরি করে।


সামগ্রিকভাবে, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির এই রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্য অনুষ্ঠান ইরানের সাম্প্রতিক ইতিহাসে একটি বহুমাত্রিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে — এটি একদিকে গণশোক ও ধর্মীয় আচারের প্রকাশ, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ধারাবাহিকতা প্রমাণের চেষ্টা, প্রতিশোধের রাজনৈতিক বার্তা প্রচারের মঞ্চ, এবং একই সঙ্গে একটি অনিশ্চিত মানবিক ঝুঁকির উৎসও বটে। আগামী কয়েকদিনে মোজতবা খামেনির সম্ভাব্য প্রকাশ্য উপস্থিতি, দাফন-পরবর্তী রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের দিকনির্দেশনা এবং ওয়েল্টের প্রতিবেদনে উল্লেখিত সম্ভাব্য প্রাণহানির সংবাদ সত্যতা যাচাই — এই তিনটি বিষয়ের ওপরই নির্ভর করবে ঘটনার পরবর্তী গতিপথ।

সূত্র: রয়টার্স, এএফপি, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়েল্ট, হুরিয়েত ডেইলি নিউজ, আল জাজিরা

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments