অধ্যাপক ড. আমিনুল ইসলামের বিশ্লেষণ
একজন সাধারণ যাত্রী যদি বিমানে উঠে বলেন— “আমি নামব”, তাহলে নিয়ম কী বলে? উত্তর খুব সহজ। জরুরি চিকিৎসা, নিরাপত্তা হুমকি বা বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়া বিমান ট্যাক্সিওয়ে থেকে ফিরিয়ে আনা যায় না। কারণ একটি বাণিজ্যিক ফ্লাইট কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত গাড়ি নয়।
কিন্তু বাংলাদেশে নিয়মের চেয়ে বড় জিনিস আছে— পরিচয়। আর পরিচয়ের চেয়েও বড় জিনিস আছে— ক্ষমতার ব্যবহার।
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা সেই বাস্তবতাকেই আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফার্স্ট অফিসার গোলাম রাব্বি প্রিন্স চট্টগ্রামে নিজের বিয়ের অনুষ্ঠানে যাচ্ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, বিমান ট্যাক্সিওয়ে ধরে উড্ডয়নের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় তাঁর মনে হয়— বিয়ের শেরওয়ানি বাসায় ফেলে এসেছেন।
কেবিন ক্রু তাঁকে জানায়, এই মুহূর্তে বিমান ফিরিয়ে আনার কোনো নিয়ম নেই। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি নিজের পরিচয়পত্র বের করেন, পরিচয় দেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কর্মকর্তা হিসেবে এবং পরে ককপিটে গিয়ে নিজের পরিচয় ব্যবহার করেন।
এরপর যা ঘটেছে, সেটি আরও বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। প্রায় ১০০ যাত্রী বহনকারী এয়ার অ্যাস্ট্রার ফ্লাইট আবার টার্মিনালে ফিরিয়ে আনা হয়। ফলাফল— শিশু, বৃদ্ধসহ প্রায় একশো যাত্রীকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে।
বিষয়টি শুধু একজন কর্মকর্তার আচরণ নিয়ে নয়; প্রশ্ন উঠছে পুরো সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে।

শেরওয়ানি বড়, নাকি নিরাপত্তা প্রটোকল?
আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (ICAO)-এর বিধিমালা অনুযায়ী, গুরুতর জরুরি অবস্থা, নিরাপত্তা হুমকি, যান্ত্রিক ত্রুটি বা এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের নির্দেশ ছাড়া কোনো উড়োজাহাজ ট্যাক্সিওয়ে থেকে ফিরিয়ে আনার সুযোগ নেই।
অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, কোনো যাত্রী মাঝপথে নেমে গেলে কেবল তাকে নামিয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তার লাগেজ নামাতে হয়, নতুন করে নিরাপত্তা পরীক্ষা করতে হয়, ফ্লাইটের ক্লিয়ারেন্সও পুনরায় নিতে হয়।
অর্থাৎ এটি শুধু সময় নষ্টের বিষয় নয়— এটি নিরাপত্তা, পেশাগত নৈতিকতা এবং বিমান পরিচালনার মৌলিক শৃঙ্খলার প্রশ্ন।
অভিযোগ আরও গুরুতর— সংশ্লিষ্ট পাইলটের সঙ্গে পূর্বপরিচয়ের কারণেই এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে। যদি সেটি সত্য হয়, তাহলে এটি নিছক আবেগ বা ব্যক্তিগত ভুল নয়; এটি ক্ষমতার অপব্যবহার।
ককপিটে যাওয়ার প্রশ্নও কি এড়িয়ে যাওয়া যায়?
আরেকটি প্রশ্ন আরও বেশি উদ্বেগ তৈরি করে।
সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ককপিটে গিয়েছিলেন। কিন্তু সাধারণভাবে ককপিট যাত্রীদের জন্য সীমাবদ্ধ এলাকা। নিরাপত্তা ব্যবস্থার অন্যতম স্পর্শকাতর অংশ এটি।
তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে— একজন যাত্রী হিসেবে তিনি কীভাবে সেখানে প্রবেশ করলেন?
যদি প্রবেশ করে থাকেন, তাহলে সেটি কি প্রতিষ্ঠিত নিরাপত্তা প্রটোকলের লঙ্ঘন নয়?
সমস্যা একজন ব্যক্তি নয়, পুরো সংস্কৃতি
এখানে মূল সমস্যা একজন কর্মকর্তা নন। সমস্যা সেই সংস্কৃতি, যেখানে পদমর্যাদা অনেক সময় দায়িত্ব নয়, বিশেষ সুবিধার পাসপোর্ট হয়ে দাঁড়ায়।
একজন পাইলট, একজন সচিব, একজন ব্যবসায়ী কিংবা একজন ছাত্র— বিমানের ভেতরে সবাই সমান হওয়ার কথা। সেখানে কারও আলাদা পরিচয়ের মূল্য থাকার কথা নয়।
কিন্তু আমাদের বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে অফিসের পরিচয় অনেক সময় ব্যক্তিগত ক্ষমতায় পরিণত হয়।
আজ শেরওয়ানির জন্য বিমান ফিরেছে— কাল অন্য কিছুতে কী হবে?
যদি একজন ব্যক্তি নিজের পরিচয় ব্যবহার করে একটি চলমান ফ্লাইটের গতিপথ বদলে দিতে পারেন, তাহলে সাধারণ মানুষের জন্য তৈরি নিয়মগুলো আসলে কার জন্য?
তদন্তের ঘোষণা যথেষ্ট নয়
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে তদন্তের কথা বলেছে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ তদন্তের ঘোষণা অনেক শুনেছে; ফলাফল তুলনামূলক কম দেখেছে।
এখন দেখার বিষয় একটাই— এখানে কি সত্যিই নিয়মের বিচার হবে, নাকি আবারও পরিচয়ের ওজন নিয়মের চেয়ে ভারী হয়ে উঠবে?
কারণ এই ঘটনা কেবল শেরওয়ানির গল্প নয়।
এটি রাষ্ট্রের একটি পুরনো রোগের গল্প— যেখানে কিছু মানুষ নিজেদের নাগরিক নয়, জমিদার ভাবতে শুরু করে।
আর সেই রোগের নাম— ক্ষমতার অহংকার।



