তেহরানে কয়েকদিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় শোক কর্মসূচিতে বিদেশি প্রতিনিধিদের উপস্থিতি নিয়ে নতুন আলোচনা; বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে
তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় শেষ শ্রদ্ধা অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি। কয়েকদিনব্যাপী এই রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে বিভিন্ন দেশের সরকারি প্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ বিশ্ব রাজনীতিতে এর তাৎপর্য নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর লাইভ সম্প্রচারে দেখা গেছে, স্থানীয় ও বিদেশি প্রতিনিধিরা রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে উপস্থিত হয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। একই সময়ে অনুষ্ঠান ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং তেহরানসহ বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তবে শুধু শোকানুষ্ঠান নয়, এটিকে ঘিরে এখন নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ ভূরাজনৈতিক অবস্থান।
যুদ্ধের মধ্যেই বড় রাষ্ট্রীয় আয়োজন
চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যেই এই ধরনের দীর্ঘ রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ বা সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যে রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্য অনেক সময় শুধু শোকের আনুষ্ঠানিকতা থাকে না; এটি রাজনৈতিক শক্তি, রাষ্ট্রীয় ঐক্য এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রদর্শনেও ব্যবহৃত হয়।
ইরানও সম্ভবত সেই কৌশলের অংশ হিসেবেই এই আয়োজনকে বৃহত্তর রাজনৈতিক বার্তায় রূপ দিতে চাইছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
‘Pax Americana’ নিয়ে নতুন বিতর্ক
ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি পুরোনো ধারণা—‘Pax Americana’—নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে “Pax Americana” বলতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক ব্যবস্থাকে বোঝানো হয়, যেখানে সামরিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে ওয়াশিংটন দীর্ঘ সময় আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করেছে।
এর আগে ইতিহাসে “Pax Romana” ও “Pax Britannica” ধারণাও ব্যবহৃত হয়েছিল—যেখানে যথাক্রমে রোমান ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বৈশ্বিক প্রভাব বোঝানো হতো।
তবে সমালোচকদের একটি অংশের মতে, এসব ধারণার আড়ালে অনেক সময় বড় শক্তিগুলোর কৌশলগত প্রভাব বিস্তারও কাজ করেছে।
একমেরু থেকে বহুমেরু বিশ্ব?
বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা নিয়েও নতুন আলোচনা সামনে এসেছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, বিশ্ব ধীরে ধীরে একমেরু (Unipolar) কাঠামো থেকে বহুমেরু (Multipolar) ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
চীনের উত্থান, রাশিয়ার পুনরায় সক্রিয় অবস্থান, ব্রিকস জোটের সম্প্রসারণ, মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান ভূমিকা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাস—এসব বিষয়কে সেই পরিবর্তনের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে একটি ঘটনার ওপর ভিত্তি করে বৈশ্বিক ক্ষমতার কাঠামো পুরোপুরি বদলে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সতর্ক থাকার কথাও বলছেন পর্যবেক্ষকেরা।
প্রতীকী শক্তি, নাকি নতুন বাস্তবতা?
ইরানের রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান মধ্যপ্রাচ্যের চলমান বাস্তবতায় নিঃসন্দেহে প্রতীকী গুরুত্ব বহন করছে।
তবে এই আয়োজন বিশ্ব রাজনীতিতে স্থায়ী পরিবর্তনের সূচনা করবে নাকি এটি কেবল একটি রাজনৈতিক মুহূর্ত হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে—সেটি নির্ধারণ করবে আগামী কয়েক মাসের কূটনৈতিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতি।
একজন মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষকের ভাষায়, “এটি হয়তো কোনো সাম্রাজ্যের পতনের ছবি নয়; বরং এমন একটি বিশ্বের প্রতিচ্ছবি, যেখানে রাষ্ট্রগুলো ক্রমেই বিকল্প শক্তিকেন্দ্রের সন্ধান করছে।”



