সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ড, দাঙ্গা ও ভাঙচুরে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে নতুন আইন আনছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। একই অধিবেশনে ওবিসি সংরক্ষণ ও অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়েও বড় সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত মিলেছে।
কলকাতা | ২ জুলাই ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গে সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ড, সংগঠিত অপরাধ, দাঙ্গা এবং ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগের ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে একগুচ্ছ নতুন বিল পাস হয়েছে বিধানসভায়। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হয়েছে ‘গুন্ডা দমন বিল’ নামে পরিচিত দুটি আইন, যেগুলোর মাধ্যমে অভিযুক্তদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে নিলামের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ আদায়ের পথ খুলে দেওয়া হয়েছে।
গত সোমবার বিধানসভার চলতি অধিবেশনের শেষ দিনে উত্থাপন করা হয় ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অব অ্যান্টি-সোশ্যাল অ্যাক্টিভিটিজ বিল-২০২৬’ এবং ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল মেইনটেন্যান্স অ্যান্ড পাবলিক অর্ডার অ্যামেন্ডমেন্ট বিল-২০২৬’। কণ্ঠভোটে বিল দুটি পাস হয়। সরকারের দাবি, নতুন আইনের মাধ্যমে দাঙ্গা, বেআইনি সমাবেশ, হিংসাত্মক বিক্ষোভ এবং সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তি ধ্বংসের ঘটনায় দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
কেন এই নতুন আইন
সরকারি পক্ষের বক্তব্য, প্রচলিত ফৌজদারি আইনে অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া গেলেও ক্ষয়ক্ষতির দ্রুত মূল্যায়ন এবং প্রকৃত দোষীদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না। নতুন আইনের মাধ্যমে সেই শূন্যতা পূরণ করা হবে।
বিলের পক্ষে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, আগের আইনে ফাঁকফোকর ছিল, কিন্তু নতুন আইনে তা রাখা হয়নি। তাঁর দাবি, এই আইন কেবলমাত্র দাঙ্গাবাজ ও সমাজবিরোধীদের জন্যই প্রযোজ্য হবে। তিনি আরও বলেন, আইনটি কারও বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে না।
মুখ্যমন্ত্রীর ভাষায়, “দাঙ্গা, বেআইনি সমাবেশ, হিংসাত্মক বিক্ষোভ রোধ করা এবং সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তির সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।”
সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত থেকে নিলাম
নতুন আইনের সবচেয়ে কঠোর দিক হলো অভিযুক্তদের সম্পত্তি দ্রুত বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা। সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, তার পর সেই সম্পত্তি নিলামে তুলে ক্ষতিপূরণ আদায় করা হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীর ক্ষমতাও বাড়ানো হয়েছে বলে সরকারি সূত্রে জানানো হয়েছে।
বিরোধীদের একাংশের আশঙ্কা, এই আইন ভবিষ্যতে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সরকার সে অভিযোগ নাকচ করেছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, আইনটি “গুন্ডাদের জন্য”, সাধারণ মানুষের জন্য নয়।
অতীতের সহিংসতার প্রেক্ষাপট
সরকারি বক্তব্যে অতীতে সিএএ, এনআরসি এবং ওয়াকফ আইনের বিরোধিতাকে কেন্দ্র করে রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে অবরোধ ও সহিংসতার ঘটনাও উল্লেখ করা হয়। অভিযোগ করা হয়েছে, সেসব আন্দোলনের সময় সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস, লুটপাট এবং বাস, ট্রেন, গাড়ি, বাইক ও সরকারি কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছিল।
শাসক শিবিরের দাবি, এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় আরও শক্তিশালী আইনি কাঠামো এখন প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে।
দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা
বিল পাসের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আরও কঠোর ভাষায় বলেন, “দুর্বৃত্তদের ভিটামাটি ছাড়া করব।” তাঁর বক্তব্য, যার অতীত রেকর্ড খারাপ থাকবে, সে যে দলেরই হোক না কেন, এক বছর প্রিভেন্টিভ অ্যারেস্টে থাকতে পারে।
তিনি সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর বিরুদ্ধে তোষণের রাজনীতির অভিযোগও তোলেন। তাঁর দাবি, শক্ত হাতে আইন প্রয়োগ করা হলে দাঙ্গাবাজরা সাহস পেত না।
ওবিসি সংরক্ষণে নতুন সংশোধনী
একই দিনে অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি বা ওবিসি সংরক্ষণ নীতিতেও নতুন দুটি সংশোধনী বিল পাস হয়েছে। বিল দুটি হলো ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল ব্যাকওয়ার্ড ক্লাসেস (রিজার্ভেশন অব ভ্যাকান্সিস ইন সার্ভিসেস অ্যান্ড পোস্টস) অ্যামেন্ডমেন্ট বিল-২০২৬’ এবং ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল কমিশন ফর ব্যাকওয়ার্ড ক্লাসেস অ্যামেন্ডমেন্ট বিল-২০২৬’।
সরকারের দাবি, পুরনো ওবিসি তালিকার আইনি জটিলতা দূর করা এবং অনগ্রসর শ্রেণি কমিশনের কাজের পরিধি বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই সংশোধনী আনা হয়েছে।
বিল দুটি পেশ করেন অনগ্রসর শ্রেণী উন্নয়ন মন্ত্রী গৌরীশঙ্কর ঘোষ।
আগমনী ইউসিসি বিলের ইঙ্গিত
এই অধিবেশনে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউসিসি বিল পেশ করা না হলেও সরকার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছে যে বিষয়টি দ্রুত এগোচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ইউসিসি বিল আনা হবে এবং তা কার্যকর করা হবে।
তিনি বলেন, আসাম, গুজরাট এবং উত্তরাখণ্ডের অভিন্ন দেওয়ানি বিধিকে ভিত্তি ধরে পশ্চিমবঙ্গেও একই ধরনের বিল আনা হবে। তাঁর ভাষায়, “এই রাজ্যে একটিই আইন চলবে, ধর্মের ভিত্তিতে দুটো আইন চলবে না।”
ইউসিসি বিলের রূপরেখা ঠিক করতে সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি রঞ্জনা দেশাইয়ের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে আগামী আগস্ট মাসে বিধানসভায় বিল পেশের কথা রয়েছে।
রাজনৈতিক তাৎপর্য
একই দিনে একাধিক কঠোর আইন পাস ও ভবিষ্যৎ সংস্কারের ঘোষণা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন বার্তা দিচ্ছে। একদিকে সরকার আইনশৃঙ্খলা ও দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর হতে চাইছে, অন্যদিকে সংরক্ষণ ও পারিবারিক আইন নিয়েও বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সব মিলিয়ে, বিধানসভার এই অধিবেশন পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক দিকনির্দেশনায় এক নতুন মোড় এনে দিয়েছে। বিরোধীরা এটিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের আশঙ্কা করলেও সরকার বলছে, এটি জনশৃঙ্খলা, ন্যায়বিচার ও প্রশাসনিক কঠোরতার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।
ঘটনাপঞ্জি
সোমবার, ২৯ জুন: বিধানসভায় ‘গুন্ডা দমন বিল’ ও ওবিসি সংশোধনী বিল উত্থাপন।
কণ্ঠভোটে পাস: বিলের পক্ষে ১৭৬, বিপক্ষে ৪১, বিরত ২০।
২ জুলাই: ইউসিসি বিলের খসড়া মন্ত্রিসভায় আনার প্রস্তুতির ঘোষণা।
আগস্ট: ইউসিসি বিল বিধানসভায় তোলার পরিকল্পনা।
এরপর কী হতে পারে
আসন্ন সপ্তাহগুলোতে সবচেয়ে বেশি নজর থাকবে ইউসিসি বিলের খসড়ার দিকে। পাশাপাশি নতুন ‘গুন্ডা দমন’ আইনের বাস্তব প্রয়োগ কীভাবে হয়, তা নিয়েও রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক বাড়তে পারে। বিরোধীদের অভিযোগ, এ ধরনের ক্ষমতা অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে সরকার চাইছে আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নে কঠোর বার্তা দিতে।
📌 তথ্যসূত্র: বিধানসভায় উত্থাপিত বিল, সরকারি ও বিরোধী পক্ষের বক্তব্য, এবং অধিবেশনে প্রকাশিত আনুষ্ঠানিক ঘোষণা।



