আইএসপিআর বলছে জ্বালানি সাশ্রয়ের প্রশাসনিক পদক্ষেপ, তবে সামাজিক মাধ্যমে প্রশ্ন—রাষ্ট্রীয় স্মৃতির প্রতীককে কি শুধুই খরচের হিসাব দিয়ে দেখা যায়?
ঢাকার সেনানিবাসে অবস্থিত মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ‘শিখা অনির্বাণ’ সার্বক্ষণিকভাবে না জ্বালিয়ে রাখার সরকারি সিদ্ধান্ত ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। কেউ এটিকে সরকারের স্বাভাবিক ব্যয়সংকোচন নীতির অংশ হিসেবে দেখছেন, আবার অনেকে প্রশ্ন তুলছেন—এটি কি শুধু জ্বালানি সাশ্রয়ের বিষয়, নাকি এর পেছনে আরও কোনো প্রতীকী বা আদর্শিক বার্তা রয়েছে?
আইএসপিআরের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতির প্রভাব বিবেচনায় সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয় কর্মসূচির অংশ হিসেবেই গত ২ মে থেকে শিখা অনির্বাণ সার্বক্ষণিকভাবে জ্বালিয়ে না রাখার সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে। তবে জাতীয় দিবস, রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধা নিবেদন এবং সামরিক আনুষ্ঠানিকতার সময় এটি আগের মতোই প্রজ্বলিত থাকবে।
তবে সরকারি ব্যাখ্যা আসার পরও বিতর্ক থামেনি; বরং নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—কারণ শিখা অনির্বাণ সাধারণ অবকাঠামো নয়, এটি মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর বীরত্ব ও আত্মত্যাগের একটি রাষ্ট্রীয় প্রতীক।
সামাজিক মাধ্যমে তোলপাড়
শিখা অনির্বাণ নিভিয়ে রাখার বিষয়টি প্রথমে সামাজিক মাধ্যমে আলোচনায় আসে। এরপর বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে এ নিয়ে হাজারো মন্তব্য, বিশ্লেষণ ও মতামত ছড়িয়ে পড়ে।
অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, রাষ্ট্রীয় স্মৃতি ও জাতীয় প্রতীককে কি সাধারণ আর্থিক ব্যয়ের মাপকাঠিতে বিচার করা যায়?
একটি বহুল আলোচিত সামাজিক মাধ্যম পোস্টে লেখা হয়েছে:
“কী এমন হলো যে হঠাৎ নীরবে নিভিয়ে দেওয়া হলো মুক্তিযুদ্ধে সেনাবাহিনীর বীরত্ব ও ত্যাগের প্রতীক শিখা অনির্বাণ?”
পোস্টে আরও বলা হয়:
“বস্তুগতভাবে দেখলে এটি অপচয়ই বটে। গ্যাস জ্বলছে, রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে, জায়গা ব্যবহার হচ্ছে। একইভাবে শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধ বা জাতীয় স্মারকগুলোকেও তাহলে ভূমি ও অর্থের অপচয় বলা যায়। কিন্তু বিষয়টা যখন স্মৃতি, প্রতীক ও আবেগের জায়গা—তখন শুধু ব্যয়সংকোচনের যুক্তি কতটা খাটে?”
রাষ্ট্রের সবকিছু কি অর্থ দিয়ে মাপা যায়?
বিশ্লেষকদের মতে, বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মূলত এই প্রশ্নটিই।
একটি রাষ্ট্র কেবল প্রশাসনিক কাঠামো নয়; এটি একই সঙ্গে ইতিহাস, স্মৃতি ও প্রতীকেরও সমষ্টি। ফলে এমন অনেক স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান থাকে, যেগুলোর মূল্য অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির হিসাব দিয়ে নির্ধারণ করা হয় না।
শহীদ মিনার, জাতীয় স্মৃতিসৌধ, স্বাধীনতা স্তম্ভ কিংবা মুক্তিযুদ্ধের স্মারকগুলো সরাসরি কোনো আর্থিক আয় সৃষ্টি না করলেও সেগুলো জাতির পরিচয়, ইতিহাস ও আবেগের অংশ।
অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, এসবের রয়েছে “Symbolic National Value” বা প্রতীকী জাতীয় মূল্য—যা আর্থিক লাভ-লোকসানের বাইরে অবস্থান করে।
প্রশ্ন উঠছে—যদি ব্যয় কমানোই লক্ষ্য হয়, তাহলে কি একইভাবে অন্যান্য রাষ্ট্রীয় খাতের ব্যয়ও পুনর্বিবেচনা করা উচিত?
বিতর্কের আরেকটি দিক
সামাজিক মাধ্যমে আরও একটি আলোচনার বিষয় সামনে এসেছে।
দীর্ঘদিন ধরে একটি Kushti ষ্ঠীর পক্ষ থেকে শিখা অনির্বাণকে “অগ্নিপূজা” বা “শিরক” হিসেবে আখ্যা দিয়ে এর বিরোধিতা করার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একই ধরনের বক্তব্য শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া নিয়েও অতীতে দেখা গেছে।
যদিও সরকার বা আইএসপিআরের বক্তব্যে এ ধরনের কোনো কারণের ইঙ্গিত নেই, তবুও সামাজিক মাধ্যমে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন:
“তাহলে কি দীর্ঘদিনের এসব দাবির কোনো প্রতিফলন দেখা গেল?”
তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি বা যাচাইযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে এটিকে আপাতত জনমতের অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
ইতিহাসের এক প্রতীক
শিখা অনির্বাণ উদ্বোধন করা হয়েছিল ১৯৭৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর। যুদ্ধ-পরবর্তী কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও দুর্ভিক্ষের সময়েও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান (বীর উত্তম) এটি উদ্বোধন করেন।
এরপর থেকে এটি শুধু সামরিক ঐতিহ্যের নয়, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে ওঠে।
এ কারণেই অনেকের কাছে প্রশ্নটি আরও প্রতীকী হয়ে উঠেছে:
“যে শিখা প্রায় পাঁচ দশক ধরে জ্বলেছে, সেটি ব্যয়সংকোচনের যুক্তিতে নিভে গেলে—দেশের ভেতরে ও বাইরে কী বার্তা যায়?”
সরকারের অবস্থান
আইএসপিআর বলছে, এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা স্মৃতির কোনো সম্পর্ক নেই।
তাদের বক্তব্য:
“বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, শহীদদের আত্মত্যাগ এবং জাতীয় ইতিহাসের মর্যাদা রক্ষায় সবসময় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। শিখা অনির্বাণ আগের মতোই গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে সম্মানিত থাকবে।”
বিশ্লেষণ: ব্যয়সংকোচন বনাম রাষ্ট্রীয় প্রতীক
এই বিতর্কের চূড়ান্ত উত্তর হয়তো এখনই পাওয়া যাবে না। কারণ বিষয়টি কেবল জ্বালানি সাশ্রয়ের নয়; এটি জাতীয় প্রতীকের গুরুত্ব, রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার এবং জনগণের আবেগ—সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে।
ব্যয় কমানো রাষ্ট্রের দায়িত্ব হতে পারে। কিন্তু একটি জাতির স্মৃতি ও প্রতীক—বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত প্রতীক—কতটা অর্থনৈতিক যুক্তিতে পরিচালিত হবে, সেই প্রশ্ন এখন নতুন করে সামনে এসেছে।
এবং সম্ভবত বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি এখানেই:
রাষ্ট্রের কিছু বিষয় আছে, যেগুলোকে কেবল টাকার অঙ্ক দিয়ে নয়—জাতির স্মৃতি, ইতিহাস ও চেতনার আলোয়ও দেখতে হয়।



