Homeটুডে নেশন'তুরাগে ‘হত্যাকাণ্ড’ নাকি বিভ্রান্তিকর প্রচারণা? ঘটনাপ্রবাহ, দাবি ও পাল্টা দাবি বিশ্লেষণ

‘তুরাগে ‘হত্যাকাণ্ড’ নাকি বিভ্রান্তিকর প্রচারণা? ঘটনাপ্রবাহ, দাবি ও পাল্টা দাবি বিশ্লেষণ

আ.লীগের অনলাইন ক্যাম্পেইনে ৭ জন নিহতের দাবি; পুলিশ ও গোয়েন্দা প্রতিবেদনে মিলেছে ২ জনের মৃত্যুর তথ্য — পালাতে গিয়ে নদীতে ডুবে

ঢাকা | ২৭ জুন ২০২৬

গত ২২ জুন আশুলিয়ার তুরাগ নদীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পুলিশ দেখে ট্রলার নিয়ে পালানোর চেষ্টার পর দুজন নদীতে ডুবে মারা গেছেন — এটি গোয়েন্দা প্রতিবেদন এবং পুলিশের বক্তব্যে উঠে এসেছে। কিন্তু এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো ‘৪ লাশ উদ্ধার, ৭ জন নিহত, বিএনপি-পুলিশের যৌথ হত্যাকাণ্ড’ দাবিতে ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছে — যার বেশিরভাগ দাবিই স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য নয় এবং একাধিক প্রকাশিত ভিডিও সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘটনার।

আসলে কী ঘটেছিল

২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সারাদেশে কর্মসূচির প্রস্তুতিমূলক ভিডিও ২১ জুন থেকে অনলাইনে ছড়াতে শুরু করলে পুলিশ বিভিন্ন এলাকায় টহল জোরদার করে।

একটি গোয়েন্দা সংস্থার অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২২ জুন বিকেল আনুমানিক ২টা ৩০ মিনিট থেকে ৩টার মধ্যে তুরাগ থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শফিকুল ইসলাম শফিকের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ২৫-৩০ জন নেতাকর্মী নৌকায় করে আশুলিয়ার রুস্তমপুর ঘাট থেকে আশুলিয়া বাজার ঘাটে মিছিলের উদ্দেশ্যে আসেন। ঘাটে পৌঁছে নামার সময় দায়িত্বরত পুলিশ তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে ধাওয়া করে। আতঙ্কিত হয়ে তারা দ্রুত নৌকায় ফিরে পালানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু নোঙর তোলার সুযোগ না পেয়ে অনেকে নদীতে ঝাঁপ দেন।

পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে সাতজনকে গ্রেপ্তার করে। তবে তীব্র স্রোতের কারণে দুজন পানিতে তলিয়ে যান — যা তাৎক্ষণিকভাবে কেউ জানতে পারেনি। পরে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

আশুলিয়া থানার ওসি তরিকুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন, বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে পানিতে পড়ে কারো মারা যাওয়ার ঘটনা তাৎক্ষণিকভাবে তাদের জানা ছিল না বলে জানান তিনি।

যে দুজনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দুজনের পরিচয় উল্লেখ করা হয়েছে:

১. সুমন — তুরাগ, ঢাকা। বয়স ১৭। তুরাগ থানাধীন রানাভোলা এলাকার শাহ আলমের ছেলে, স্থানীয় আড়তে শ্রমিক। পুলিশের বরাতে জানা গেছে, সুমন সাঁতার জানতেন না।

২. মো. আরিফুল ইসলাম — পিতা আব্দুল হাই, গ্রাম আরিজর হরিশ্বর, কাউনিয়া, রংপুর।

তদন্তকারী সংবাদমাধ্যম দ্য ডিসেন্ট সুমনের ফেসবুক প্রোফাইল বিশ্লেষণ করে দেখেছে, তিনি নিয়মিত আওয়ামী লীগের পক্ষে লেখালেখি করতেন এবং সম্প্রতি দলীয় ব্যানারে মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন। ট্রলারে শপথ গ্রহণের একটি ভিডিওতে সুমনকে হাত তুলে শপথ নিতে দেখা গেছে, যা ২১ অথবা ২২ জুন দুপুরের আগে ধারণকৃত।

🔎 দাবি বনাম যাচাইকৃত তথ্য

যা দাবি করা হচ্ছেযা যাচাইয়ে পাওয়া গেছে
৭ জন নিহত২ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত (সুমন ও আরিফ)
৪টি লাশ উদ্ধার১টি লাশ উদ্ধার (সুমন); অন্যের উদ্ধারের কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই
বিএনপি-পুলিশের যৌথ হামলাপুলিশ ও গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বিএনপির সম্পৃক্ততার উল্লেখ নেই
পুলিশ নদীতে ফেলে দিয়েছেনিষিদ্ধ কর্মসূচি পালনকালে পুলিশ দেখে পালাতে গিয়ে নিজেরাই নদীতে ঝাঁপ দেন
পরিবারকে চাপ দেওয়া হচ্ছেএখনো স্বাধীনভাবে যাচাই সম্ভব হয়নি

ছড়ানো হচ্ছে ভুয়া ভিডিও ও এআই কনটেন্ট

আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পেজ ও অ্যাকাউন্ট থেকে ‘তুরাগ হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ’ হিসেবে একাধিক ভিডিও ছড়ানো হচ্ছে, যেগুলো তদন্তে সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘটনার বলে প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:

সুনামগঞ্জের গোলাপগঞ্জে সুরমা নদীতে ‘অজ্ঞাত ব্যক্তির লাশের’ একটি ভিডিওকে তুরাগ নদীতে সুমনের লাশ বলে প্রচার করা হয়েছে। এছাড়া আটটির বেশি নিথর দেহ দেখানো একটি ভিডিওকে ‘ছাত্রলীগ কর্মীদের লাশ’ বলে দাবি করা হচ্ছে — যার মূল উৎস শনাক্ত করা যায়নি, তবে এটি স্পষ্টতই ভিন্ন ঘটনার।

ডাকসু ভিপি প্রার্থী শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি এআই-জেনারেটেড একটি ছবি শেয়ার করে এই প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন।

সজীব ওয়াজেদ জয়ের অভিযোগ

সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছেন, ঘটনা ধামাচাপা দিতে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং নিহতদের পরিবারকে ‘হত্যা মামলার’ বদলে ‘অপমৃত্যু মামলা’ দায়ের করতে চাপ দেওয়া হচ্ছে। তবে এই দাবিগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে দ্য ডিসেন্টের সঙ্গে কথা বলা শেখ হাসিনা সরকারের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিজেও স্বীকার করেছেন, সুমন ছাড়া অন্যদের লাশ উদ্ধারের তথ্য তার কাছে নেই এবং যা তিনি শেয়ার করেছেন তা “স্থানীয় সূত্র থেকে শোনা, সত্য কিনা আমি নিজেও জানি না।”

গোয়েন্দা প্রতিবেদন স্পষ্ট জানিয়েছে, মাঠপর্যায়ে তদন্ত, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে দুজনের বাইরে অতিরিক্ত কোনো মৃত্যু বা নিখোঁজের নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।

সূত্র: দ্য ডিসেন্ট অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, আশুলিয়া থানা পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থার অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত তথ্য (যাচাইকৃত ও অযাচাইকৃত)

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments