বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার ধরন এক দেশে এক রকম, আরেক দেশে আরেক রকম। কোথাও প্রধান নির্বাহীকে বলা হয় উপাচার্য, কোথাও প্রেসিডেন্ট, কোথাও রেক্টর। আবার কোথাও একাডেমিক নেতৃত্ব আর প্রশাসনিক নেতৃত্ব আলাদা দুটি স্তরে বিভক্ত। এই পার্থক্য শুধু পদবীর নয়; বরং বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে চলে, কে সিদ্ধান্ত নেয়, শিক্ষক নিয়োগ কীভাবে হয়, গবেষণাকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়—এসবেরই প্রতিফলন।
কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোতে যেমন বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাজ্য বা অস্ট্রেলিয়ায় আমরা সাধারণত চ্যান্সেলর–ভাইস-চ্যান্সেলর কাঠামো দেখি। এখানে চ্যান্সেলর অনেক সময় আনুষ্ঠানিক বা অলঙ্কারিক প্রধান, আর উপাচার্যই প্রকৃত প্রশাসনিক ও একাডেমিক নেতৃত্ব দেন। কিন্তু কমনওয়েলথের বাইরে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা এবং বহু এশীয় দেশে এই কাঠামো ভিন্ন। কোথাও করপোরেট ধাঁচের গভর্ন্যান্স, কোথাও নির্বাচিত একাডেমিক নেতৃত্ব, কোথাও আবার মন্ত্রণালয়-নির্ভর নিয়ন্ত্রণ বেশি শক্তিশালী।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রধানের পদবী কেন আলাদা?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা: প্রেসিডেন্ট–প্রোভোস্ট মডেল
যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নির্বাহী প্রধান সাধারণত President। তাঁর দায়িত্ব শুধু একাডেমিক নয়; বরং প্রতিষ্ঠানের আর্থিক পরিকল্পনা, তহবিল সংগ্রহ, ট্রাস্টি বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয়, করপোরেট অংশীদারত্ব, নীতিগত দিকনির্দেশনা এবং জনসংযোগ—সবই তাঁর পরিধিতে পড়ে।
এর ঠিক নিচে থাকেন Provost। প্রোভোস্ট মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক প্রধান। শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি, পাঠ্যক্রম, গবেষণা নীতি, ডিনদের সমন্বয়, বিভাগীয় পরিকল্পনা—এসব বিষয়ে তাঁর ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কমনওয়েলথভুক্ত দেশে যে কাজগুলো উপাচার্য বা প্রো-ভিসি কাঠামোর মধ্যে ভাগ হয়ে থাকে, আমেরিকায় সেগুলোর কেন্দ্রীয় একাডেমিক দায়িত্ব অনেকটাই প্রোভোস্ট সামলান।
মাল্টি-ক্যাম্পাস বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থায় আবার পদবী কিছুটা বদলে যায়। যেমন কোনো কোনো স্টেট সিস্টেমে সিস্টেম-হেডকে চ্যান্সেলর বলা হয়, আর আলাদা ক্যাম্পাসের প্রধানকে প্রেসিডেন্ট বা কখনো চ্যান্সেলরও বলা হয়। অর্থাৎ একই শব্দ, কিন্তু প্রশাসনিক স্তর ভেদে ভিন্ন অর্থ।
মহাদেশীয় ইউরোপ: রেক্টর মডেল
জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ইতালি, স্পেন বা ফ্রান্সের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ পদবী হিসেবে Rector বেশি প্রচলিত। ঐতিহ্যগতভাবে এটি একাডেমিক মর্যাদাসম্পন্ন পদ। অনেক ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনের মাধ্যমে বা সিনেট/কাউন্সিলের সিদ্ধান্তে রেক্টর নির্বাচন করা হয়। ইউরোপীয় মডেলে বিশ্ববিদ্যালয় তুলনামূলকভাবে একাডেমিক স্বায়ত্তশাসনের ওপর বেশি নির্ভরশীল।
লাতিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্য
ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, মেক্সিকোর মতো দেশে Rector পদবী বহুল ব্যবহৃত। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় মার্কিন মডেল অনুসরণ করে President পদ ব্যবহার করে। আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় বা বিদেশি ক্যাম্পাসগুলোতেও এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়।
বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার তিনটি বড় মডেল
বিশ্ববিদ্যালয় গভর্ন্যান্সকে মোটামুটি তিনটি বড় ধারায় বোঝা যায়।
১. আমেরিকান/করপোরেট ধাঁচ
এখানে বোর্ড অব ট্রাস্টিজ বা বোর্ড অব রিজেন্টস সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক শক্তি। প্রেসিডেন্ট প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন, আর প্রোভোস্ট একাডেমিক বিষয় সামলান। এই কাঠামোতে জবাবদিহি, ফান্ডরেইজিং, র্যাংকিং, আউটকাম-ভিত্তিক পারফরম্যান্স এবং গবেষণা আয়ে বেশি জোর থাকে।
২. কমনওয়েলথ ধাঁচ
এখানে চ্যান্সেলর থাকেন আনুষ্ঠানিক প্রধান। উপাচার্যই কার্যত বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বময় প্রশাসনিক ও একাডেমিক নেতৃত্ব দেন। সিন্ডিকেট, সিনেট, একাডেমিক কাউন্সিল—এসব বডির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয়। তবে বাস্তবে বহু দেশে উপাচার্য নিয়োগ রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে পুরোপুরি থাকতে পারে না।
৩. ইউরোপীয়-রাষ্ট্রনির্ভর ধাঁচ
এখানে রাষ্ট্র ও মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা তুলনামূলক বেশি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক স্বাধীনতা বজায় রাখার চেষ্টা থাকে। রেক্টর বা প্রেসিডেন্ট থাকলেও সিদ্ধান্তের একটি বড় অংশ আইন, নিয়মনীতির ও একাডেমিক কনসেনসাসের মধ্যে পড়ে।
শিক্ষক নিয়োগ: ‘সিনিয়রিটি’ নয়, ‘ইমপ্যাক্ট’
বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার মতো শিক্ষক নিয়োগেও অঞ্চলভেদে ভিন্নতা আছে। তবে বিশ্বজুড়ে এক বিষয় ক্রমেই স্পষ্ট হয়েছে—শুধু চাকরির মেয়াদ, বয়স বা সিনিয়রিটি দিয়ে আর শিক্ষক মূল্যায়ন হয় না। এখন বেশি গুরুত্ব পায় গবেষণার প্রভাব, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা, সাইটেশন, গবেষণা অনুদান, টিচিং ইফেক্টিভনেস এবং বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা।
উত্তর আমেরিকান টেনিউর ট্র্যাক
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় শিক্ষকতার শুরু হয় সাধারণত Assistant Professor পদ দিয়ে। এটি একটি টেনিউর-ট্র্যাক পদ। অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়, সাধারণত ৫ থেকে ৭ বছরের কঠোর পরীক্ষামূলক পর্যায় শেষে প্রার্থীকে স্থায়ী নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
এর পরের ধাপ Associate Professor। টেনিউর পেলে এই পদে উন্নীত হওয়া যায়। টেনিউর না পেলে অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়তে হয়।
সবশেষে Full Professor বা পূর্ণ অধ্যাপক। এটি সাধারণত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গবেষণা, নেতৃত্ব এবং একাডেমিক অবদানের ভিত্তিতে দেওয়া হয়।
ব্রিটিশ ও কমনওয়েলথ কাঠামো
যুক্তরাজ্য ও কমনওয়েলথ দেশগুলোতে পদবী একটু ভিন্নভাবে সাজানো হয়। সাধারণ কাঠামো হলো—
- Lecturer / প্রভাষক
- Senior Lecturer / সহকারী অধ্যাপক বা জ্যেষ্ঠ প্রভাষক
- Reader / সহযোগী অধ্যাপক সমতুল্য উচ্চতর গবেষণাধর্মী পদ
- Professor / অধ্যাপক
এই ব্যবস্থায় এক বিভাগের প্রফেসরের সংখ্যা সীমিত থাকতে পারে। কারণ প্রফেসরশিপকে প্রায়ই একটি বিশেষ চেয়ার বা মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান হিসেবে দেখা হয়।
নিয়োগ প্রক্রিয়া: সার্চ কমিটি, জব টক, ডেমো ক্লাস
উন্নত বিশ্বে শিক্ষক নিয়োগ অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক, স্বচ্ছ এবং আন্তর্জাতিক। একটি পদের বিপরীতে শত শত আবেদন জমা পড়া অস্বাভাবিক নয়। এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে Search Committee।
সার্চ কমিটি সাধারণত প্রার্থীদের—
- একাডেমিক যোগ্যতা
- প্রকাশনা
- গবেষণার মান
- আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক
- পাঠদানের সক্ষমতা
- তহবিল আনার সম্ভাবনা
এসব দেখে সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করে।
এরপর নির্বাচিত প্রার্থীদের Job Talk-এ অংশ নিতে হয়। তাঁরা ফ্যাকাল্টি, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের সামনে নিজের গবেষণা উপস্থাপন করেন, প্রশ্নের উত্তর দেন, অনেক ক্ষেত্রে Teaching Demo বা ক্লাসও নিতে হয়। এতে শুধু কাগজে দক্ষতা নয়, বাস্তবে ভাবনা প্রকাশের ক্ষমতা, শিক্ষার্থীর সঙ্গে সংযোগ ও গবেষণা ভাষা বোঝার দক্ষতা যাচাই হয়।
গবেষণা মানদণ্ড: শুধু পেপার নয়, পেপারের প্রভাব
আজকের বিশ্ববিদ্যালয় দুনিয়ায় প্রার্থীর প্রকাশনার সংখ্যা শুধু দেখে নিয়োগ হয় না। দেখা হয়—
- Scopus বা Web of Science-এ প্রকাশিত কি না
- জার্নালের মান কী
- h-index কত
- সাইটেশন কত
- গবেষণা অনুদান আনার ক্ষমতা আছে কি না
- বিষয়ভিত্তিক নতুনত্ব কতটা
অর্থাৎ, গবেষণার পরিমাণ নয়, প্রভাব এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণেই আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমন শিক্ষককে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, যিনি শুধু ক্লাস নেন না, বরং গবেষণা, অনুদান, নীতিপ্রণয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় অবদান রাখতে পারেন।
কমনওয়েলথের বাইরে কেন ব্যবস্থা তুলনামূলক বেশি করপোরেট?
যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে বিশ্ববিদ্যালয় অনেকটা একটি বড় প্রতিষ্ঠান হিসেবে চালিত হয়। সেখানে প্রেসিডেন্টের ভূমিকা কেবল একাডেমিক নয়, ব্যবসায়িক ও কৌশলগতও। ট্রাস্টি বোর্ড, অ্যালামনাই, দাতা, গবেষণা ফাউন্ডেশন, করপোরেট পার্টনার—সবাই এই ব্যবস্থার অংশ।
ফলে বিশ্ববিদ্যালয় সেখানে শুধু শিক্ষাদানের জায়গা নয়; এটি গবেষণা, উদ্ভাবন, ইন্ডাস্ট্রি-লিংকেজ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি শক্তিশালী কেন্দ্র।
অন্যদিকে কমনওয়েলথভুক্ত বহু দেশে বিশ্ববিদ্যালয় এখনো কিছুটা সরকারি বা আধা-সরকারি কাঠামোর ভেতর পরিচালিত হয়। এতে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বাড়ে, কিন্তু একাডেমিক স্বায়ত্তশাসন সবসময় সমান শক্তিশালী থাকে না। উপাচার্য নিয়োগ, প্রো-ভিসি কাঠামো, বোর্ডের ভূমিকা—এসব নিয়ে প্রায়ই রাজনীতি, আমলাতন্ত্র ও একাডেমিক স্বার্থের সংঘাত দেখা যায়।
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয় কী?
বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার কাঠামোতে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে কয়েকটি বিষয় শেখার আছে।
প্রথমত, নিয়োগকে আরও স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, গবেষণাভিত্তিক মূল্যায়নকে গুরুত্ব দিতে হবে।
তৃতীয়ত, উপাচার্য ও শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব যতটা সম্ভব কমাতে হবে।
চতুর্থত, প্রোভোস্ট, ডিন, বিভাগীয় প্রধান ও অন্যান্য একাডেমিক নেতৃত্বের দায়িত্ব স্পষ্টভাবে পৃথক করতে হবে।
পঞ্চমত, বোর্ড, সিনেট ও একাডেমিক কাউন্সিলকে কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে।
কারণ বিশ্বজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল শক্তি এখন কেবল ভবনের সংখ্যা বা ছাত্রের পরিমাণ নয়। মূল শক্তি হলো—কতটা ভালো শিক্ষক আছেন, গবেষণা কতটা শক্তিশালী, এবং প্রতিষ্ঠানটি কতটা স্বাধীনভাবে জ্ঞান তৈরি করতে পারছে।
উপসংহার
বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার এই ভিন্ন ভিন্ন মডেল আসলে একেকটি দেশের জ্ঞানচর্চা, রাষ্ট্রচিন্তা এবং প্রশাসনিক সংস্কৃতির প্রতিফলন। কোথাও উপাচার্য, কোথাও প্রেসিডেন্ট, কোথাও রেক্টর—নাম আলাদা হলেও প্রশ্ন একটাই: বিশ্ববিদ্যালয় কি সত্যিই জ্ঞান উৎপাদনের স্বাধীন, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান হতে পারছে?
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ এখন আর শুধু পদবীর ওপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে কে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, কীভাবে নিয়োগ হচ্ছে, এবং গবেষণাকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে তার ওপর।



