Homeটুডে বাংলারামগঞ্জে স্কুলছাত্র মেহেদীর মৃত্যু: অধ্যক্ষসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা

রামগঞ্জে স্কুলছাত্র মেহেদীর মৃত্যু: অধ্যক্ষসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা

আইফোন চুরির অপবাদে কনিষ্ঠ শিক্ষার্থীকে আবাসিক হলে নির্যাতনের অভিযোগ; সুষ্ঠু তদন্তের দাবিতে সোচ্চার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম

রামগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর | ২০ জুন ২০২৬

লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার ফরিদ আহমেদ ভূইয়া একাডেমির আবাসিক হল থেকে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান (১৪)-এর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় নিহতের পিতা বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ, দ্বাদশ শ্রেণির সাতজন শিক্ষার্থী এবং অজ্ঞাত আরও ৯–১০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আবাসিক ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, বুলিং ও সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্কের সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।

কী ঘটেছে

মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত ১৬ জুন সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটের দিকে মেহেদীর বাবা জিয়াউদ্দিন একটি অজ্ঞাত নম্বর থেকে ফোন পান। ফোনে জানানো হয়, তাঁর ছেলে গুরুতর অসুস্থ এবং দ্রুত স্কুলে আসতে হবে।

জিয়াউদ্দিন ঢাকায় অবস্থান করায় তিনি পরিবারের সদস্যদের দ্রুত স্কুলে যেতে বলেন। পরে স্বজনরা স্কুলে গিয়ে জানতে পারেন, মেহেদীকে চাটখিল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়েছে। সেখানে গিয়ে তাঁরা মেহেদীর মৃতদেহ দেখতে পান।

পরে রামগঞ্জ থানা পুলিশ চাটখিল থানা পুলিশের সহায়তায় মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।

​📅 ঘটনাক্রম

  • ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ: মেহেদী হাসান ফরিদ আহমেদ ভূইয়া একাডেমিতে ভর্তি হয়ে আবাসিক হলের ছাত্র হিসেবে অবস্থান শুরু করে।
  • ঘটনার কয়েকদিন আগে: দ্বাদশ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর একটি আইফোন চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে মেহেদী হাসানসহ কয়েকজন কনিষ্ঠ শিক্ষার্থীকে অভিযুক্ত করে জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থীরা বেদম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়।
  • হত্যাকাণ্ডের পূর্ববর্তী ধাপ: নির্যাতনের বিষয়ে ভুক্তভোগী মেহেদী হাসান বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষকে লিখিতভাবে জানালেও প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। উল্টো অধ্যক্ষের কাছে অভিযোগ দেওয়ার অপরাধে দ্বাদশ শ্রেণির অভিযুক্ত শিক্ষার্থীরা তাকে আবারও মারধর ও মানসিক নির্যাতন করে।
  • ১৬ জুন ২০২৬ (সন্ধ্যা ৭:৪০ মিনিট): অজ্ঞাত একটি মোবাইল নম্বর থেকে মেহেদীর পিতা জিয়াউদ্দিনকে ফোন করে জানানো হয় তাঁর ছেলে মারাত্মক অসুস্থ। তিনি ঢাকায় থাকায় তাঁর স্ত্রী শারমিন আক্তারসহ আত্মীয়দের দ্রুত স্কুলে পাঠান।
  • ১৬ জুন ২০২৬ (রাত): স্বজনরা স্কুলে গিয়ে জানতে পারেন মেহেদীকে চাটখিল সরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে চাটখিল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে তাঁরা মেহেদীর মৃতদেহ দেখতে পান। পরে রামগঞ্জ থানা পুলিশ চাটখিল পুলিশের সহায়তায় লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।

মামলায় যেসব অভিযোগ

বাদীর এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে যে, আবাসিক হলের কিছু জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন ধরে কনিষ্ঠ শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিকভাবে হয়রানি করতেন।

এজাহারে আরও বলা হয়, ঘটনার কয়েকদিন আগে দ্বাদশ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর আইফোন হারানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে মেহেদী হাসানসহ কয়েকজনকে সন্দেহ করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই ঘটনায় তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছিল।

বাদীর দাবি, বিষয়টি স্কুল কর্তৃপক্ষকে লিখিত ও মৌখিকভাবে জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

তবে এসব অভিযোগ বর্তমানে তদন্তাধীন এবং আদালতে প্রমাণিত হয়নি।

পুলিশ কী বলছে

রামগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. ফিরোজ উদ্দিন চৌধুরী জানিয়েছেন:

“খবর পাওয়ার পর আমরা মৃতদেহ উদ্ধার করি এবং ময়নাতদন্তের জন্য পাঠাই। ময়নাতদন্তের রিপোর্টের অপেক্ষায় আছি। তদন্তের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

মামলার বর্তমান অবস্থা

নিহতের পিতা জিয়াউদ্দিন বাদী হয়ে বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ খন্দকার আবদুল মান্নানসহ সাত শিক্ষার্থীর নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরও ৯–১০ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।

তদন্ত সংস্থা এখন ঘটনার প্রকৃতি, অভিযোগের সত্যতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা যাচাই করছে।

কোন বিষয়গুলো এখনো নিশ্চিত নয়

বর্তমানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া বাকি রয়েছে:

• মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ
• অভিযোগকৃত নির্যাতনের প্রকৃতি ও মাত্রা
• অভিযোগ ও মৃত্যুর মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক
• অভিযুক্তদের প্রকৃত সম্পৃক্ততা

বৃহত্তর প্রশ্ন

এই ঘটনাটি একটি পরিবারের ব্যক্তিগত শোকের বাইরে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা কতটা নিরাপদ?

অনেক অভিভাবক মনে করছেন, যদি শিক্ষার্থীদের অভিযোগ দ্রুত গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করা হয় এবং বুলিং বা নির্যাতনের বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তাহলে অনেক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব হতে পারে।

উপসংহার

মেহেদী হাসানের মৃত্যু নিয়ে বর্তমানে জনমনে প্রশ্ন, উদ্বেগ ও শোক—সবই রয়েছে। তবে তদন্ত সম্পন্ন হওয়ার আগে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ঘটনার একটি নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও দ্রুত তদন্ত নিশ্চিত করা এবং তদন্তে যাদের দায় প্রমাণিত হবে, তাদের আইনের আওতায় আনা।

​📌 তথ্যসূত্র

  • ​রামগঞ্জ থানা পুলিশ ও চাটখিল থানা পুলিশের প্রাথমিক সুরতহাল রেকর্ড।
  • ​মামলার বাদী জিয়া উদ্দিনের দায়েরকৃত অফিসিয়াল এজাহার (১৬ জুন ২০২৬)।
  • ​রামগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ ফিরোজ উদ্দিন চৌধুরীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments