Homeটুডে ওয়ার্ল্ডপ্যাট্রিস লুমুম্বা এবং কঙ্গোর অন্তহীন ক্রন্দন: একটি সোনা বাঁধানো দাঁত ও উপনিবেশ-উত্তর...

প্যাট্রিস লুমুম্বা এবং কঙ্গোর অন্তহীন ক্রন্দন: একটি সোনা বাঁধানো দাঁত ও উপনিবেশ-উত্তর বিশ্বের অসমাপ্ত মুক্তির ইতিহাস

বিশেষ প্রতিবেদন | ১৯ জুন, ২০২৬

“আমরা ভুলাতে পারি না সেইসব উপহাস, চাবুকের আঘাত, অপমান আর আমাদের ভাইদের হাত কেটে নেওয়ার সেইসব ক্ষতকে… আমাদের এই স্বাধীনতা বেলজিয়ামের দয়ায় মেলেনি, এটি আমরা লড়াই করে, রক্ত দিয়ে অর্জন করেছি।”
প্যাট্রিস লুমুম্বা (৩০ জুন, ১৯৬০)

ঢাকা শহর যখন প্রতিদিন সকালে তীব্র কোলাহলে জেগে ওঠে, কিংবা পৃথিবীর কোনো প্রান্তে যখন কেউ একটি আধুনিক স্মার্টফোন বা বৈদ্যুতিক গাড়ির স্ক্রিনে আঙুল ছোঁয়ায়—তখন আফ্রিকার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত একটি বিশাল দেশ নিঃশব্দে রক্তক্ষরণ সইতে থাকে। দেশটার নাম ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো (DRC)।
বিশ্ব ইতিহাসে এমন কিছু ট্র্যাজেডি থাকে যা কখনো পুরনো হয় না। আজ থেকে প্রায় সাড়ে ছয় দশক আগে, ১৯৬১ সালের এক শীতের রাতে আফ্রিকার বুকে নিভে গিয়েছিল এক উজ্জ্বল নক্ষত্র—প্যাট্রিস লুমুম্বা। কঙ্গোর প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত এই প্রধানমন্ত্রীকে কেবল হত্যাই করা হয়নি, তাঁর শরীরকে এসিডে গলিয়ে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু ২০২২ সালে বেলজিয়াম যখন লুমুম্বার পরিবারের কাছে তাঁর দেহাবশেষ হিসেবে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া একটি ‘সোনা বাঁধানো দাঁত’ ফেরত দেয়, তখন বিশ্ববাসী আবার স্তব্ধ হয়ে উপলব্ধি করে—লুমুম্বা কোনো অতীত নন, তিনি বর্তমানের এক জ্বলন্ত প্রশ্ন।

রাজা লিওপোল্ডের ‘ব্যক্তিগত কসাইখানা’ ও হাত-কাটা ইতিহাসের ক্ষত

প্যাট্রিস লুমুম্বার জীবন ও লড়াইকে বুঝতে হলে প্রথমে কঙ্গোর সেই আদিম, অন্ধকারাচ্ছন্ন ঔপনিবেশিক অতীতকে স্পর্শ করতে হবে, যা মানবসভ্যতার ইতিহাসে অন্যতম বড় লজ্জা হিসেবে চিহ্নিত।
১৮৮৫ থেকে ১৯০৮ সাল পর্যন্ত কঙ্গো কোনো সাধারণ উপনিবেশ ছিল না; এটি ছিল বেলজিয়ামের রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ডের সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সম্পত্তি, যার ছদ্মনাম দেওয়া হয়েছিল “কঙ্গো ফ্রি স্টেট”। এই ২৩ বছরে রাজা লিওপোল্ডের নির্দেশে কঙ্গোর ওপর যে পৈশাচিক বর্বরতা চালানো হয়, আধুনিক ইতিহাসবিদদের গবেষণায় তার শিকার হয়ে প্রায় ১ কোটি (১০ মিলিয়ন) মানুষের মৃত্যুর হিসাব পাওয়া যায়।

[রাজা লিওপোল্ডের ব্যক্তিগত মালিকানা (১৮৮৫)]
                  │
                  ▼ (রাবার কোটা ও নির্যাতন)
[১ কোটি মানুষের সুপরিকল্পিত গণহত্যা]
                  │
                  ▼ (প্রতিবাদের শাস্তি)
[নারী ও শিশুদের হাত কেটে ফেলার বিভীষিকা]

ঊনবিংশ শতকের শেষে শিল্পবিপ্লবের জোয়ারে বিশ্ববাজারে বুনো রাবারের (Rubber) চাহিদা আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। কঙ্গোর ঘন জঙ্গল ছিল এই রাবারের মূল উৎস। কঙ্গোর পুরুষদের চাবুকের মুখে বাধ্য করা হতো দৈনিক নির্দিষ্ট কোটা অনুযায়ী রাবার সংগ্রহ করতে। কিন্তু মানুষ তো আর কংক্রিট বা রাবার খেয়ে বাঁচতে পারে না। ক্ষুধার্ত বা অসুস্থ থাকার কারণে কেউ যদি সেই কোটা পূরণ করতে ব্যর্থ হতো, তবে তার ওপর নেমে আসতো পৈশাচিক শাস্তি।
কলোনিয়াল ফোর্স বা ‘ফোর্স পাবলিক’-এর সবচেয়ে সাধারণ এবং ভয়ঙ্কর নিয়ম ছিল হাত কেটে ফেলা। কোনো বাবা যদি রাবার কম আনতেন, তবে কলোনিয়াল সেনারা তার স্ত্রী বা দুধের শিশুর কবজি থেকে হাত কেটে নিয়ে ঝুড়িতে করে রাজার দপ্তরে জমা দিত—এটি প্রমাণ করতে যে, গোলাবারুদ অপচয় হয়নি, শাস্তি কার্যকর হয়েছে। কঙ্গোর ইতিহাসের সেইসব সাদা-কালো ছবি আজো মানুষকে শিউরে তোলে, যেখানে একজন পিতা তাঁর ৫ বছর বয়সী মেয়ের কাটা হাত ও পায়ের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন। এই নরককুণ্ডের মধ্যেই জন্ম হয়েছিল প্যাট্রিস লুমুম্বার।

এক কৃষকের কুটির থেকে স্বাধীনতার মঞ্চ: লুমুম্বার উত্থান

১৯২৫ সালে কঙ্গোর এক প্রত্যন্ত অঞ্চলের অত্যন্ত দরিদ্র কৃষক পরিবারে লুমুম্বার জন্ম। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত, কিন্তু লুমুম্বা ছিলেন এক স্বশিক্ষিত জাদুকর। তিনি পুথিপত্র পড়ে, লাইব্রেরিতে রাত জেগে নিজেকে বিশ্বরাজনীতি, দর্শন ও প্যান-আফ্রিকান সমাজতান্ত্রিক আদর্শে দীক্ষিত করেন।
তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, বেলজিয়াম কঙ্গোকে ভৌগোলিক ও জাতিগতভাবে টুকরো টুকরো করে রাখতে চায় যাতে তাদের শাসন দীর্ঘস্থায়ী হয়। এই বিভাজন রুখতে তিনি গড়ে তোলেন অবয়বহীন কঙ্গোর প্রথম অসাম্প্রদায়িক ও জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দল—মুভমেন্ট ন্যাশনাল কঙ্গোলাইস (MNC)। তাঁর সম্মোহনী বক্তৃতা ও তীব্র জাতীয়তাবাদী চেতনা কঙ্গোর মানুষকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলে। ফলস্বরূপ, ১৯৬০ সালের মে মাসে কঙ্গোর ইতিহাসে প্রথম সাধারণ নির্বাচনে লুমুম্বার দল অভাবনীয় বিজয় লাভ করে। মাত্র ৩৫ বছর বয়সে তিনি স্বাধীন কঙ্গোর প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।

৩০ জুনের সেই ঐতিহাসিক ‘অপ্রোটোকল’ গর্জন

৩০ জুন, ১৯৬০। কঙ্গোর স্বাধীনতা দিবস।
রাজধানী কিনশাসার (তৎকালীন লিওপোল্ডভিল) হলরুম কানায় কানায় পূর্ণ। মঞ্চে উপবিষ্ট বেলজিয়ামের তরুণ রাজা বোডুইন (King Baudouin)। রাজা বোডুইন তাঁর আনুষ্ঠানিক বক্তৃতায় অত্যন্ত ঔদ্ধত্যের সাথে দাবি করলেন, বেলজিয়ামের রাজা দ্বিতীয় লিওপোল্ড কঙ্গোর মানুষকে ‘সভ্য’ করেছেন এবং এই স্বাধীনতা বেলজিয়ামের এক মহান উপহার। তিনি কঙ্গোবাসীকে পরামর্শ দিলেন, তারা যেন বেলজিয়ামের প্রতি সদয় ও কৃতজ্ঞ থাকে।
নির্ধারিত প্রোটোকল অনুযায়ী সেদিন প্রধানমন্ত্রী লুমুম্বার বক্তব্য দেওয়ার কথাই ছিল না। কিন্তু রাজার এই বর্ণবাদী ও ঔপনিবেশিক অহংকার লুমুম্বার ভেতরের বিপ্লবী সত্তাকে জাগিয়ে তোলে। তিনি প্রোটোকল ভেঙে আকস্মিকভাবে ডায়াসের সামনে গিয়ে দাঁড়ান। রাজা বোডুইন এবং উপস্থিত পশ্চিমা কূটনীতিকদের চোখের দিকে তাকিয়ে তিনি যে ঐতিহাসিক ভাষণটি দেন, তা বিশ্বরাজনীতিতে এক মহাভূপাত তৈরি করে।
লুমুম্বা তাঁর ভাষণে কোনো কূটনৈতিক শিষ্টাচারের তোয়াক্কা না করে সরাসরি বলেন:

“আমরা এই স্বাধীনতা কোনো উপহার হিসেবে পাইনি। আমাদের স্বাধীনতা এসেছে লড়াইয়ের মাধ্যমে, প্রতিদিনের অশ্রু ও রক্তের বিনিময়ে। আমরা চাবুকের সেইসব নির্মম আঘাত ভুলিনি, যা আমাদের সকাল-সন্ধ্যা সহ্য করতে হতো কারণ আমরা কালো ছিলাম। আমরা আমাদের ভাইদের হাত কেটে নেওয়ার সেই ক্ষতকে কোনোদিন ভুলবো না।”

কালো চামড়ার একজন মানুষের মুখে এই সত্য উচ্চারণ পশ্চিমা শাসকদের পিঠ শিউরে দিয়েছিল। বেলজিয়ামের রাজকীয় প্রতিনিধিদল এটিকে তাদের রাজার প্রতি চরম ‘অপমান’ হিসেবে গণ্য করে। সেই মুহূর্তেই মূলত লুমুম্বার মৃত্যুদণ্ড অলিখিতভাবে সিলমোহর হয়ে গিয়েছিল।

ভূরাজনীতির নিষ্ঠুর শিকার ও একটি ‘সোনার দাঁত’-এর ট্র্যাজেডি

স্বাধীনতা পাওয়ার মাত্র কয়েকদিনের মাথায় কঙ্গোর খনিজসমৃদ্ধ অঞ্চল ‘কাতাঙ্গা’ (Katanga)-কে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থা ও বেলজিয়ামের মদতে মূল দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করার চক্রান্ত শুরু হয়। কঙ্গোতে কৃত্রিম গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে দেওয়া হয়। লুমুম্বা কঙ্গোর সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য জাতিসংঘের কাছে বারবার শান্তিরক্ষী বাহিনী ও সামরিক সহায়তার আবেদন করেন। কিন্তু তৎকালীন জাতিসংঘ ও পশ্চিমা শক্তিগুলো কঙ্গোর খনিজ সম্পদের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়ে লুমুম্বাকে একঘরে করে ফেলে।
নিরুপায় হয়ে লুমুম্বা তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে লজিস্টিক সহায়তার আবেদন জানান। শীতল যুদ্ধের সেই চরম উত্তেজনাকর মুহূর্তে এই ঘটনাকে পুঁজি করে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (CIA) এবং বেলজিয়াম লুমুম্বাকে ‘কমিউনিস্ট’ তকমা দিয়ে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে।

[লুমুম্বার সোভিয়েত সহায়তা প্রার্থনা (শীতল যুদ্ধ প্রেক্ষাপট)]
                              │
                              ▼
        [সিআইএ (CIA) ও বেলজিয়ামের যৌথ নীল নকশা]
                              │
                              ▼
    [প্রেসিডেন্ট কাসাবুভু ও মবুতুর মাধ্যমে গ্রেফতার]
                              │
                              ▼
        [১৭ জানুয়ারি, ১৯৬১: ফায়ারিং স্কোয়াডে হত্যা]

১৯৬০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে লুমুম্বার নিজের সরকারের ভেতরকার উচ্চাভিলাষী সেনাপ্রধান জোসেফ মবুতু (পরবর্তীতে মবুতু সেসে সেকো) এবং প্রেসিডেন্ট কাসাবুভুর বিশ্বাসঘাতকতায় লুমুম্বাকে গৃহবন্দী ও পরে গ্রেফতার করা হয়। তাঁর ওপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন।
১৭ জানুয়ারি, ১৯৬১।
কঙ্গোর এক নির্জন অরণ্যে বেলজিয়ামের সেনা কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড় করিয়ে প্যাট্রিস লুমুম্বাকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের পর ঔপনিবেশিক শক্তিরা লুমুম্বার মৃতদেহকেও ভয় পেত। তারা জানত, লুমুম্বার কবর কঙ্গোর মানুষের জন্য বিপ্লবের তীর্থস্থানে পরিণত হবে। তাই বেলজিয়ামের তৎকালীন পুলিশ কমিশনার জেরার্ড সোয়েটে (Gerard Soete) এবং তার সহযোগীরা লুমুম্বার লাশ কবর থেকে তুলে টুকরো টুকরো করে কাটে এবং একটি বিশাল ড্রামে সালফিউরিক এসিডের মধ্যে ডুবিয়ে সম্পূর্ণ গলিয়ে দেয়।
একটি ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি:

জেরার্ড সোয়েটে পরবর্তীতে নিজেই স্বীকার করেন, লুমুম্বার পুরো শরীর এসিডে গলে ছাই হয়ে গেলেও তাঁর একটি ‘সোনা বাঁধানো দাঁত’ অক্ষত থেকে গিয়েছিল। সোয়েটে সেই দাঁতটি নিজের পকেটে করে বেলজিয়ামে নিয়ে যান এবং দীর্ঘ চার দশক তা নিজের ড্রয়ারে ‘যুদ্ধজয়ের ট্রফি’ হিসেবে লুকিয়ে রাখেন। ২০২২ সালের জুন মাসে, হত্যাকাণ্ডের ৬১ বছর পর, বেলজিয়াম সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের ‘নৈতিক দায়িত্ব’ স্বীকার করে লুমুম্বার পরিবারের কাছে সেই এক টুকরো দাঁত ফেরত দেয়। একটি আস্ত মানুষের বদলে কঙ্গোর মানুষ ফিরে পায় কেবল তাঁর একটি দাঁত—যা আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক ট্র্যাজেডির প্রতীক।

লুমুম্বার রক্তভেজা কঙ্গো থেকে মবুতুর ‘জায়ার’: নাম বদলের নিষ্ঠুর রাজনৈতিক ইতিহাস

প্যাট্রিস লুমুম্বার নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর কঙ্গোর ইতিহাস এক দীর্ঘ ও অন্ধকার স্বৈরশাসনের গোলকধাঁধায় হারিয়ে যায়। লুমুম্বাকে সরিয়ে দেওয়ার পর যে মানুষটি পশ্চিমাদের পূর্ণ সমর্থনে কঙ্গোর মসনদে বসেন, তিনি হলেন লুমুম্বারই একসময়ের সেনাপ্রধান জোসেফ মবুতু। ১৯৬৫ সালে এক রক্তহীন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তিনি নিজেকে কঙ্গোর সর্বেসর্বা ঘোষণা করেন।
মবুতু ক্ষমতায় এসেই বুঝতে পেরেছিলেন, কঙ্গোর মানুষের মনে লুমুম্বার বিপ্লবী জাতীয়তাবাদী চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখলে তাঁর স্বৈরশাসন টিকবে না। ফলে তিনি ১৯৭১ সালে এক চতুর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চাল চালেন, যা ইতিহাসে ‘অথেনটিসিটি’ (Authenticity) আন্দোলন নামে পরিচিত।

[স্বাধীন কঙ্গো (১৯৬০)] ──(মবুতুর অভ্যুত্থান ও স্বৈরতন্ত্র)──> [নাম পরিবর্তন: জায়ার (১৯৭১)] ──(কাবিলা কর্তৃক মবুতুর পতন)──> [বর্তমান: ডিআর কঙ্গো (১৯৯৭)]

এই নীতিমালার অধীনে তিনি কঙ্গোর মানুষের ওপর থেকে ঔপনিবেশিক বা ইউরোপীয় সমস্ত চিহ্ন মুছে ফেলার নাটক শুরু করেন। এই নাটকের অংশ হিসেবেই:

  • তিনি নিজের ইউরোপীয় নাম ‘জোসেফ মবুতু’ বদলে আফ্রিকার আদিবাসী নাম ‘মবুতু সেসে সেকো’ গ্রহণ করেন।
  • ১৯৭১ সালে তিনি দেশের নাম ‘কঙ্গো’ থেকে পরিবর্তন করে রাখেন ‘রিপাবলিক অব জায়ার’ (Republic of Zaire)। মূলত ‘জায়ার’ শব্দটি এসেছে স্থানীয় কঙ্গো ভাষার ‘নজারি’ (Nzadi) শব্দ থেকে, যার অর্থ ‘নদী’।

নাম বদলের আড়ালের আসল সত্য:

মবুতু দেশবাসীকে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে তিনি দেশ থেকে ‘ইউরোপীয় কলোনিয়াল প্রভাব’ দূর করতেই দেশের নাম ‘জায়ার’ রাখছেন। কিন্তু এটি ছিল এক চরম ঐতিহাসিক পরিহাস। কারণ, মবুতু নিজে লুমুম্বাকে হত্যা করেছিলেন সেই ইউরোপীয় শক্তি বেলজিয়াম ও আমেরিকার সিআইএ-র মদতে!
জায়ার নাম দিয়ে মবুতু মূলত একটি ‘পাপেট স্টেট’ বা পুতুল রাষ্ট্র চালাচ্ছিলেন। দীর্ঘ ৩২ বছর (১৯৬৫-১৯৯৭) জায়ার শাসনের নামে মবুতু দেশের কোবাল্ট, সোনা এবং হীরা লুট করে পশ্চিমা ব্যাংকগুলোতে নিজের অ্যাকাউন্ট ভরিয়েছিলেন, অন্যদিকে জায়ার বা কঙ্গোর সাধারণ মানুষ অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটিয়েছে। শীতল যুদ্ধের সময় আমেরিকা তাকে অন্ধের মতো সমর্থন দিয়েছিল, কারণ মবুতু ছিলেন একজন কড়া ‘কমিউনিস্ট-বিরোধী’ শাসক।

‘জায়ার’ থেকে যেভাবে আবার ‘কঙ্গো’ হলো:

১৯৯৭ সালে শীতল যুদ্ধের অবসান ঘটলে পশ্চিমাদের কাছে মবুতুর গুরুত্ব ফুরিয়ে যায়। তখন লুমুম্বার আদর্শে অনুপ্রাণিত আরেক বিদ্রোহী নেতা লরেন্ট-ডেসিরে কাবিলা (Laurent-Désiré Kabila) এক গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারী মবুতুকে ক্ষমতাচ্যুত করেন।
ক্ষমতা দখলের পর কাবিলা মবুতুর স্বৈরাচারী শাসনের কালো অতীত এবং ‘জায়ার’ নামটিকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেন। ১৭ মে, ১৯৯৭ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের নাম ‘জায়ার’ থেকে পরিবর্তন করে আবার পূর্বের নামে ফিরিয়ে নিয়ে যান—‘ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব দ্য কঙ্গো’ (DR Congo)
তাই ‘জায়ার’ নামটি মূলত কঙ্গোর ইতিহাসের এক দীর্ঘ ও বেদনাদায়ক স্বৈরশাসন, সম্পদ লুটপাট এবং লুমুম্বার হত্যাকারীদের রাজত্বের প্রতীক। আর ‘কঙ্গো’ নামটি হলো তাদের আদি পরিচয় ও স্বাধীনতার লড়াইয়ের মূল স্পন্দন।

আধুনিক কঙ্গো এবং ‘কোবাল্ট অভিশাপ’ (The Cobalt Curse)

লুমুম্বার মৃত্যুর পর কঙ্গোতে জেঁকে বসে একনায়ক মবুতু সেসে সেকোর তিন দশকের শোষণের রাজত্ব, যাকে পরোক্ষভাবে সমর্থন দিয়েছিল পশ্চিমা বিশ্ব। আজ ২০২৬ সালেও কঙ্গোর ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি মেলেনি।
কঙ্গো হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম সম্পদসমৃদ্ধ দেশ, যা ভূরাজনীতিতে এক বড় ট্র্যাজেডি। বর্তমান বিশ্বের ‘সবুজ শক্তি’ (Green Energy) এবং ডিজিটাল বিপ্লবের মূল ফুসফুস হলো কোবাল্ট (Cobalt) এবং কোলটান (Coltan)। পৃথিবীর মোট কোবাল্ট মজুতের ৭০ শতাংশেরই উৎস এই কঙ্গো। অ্যাপল, স্যামসাং-এর স্মার্টফোন থেকে শুরু করে টেসলার মতো বিলিয়ন ডলারের বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি—সবকিছুই কঙ্গোর এই খনিজের ওপর নির্ভরশীল।

ঔপনিবেশিক বনাম আধুনিক খনিজ নিষ্কাশন কাঠামো

বৈশিষ্ট্যঔপনিবেশিক আমল (১৮৮৫-১৯৬০)আধুনিক আমল (২০-২১ শতক)
মূল সম্পদবুনো রাবার ও হাতির দাঁতকোবাল্ট, কোলটান, সোনা ও হীরা
নিয়ন্ত্রণকারী শক্তিবেলজিয়ামের রাজতন্ত্র ও কলোনিয়াল কোম্পানিগ্লোবাল নর্থের মেগা-করপোরেট ও পরাশক্তি (আমেরিকা-চীন)
শ্রমিকদের অবস্থাচাবুকের মুখে বাধ্যতামূলক ক্রীতদাস শ্রমনামমাত্র মজুরিতে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও বিষাক্ত খনিতে কাজ
মানবাধিকার সংকটঅঙ্গচ্ছেদ (হাত কাটা) ও গণকবরঅতিমাত্রায় শিশুশ্রম, খনি ধস ও বিষাক্ত রাসায়নিকের সংক্রমণ

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং জাতিসংঘের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো দেখাচ্ছে, কঙ্গোর কোবাল্ট খনিগুলোতে প্রায় ৪০ হাজারেরও বেশি শিশু অত্যন্ত অমানবিক ও বিষাক্ত পরিবেশে খালি হাতে কাজ করছে। আধুনিক করপোরেট বিশ্ব তাদের প্রফিট মার্জিন ঠিক রাখতে এই সাপ্লাই চেইনের পেছনের অন্ধকার সত্যকে যুগের পর যুগ এড়িয়ে যাচ্ছে। কঙ্গোর খনিগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এখন চীন এবং আমেরিকার মতো পরাশক্তিগুলোর পরোক্ষ মদতে স্থানীয় সশস্ত্র গ্রুপগুলো প্রতিদিন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত। সম্পদই যেন কঙ্গোর জন্য সবচেয়ে বড় অভিশাপ।

উপসংহার: মানচিত্রের স্বাধীনতা বনাম অর্থনৈতিক দাসত্ব

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিচিউড’-এ লিখেছিলেন—“অনগ্রসর ওcondemned (অভিশপ্ত) জাতির জন্য পৃথিবীর বুকে দ্বিতীয় কোনো সুযোগ থাকে না।” কঙ্গো কিংবা উত্তর-ঔপনিবেশিক আফ্রিকার দেশগুলোর দিকে তাকালে মার্কেজের এই উক্তিকে এক নির্মম সত্য বলে মনে হয়।
ইউরোপীয় শক্তিগুলো যখন বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে তাদের প্রশাসনিক পাতাড়ি গুটিয়েছে, তখন তারা প্রতিটি দেশের অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত মেরুদণ্ড এমনভাবে ভেঙে দিয়ে গেছে, যেন এই দেশগুলো কোনোদিন স্বাবলম্বী হতে না পারে। একেই আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন ‘নব্য-উপনিবেশবাদ’ (Neo-colonialism)
প্যাট্রিস লুমুম্বার গল্প তাই কোনো ধুলোপড়া ইতিহাস নয়। লুমুম্বার সেই এসিডে গলে যাওয়া শরীর আর পরিবারের কাছে ফিরে আসা এক টুকরো দাঁত আজো উন্নয়নশীল ও তৃতীয় বিশ্বের প্রতিটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের দেয়ালে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দেয়—“একটি দেশ কি আসলেই স্বাধীন, যদি তার প্রাকৃতিক সম্পদ, তার অর্থনীতি এবং তার ভবিষ্যতের চাবিকাঠি অন্য কোনো পরাশক্তি বা বৈশ্বিক করপোরেটের নিয়ন্ত্রণে থাকে?”

যতদিন এই অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত দাসত্ব থাকবে, ততদিন কঙ্গোর সবুজ অরণ্যে কিংবা পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে লুমুম্বার অবিনশ্বর ছায়া জালিমদের তাড়া করে ফিরবেই।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments