Homeটুডে স্পোর্টসস্কোরবোর্ডে ৩-০, ইতিহাসে শত বছরের লড়াই: ব্রাজিল-হাইতি ম্যাচের নেপথ্য মহাকাব্য

স্কোরবোর্ডে ৩-০, ইতিহাসে শত বছরের লড়াই: ব্রাজিল-হাইতি ম্যাচের নেপথ্য মহাকাব্য

অনলাইন ডেস্ক | ২১ জুন, ২০২৬

“সুখী হতে ভয় নেই (Sem medo de ser feliz)।”

লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা

মাঠের সবুজ ঘাসে ৯০ মিনিটের লড়াই শেষে রেফরির শেষ বাঁশি যখন বাজলো, তখন স্কোরবোর্ড জানাচ্ছিল—ব্রাজিল ৩, হাইতি ০। প্রথমার্ধের দাপট আর দ্বিতীয়ার্ধের নান্দনিক পাসিংয়ের ওপর ভর করে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা ৩-০ গোলের একটি প্রত্যাশিত জয় তুলে নিয়েছে।

কিন্তু এই ম্যাচটি যারা কেবল স্কোরবোর্ডের সংখ্যা আর পয়েন্ট টেবিল দিয়ে পরিমাপ করছেন, তারা আসলে এর ভেতরের আসল গল্পটা মিস করছেন। কিক-অফ থেকে শুরু করে রেফরির শেষ বাঁশি পর্যন্ত বাইশজন মানুষের পায়ের নিচে আসলে স্তরিত হয়ে ছিল শত বছরের ঔপনিবেশিক ক্ষত, দাসত্বের ক্রন্দন, এবং প্রতিরোধ ও সার্বভৌমত্বের এক অনন্য মহাকাব্য। এটি কেবলই একটি ফুটবল ম্যাচ ছিল না; এটি ছিল গ্লোবাল সাউথের (Global South) দুটি ভিন্ন ঐতিহাসিক নিয়তির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকার এক পরম মানবিক দলিল।

১৮০৫ বনাম ১৮৮৮: দাসত্বের দুই বিপরীত মেরু

এই ম্যাচের ডাইনামিকটা বুঝতে হলে ফুটবল বুটের নিচে চাপা পড়া ইতিহাসের ধুলো ঝাড়তে হবে। হাইতি ও ব্রাজিলের ইতিহাস দাসত্বের দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপরেখাকে ধারণ করে।

হাইতি রাষ্ট্রটির সূচনাই হয়েছিল একটি ঐতিহাসিক ও বীরত্বপূর্ণ দাস বিদ্রোহের মাধ্যমে। দুনিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে ১৮০৫ সালে হাইতি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দাসপ্রথা উচ্ছেদ করে। কিন্তু স্বাধীনতার পর পশ্চিমা পরাশক্তিগুলো তাদের ওপর যে অর্থনৈতিক অবরোধ ও রাজনৈতিক আইসোলেশন চাপিয়ে দেয়, তা হাইতিকে আজকের এই ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ বা সংকটের অতল গহ্বরে ফেলার প্রধান কারণ।

অন্যদিকে, পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে ব্রাজিল সবার শেষে দাসপ্রথা উচ্ছেদ করে, ১৮৮৮ সালে। কিন্তু দাসপ্রথা বিলুপ্ত হলেও সাবেক ক্রীতদাসদের ভাগ্যে কোনো পরিবর্তন আসেনি। রাষ্ট্র তাদের কোনো জমি দেয়নি, কোনো ক্ষতিপূরণ দেয়নি, শিক্ষার আলো দেয়নি। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে কোনো রকম অবলম্বন ছাড়াই শহরের এক কোণে ছেড়ে দেওয়া হয়।

‘বাঞ্জো’র মানসিক ট্র্যাজেডি থেকে ‘ফ্লাভেলা’র জন্ম

আফ্রিকা থেকে পর্তুগিজরা যখন জাহাজভর্তি ক্রীতদাস ব্রাজিলে আনা শুরু করে (যার সংখ্যা ছিল উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় আনা মোট ক্রীতদাসের প্রায় অর্ধেক), তখন তাদের গন্তব্য ছিল কফি আর আখের ক্ষেত। দিনে ১৮ ঘণ্টা অমানুষিক পরিশ্রম, পরিবার পরিজন হারানোর বেদনা আর নারকীয় পরিবেশে থাকতে গিয়ে এই মানুষগুলো মানসিকভাবে ভেঙে পড়তেন, খাওয়া বন্ধ করে দিতেন। ব্রাজিলে এই গভীর মানসিক অবসাদের একটি নামও ছিল—‘বাঞ্জো’ (Banzo)

১৮৮৮ সালের মুক্তির পর এই ভূমিহীন সাবেক ক্রীতদাস আর ভাগ্যহারা কৃষকেরা কাজের খোঁজে শহরে এসে পাহাড়ের ঢালে বসতি গড়তে শুরু করলেন। রাষ্ট্রের অবহেলা থেকে জন্ম নেওয়া এই বিখ্যাত বস্তিগুলোকেই বলা হয় ‘ফ্লাভেলা’ (Favela)। বর্তমানে ব্রাজিলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮ শতাংশ মানুষ এই ফ্লাভেলাগুলোতে বাস করেন।

[কফি ও আখের ক্ষেতে দাসত্ব] ──> [মানসিক রোগ: বাঞ্জো] ──> [১৮৮৮: জমিহীন মুক্তি] ──> [পাহাড়ের ঢালে ‘ফ্লাভেলা’র জন্ম]

জঞ্জালের বল, ফ্লাভেলা এবং ‘জোগো বোনিতো’

শুরু থেকেই ফ্লাভেলাগুলো ছিল সরকারের নজরের বাইরে—সেখানে চাকরি ছিল না, শিক্ষা ছিল না, চিকিৎসা ছিল না। কিন্তু এই অমানুষিক পরিবেশেও একটা জিনিস কেউ কেড়ে নিতে পারেনি, তা হলো ফুটবল।

প্রায় প্রতিটা ফ্লাভেলাতেই গড়ে উঠেছিল মেক-শিফ্ট পিচ। শিশুরা জঞ্জাল, ছেঁড়া কাপড় বা মোজা দিয়ে বানানো বল নিয়ে খালি পায়ে খেলতো। এই রেফারিবিহীন খেলায় শুধু গোল দেওয়া বা ম্যাচ জেতা বড় কথা ছিল না; এটি ছিল নিজেকে প্রমাণ করার জায়গা, বাইরের বৈরী দুনিয়ায় নিজের অস্তিত্বের স্বীকৃতি পাওয়ার একমাত্র সুযোগ। সেখানে মূল আকর্ষণ ছিল ফুটবলের সৌন্দর্য ও বিনোদন। এই দর্শন থেকেই তৈরি হলো ব্রাজিলের সিগনেচার স্টাইল—‘জোগো বোনিতো’ (Jogo Bonito) বা নান্দনিক ফুটবল।

  • বঞ্চিতদের মধ্য থেকে সুপারস্টার: ফ্লাভেলা ফুটবলের প্রথম পোস্টারবয় ছিলেন পেলে। মায়ের মোজা দিয়ে তৈরি বল নিয়ে খেলা সেই ছেলেটিই বিশ্বকে দেখালেন, ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় জাদুকররা লুকিয়ে আছেন দেশটির সবচেয়ে বঞ্চিত অঞ্চলের ধুলোবালির মধ্যেই। পেলের পর রিভালদো, রোনালদো নাজারিও, রোনালদিনহো, আদ্রিয়ানো, কিংবা হালের ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও গ্যাব্রিয়েল জেসুস—সবাই এই ফ্লাভেলারই সৃষ্টি।

সক্রেটিসের ‘মাঠের রাজনীতি’ এবং লুলার প্রতিরোধ

গতকালকের ম্যাচে ব্রাজিলের ফুটবলাররা যখন মাঠে খেলছিলেন, তখন ফুটবলপ্রেমীদের মনে পড়ছিল আশির দশকের সেই কিংবদন্তি ডাক্তার সক্রেটিসের কথা। ১৯৬৪ সালে সিআইএ-সমর্থিত সামরিক অভ্যুত্থানে ব্রাজিলের প্রগতিশীল প্রেসিডেন্ট জোয়াও গুলার্ট ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর যখন দেশে দমন-পীড়ন (অপারেশন ক্লিন-আপ) চলছিল, তখন সক্রেটিস তাঁর ফুটবল ক্লাব করিন্থিয়াসে চালু করেছিলেন ‘করিন্থিয়ান ডেমোক্রেসি’। ক্লাবের মালিক থেকে কিটম্যান—সবার ভোটে ক্লাব চলতো। ১৯৮২ সালে পুরো দল জার্সির পেছনে ‘গণতন্ত্র’ লিখে মাঠে নেমেছিল।

১৯৮৪ সালে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে যখন ২০ লক্ষ মানুষের ঐতিহাসিক আন্দোলন শুরু হয়, তখন সেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে সক্রেটিস ঘোষণা দিয়েছিলেন—নির্বাচন না দিলে তিনি দেশ ছাড়বেন। পরবর্তীতে জান্তা নির্বাচন না দিলে তিনি ইতালির ফিওরেন্তিনায় যোগ দেন। ইতালিতে পৌঁছে সাংবাদিকরা যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ইতালিয়ান ফুটবলের কোন কিংবদন্তিকে আপনার পছন্দ? সক্রেটিস উত্তর দিয়েছিলেন—“আন্তোনিও গ্রামসি” (বিখ্যাত মার্ক্সবাদী দার্শনিক)।

[১৯৬৪: সিআইএ সমর্থিত সামরিক অভ্যুত্থান]
                   │
                   ▼ (সক্রেটিসের প্রতিরোধ)
[করিন্থিয়ান ডেমোক্রেসি ও জার্সিতে 'গণতন্ত্র'] ◄──► [লুলার শ্রমিক আন্দোলন ও 'পিটি' গঠন]
                   │
                   ▼ (গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন)
[২০০২-২০২৬: লুলার অধীনে দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব]

ঠিক একই সময়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে মানুষ সংগঠিত করছিলেন লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। ১৪ বছর বয়সে কারখানায় কাজ করতে গিয়ে আঙুল হারানো বাদাম বিক্রেতা লুলা পরবর্তীতে শ্রমিক ইউনিয়ন থেকে গড়ে তোলেন ‘ব্রাজিলিয়ান ওয়ার্কার্স পার্টি’ (PT)। দুর্নীতির ভুয়া মামলায় ৫৮০ দিন জেল খেটে, সুপ্রিম কোর্টের রায়ে নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে ২০২২ সালে আবার ক্ষমতায় আসেন তিনি। বলসোনারোর অভ্যুত্থানের চেষ্টা ব্যর্থ করে এবং ট্রাম্পের ৫০% শুল্ক আরোপের হুমকিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে লুলার সেই সোজাসাপটা জবাব আজো গ্লোবাল সাউথের সার্বভৌমত্বের প্রতীক: “ব্রাজিল একটা সার্বভৌম রাষ্ট্র, আমরা কারো অভিভাবকত্ব মানবো না।”

শেষ কথা: ৩-০ এর আড়ালে আসল জয়

ম্যাচের স্কোরলাইন আজীবন লেখা থাকবে—ব্রাজিল ৩, হাইতি ০। কিন্তু হাইতির সেই আদি দাস বিদ্রোহের অপরাজিত চেতনা, আর ব্রাজিলের ফ্লাভেলা থেকে উঠে আসা মানুষের প্রতিরোধের ইতিহাস আমাদের এক বড় শিক্ষা দিয়ে গেল।

একটি শোষিত কলোনি হিসেবে শুরু করেও যে বিশ্বমঞ্চে প্রকৃত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব পাওয়া সম্ভব, ব্রাজিল তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ—যে লড়াইয়ের কেন্দ্রীয় চরিত্রে জড়িয়ে আছে ফুটবল। ফ্লাভেলা আজো যায়নি, গভীর কাঠামোগত সমস্যা আজো রয়ে গেছে; কিন্তু লুলা, সক্রেটিস আর ব্রাজিলের সাধারণ মানুষের লড়াই আমাদের শেখায়—আরেকটি সুন্দর দুনিয়া তৈরি করা সত্যিই সম্ভব। তবে তার জন্য দরকার স্বপ্ন দেখার সাহস আর সংগ্রাম। সুখী হতে আসলেই কোনো ভয় নেই!

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments