Homeটুডে ওয়ার্ল্ডযৌন সহিংসতার অভিযোগে ইসরায়েলকে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ করলো জাতিসংঘ: তেল আবিবের তীব্র ক্ষোভ,...

যৌন সহিংসতার অভিযোগে ইসরায়েলকে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ করলো জাতিসংঘ: তেল আবিবের তীব্র ক্ষোভ, গুতেরেসের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা

ঢাকা | ২৯ মে ২০২৬
সশস্ত্র সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বন্দি ও বেসামরিক নাগরিকদের ওপর পদ্ধতিগত যৌন সহিংসতার অভিযোগে ইসরায়েলকে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ (ব্ল্যাকলিস্ট) করেছে জাতিসংঘ। যুদ্ধক্ষেত্র ও সংঘাতপূর্ণ এলাকায় ধর্ষণ এবং যৌন নিপীড়নে জড়িত পক্ষগুলোকে নিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের বার্ষিক প্রতিবেদনের অংশ হিসেবে তেল আবিবকে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই নজিরবিহীন পদক্ষেপের পর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইসরায়েল। দেশটি জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের কার্যালয়ের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা দিয়েছে। কেরালা বা গাজার চলমান সংঘাতের পর জাতিসংঘ ও ইসরায়েলের মধ্যকার দীর্ঘদিনের তিক্ততা এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে চূড়ান্ত রূপ নিলো।

জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন বৃহস্পতিবার (২৮ মে) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় এই সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানান। তিনি জাতিসংঘের এই পদক্ষেপকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’, ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ ও ‘বাস্তবতাবিবর্জিত’ বলে দাবি করেন। ড্যানন স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন, “আমরা এই মহাসচিবের সঙ্গে আর কোনো কাজ করব না।” তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে আরও বলেন, জাতিসংঘ মহাসচিব ইসরায়েলকে হামাস বা আইএসআইএসের (আইএস) মতো সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে একই তালিকায় স্থান দিয়েছেন, যা ইসরায়েলের জন্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ইসরায়েলের জাতিসংঘ মিশন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক যৌথ বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে, গুতেরেস যতদিন মহাসচিব পদে থাকবেন, ততদিন তাঁর কার্যালয়ের সঙ্গে তেল আবিব কোনো যোগাযোগ রাখবে না।

জাতিসংঘের এই সিদ্ধান্তটি আকস্মিক নয়। গত বছরের আগস্টে প্রকাশিত সংঘাত-সংশ্লিষ্ট যৌন সহিংসতা বিষয়ক এক প্রতিবেদনে জাতিসংঘ সতর্ক করেছিল যে, ফিলিস্তিনি বন্দিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর যৌন সহিংসতার ‘বিশ্বাসযোগ্য তথ্য’ পাওয়া গেছে। যার ভিত্তিতে ইসরায়েলকে এই তালিকায় যুক্ত করা হতে পারে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও দীর্ঘদিন ধরে গাজা ও পশ্চিম তীরে আটক ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি হেফাজতে নির্যাতন, অমানবিক আচরণ এবং পদ্ধতিগত যৌন নিপীড়নের অভিযোগ করে আসছিল। গত মাসে ‘ওয়েস্ট ব্যাংক প্রোটেকশন কনসোর্টাম’-এর এক প্রতিবেদনেও বলা হয়, ইসরায়েলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীদের যৌন এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার কারণে অনেক ফিলিস্তিনি পরিবার অধিকৃত পশ্চিম তীর ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন।

এছাড়া সম্প্রতি আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে গাজাগামী একটি ত্রাণবাহী নৌবহরকে আটক করে ইসরায়েলি বাহিনী। ওই নৌবহরের কয়েকজন বিদেশি কর্মী ইসরায়েলি হেফাজতে থাকার সময় তাদের ওপর যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের অন্তত ১৫টি সুনির্দিষ্ট ঘটনা ঘটেছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে অভিযোগ তোলেন। চলতি মাসের শুরুতে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর প্রখ্যাত সাংবাদিক নিকোলাস ক্রিস্টফ ১৪ জন ফিলিস্তিনি নারী-পুরুষের প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের ভিত্তিতে ইসরায়েলি কারাগারে ধর্ষণের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। এর জেরে ইসরায়েল ওই সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে মামলার হুমকিও দিয়েছিল। অন্যদিকে ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতের দাবি, এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে জাতিসংঘ প্রতিনিধিদের ইসরায়েল সফরের আমন্ত্রণ জানানো হলেও তারা তা গ্রহণ করেননি।

ইসরায়েলের এই কঠোর অবস্থান ও সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক জানিয়েছেন, তারা ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য সম্পর্কে অবগত। তবে কূটনৈতিক পথ খোলা রাখার ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, “মহাসচিবের দরজা সব সময়ই আলোচনার জন্য উন্মুক্ত রয়েছে।” ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকেই জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও গুতেরেসের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক তলানিতে ঠেকে। এর আগে ২০২৪ সালে ইসরায়েল জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসকে তাদের দেশে ‘পারসোনা নন গ্রাটা’ বা ‘অবাঞ্ছিত ব্যক্তি’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। বর্তমান এই কালো তালিকাভুক্তির ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে ইসরায়েলের কূটনৈতিক একাকীত্বকে আরও বাড়িয়ে তুলবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

📊 গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও প্রেক্ষাপট

  • মূল ঘটনা: সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে যৌন সহিংসতার অভিযোগে ইসরায়েলকে জাতিসংঘের কালো তালিকায় (Blacklist) অন্তর্ভুক্তকরণ।
  • ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া: জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের কার্যালয়ের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক স্থগিত ও তীব্র নিন্দা।
  • অভিযোগের ভিত্তি: ফিলিস্তিনি বন্দি, বেসামরিক নাগরিক এবং গাজাগামী ত্রাণবাহী নৌবহরের বিদেশি কর্মীদের ওপর ইসরায়েলি হেফাজতে পদ্ধতিগত যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণ।
  • পূর্ববর্তী কূটনৈতিক টানাপোড়েন: ২০২৪ সালে জাতিসংঘ মহাসচিবকে ইসরায়েলে ‘পারসোনা নন গ্রাটা’ (অবাঞ্ছিত) ঘোষণা করা হয়েছিল।
  • বর্তমান পরিস্থিতি: জাতিসংঘ জানিয়েছে তাদের আলোচনার পথ উন্মুক্ত রয়েছে, তবে ইসরায়েল গুতেরেসের মেয়াদ থাকা পর্যন্ত সম্পর্ক জোড়া না লাগানোর সিদ্ধান্তে অনড়।

📌 তথ্যসূত্র:

  • রয়টার্স (Reuters)
  • এপি (AP)
  • দৈনিক ইত্তেফাক
  • জেরুজালেম পোস্ট (The Jerusalem Post)
  • জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular