কাবুলের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর মস্কো সফরে ঐতিহাসিক সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর; আফগান বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও স্থল যুদ্ধ সরঞ্জাম দেবে পুতিন সরকার, প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেল দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা সম্পর্ক
কাবুল | ২৯ মে ২০২৬
পাকিস্তানের সাথে সাম্প্রতিক সীমান্ত সংঘাতের পর নিজেদের আকাশসীমার দুর্বলতা ঢাকতে বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছে আফগানিস্তানের তালেবান সরকার। রাশিয়ার কাছ থেকে অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম (Air Defense Systems), আধুনিক স্থল সামরিক অস্ত্রশস্ত্র এবং আফগান সামরিক বাহিনীকে প্রয়োজনীয় বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদানের বিষয়ে মস্কোর সাথে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে কাবুল। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে আজ শুক্রবার বিবিসি নিউজ বাংলা এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছে।
২০২১ সালে আফগানিস্তানের ক্ষমতায় আসার পর এই প্রথম কোনো আঞ্চলিক পরাশক্তির সাথে সরাসরি সামরিক ও কারিগরি সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করলেন তালেবান সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোল্লা মোহাম্মদ ইয়াকুব মুজাহিদ। এই চুক্তিকে প্রতিরক্ষা খাতে তালেবান সরকারের সাথে রাশিয়ার দীর্ঘদিনের অনানুষ্ঠানিক বোঝাপড়ার ‘প্রাতিষ্ঠানিক রূপ’ হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।
🤝 মস্কোয় প্রতিরক্ষা চুক্তি ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সফল কূটনীতি
গত মঙ্গলবার (২৬ মে) মস্কোতে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সম্মেলনে যোগ দিতে নির্ধারিত সফরে যান তালেবান প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোল্লা মোহাম্মদ ইয়াকুব মুজাহিদ। সেখানে রাশিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সের্গেই শোইগু এবং আফগান প্রতিরক্ষামন্ত্রীর উপস্থিতিতে এই উচ্চপর্যায়ের নথিতে দ্বিপাক্ষিক স্বাক্ষর করা হয়।
মস্কোর সাথে দীর্ঘদিনের গোপন আলোচনার পর এই চুক্তিটি বাস্তবায়ন করতে তালেবান প্রতিরক্ষামন্ত্রী সফল ভূমিকা রেখেছেন বলে সূত্রটি জানিয়েছে। চুক্তির পর রাশিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের উপদেষ্টা সের্গেই শোইগুর সাথে এক বৈঠকে মোল্লা ইয়াকুব বলেন:
“রাশিয়া এই অঞ্চল এবং বিশ্বের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দেশ। রাশিয়ান ফেডারেশনের সাথে যোগাযোগ এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আমাদের কাছে বিশেষ গুরুত্বের। আমরা আশা করি এই সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত, শক্তিশালী এবং ব্যাপক হবে।”
তবে এই চুক্তিতে শুধু আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জামই রয়েছে, নাকি আধুনিক ড্রোনের মতো কোনো বিধ্বংসী হামলার সরঞ্জামও অন্তর্ভুক্ত আছে—তা নিরাপত্তার স্বার্থে এখনো পরিষ্কার করা হয়নি।
🛡️ পাকিস্তানের সাথে সংঘাত ও আকাশ সুরক্ষার তাগিদ
সম্প্রতি প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের সাথে আফগানিস্তানের সামরিক বাহিনীর তীব্র সংঘাত ও বিমান হামলা পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটে। ওই সময় আকাশ প্রতিরক্ষা খাতে আফগানিস্তানের চরম দুর্বলতার বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড়ভাবে সামনে আসে। পাকিস্তানি বিমানবাহিনীর প্রবেশ রুখতে তখন থেকেই তালেবান সরকার আকাশ প্রতিরক্ষাসহ আধুনিক রাডার ও সামরিক সরঞ্জামের বিষয়ে রাশিয়ার শরণাপন্ন হয়।
২০২১ সালে মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনী প্রত্যাহারের পর যেসব দেশ কাবুলে নিজেদের দূতাবাস বন্ধ করেনি, রাশিয়া তাদের অন্যতম। ২০২২ সালে রাশিয়ার সাথে তালেবানের প্রথম অর্থনৈতিক চুক্তি হয়, যার অধীনে আফগানিস্তানে তেল, গ্যাস ও গম সরবরাহ করে আসছে মস্কো।
📉 নিরাপত্তা উদ্বেগ ও ক্রেমলিনের ভূরাজনীতি
রাশিয়া এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলো বারবার আফগানিস্তানের মাটিতে আইএস (IS) বা অন্যান্য জঙ্গি গোষ্ঠীর উপস্থিতি নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিল। তবে মস্কোর এই সম্মেলনে মোল্লা ইয়াকুব আশ্বস্ত করে বলেন, “আমরা আফগান মাটিতে বিদ্রোহী ও জঙ্গি নেটওয়ার্কগুলোকে দমনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছি এবং আফগানিস্তানের মাটি কাউকে অন্য দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।”
তালেবানকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এই অঞ্চলে মার্কিন প্রভাব ঠেকাতে চান রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। গত বছরের শেষের দিকে পুতিন বলেছিলেন, আফগানিস্তান পুরোপুরি তালেবানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং কাবুলের বর্তমান নেতৃত্বের সাথে সম্পর্ক না রেখে কোনো দেশই আফগানিস্তানের বিষয়ে প্রকৃত প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না। এরই ধারাবাহিকতায় সের্গেই শোইগু কদিন আগে ঘোষণা দেন যে, রাশিয়া তালেবান সরকারের সাথে একটি “পূর্ণাঙ্গ অংশীদারিত্ব” প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
📌 তথ্যসূত্র:
- বিবিসি নিউজ বাংলা (কাবুল ও মস্কো ব্যুরো অন-গ্রাউন্ড রিপোর্ট)
- আফগানিস্তান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় (Taliban MOD) প্রেস বিবৃতি
- রুশ ফেডারেশনের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ আর্কাইভ (মে ২০২৬)
- আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স ও আনাদোলু এজেন্সি



