Homeটুডে ওয়ার্ল্ডসরকারি সহায়তা ছাড়াই পাকিস্তানে নীরব সোলার–বিপ্লব: ভুল গ্রিড পরিকল্পনায় বড় ঝুঁকিতে রাষ্ট্র

সরকারি সহায়তা ছাড়াই পাকিস্তানে নীরব সোলার–বিপ্লব: ভুল গ্রিড পরিকল্পনায় বড় ঝুঁকিতে রাষ্ট্র

মধ্যপ্রাচ্য সংকটেও সচল ছিল অর্থনীতি; চীনের সস্তা প্রযুক্তিতে সাধারণ মানুষের হাত ধরে এসেছে জ্বালানি স্বনির্ভরতা, তবে কাঠামোগত ফাঁদে বন্দি বিদ্যুৎ খাত

ইসলামাবাদ | ২৯ মে ২০২৬
চলতি বছরের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া তীব্র সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালির নৌপথ হুমকির মুখে পড়ায় বিশ্বজুড়ে যখন জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলো বড় ধরনের সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল, তখন এক অবিশ্বাস্য ব্যতিক্রমী চিত্র দেখিয়েছে পাকিস্তান. ২০২২ সালের মতো ভয়াবহ লোডশেডিং কিংবা দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকটে পড়তে হয়নি দেশটিকে. তবে এই ঘুরে দাঁড়ানোর নেপথ্যে সরকারি কোনো পূর্বপ্রস্তুতি, আর্থিক অনুদান বা কূটনৈতিক দূরদর্শিতা ছিল না; বরং দেশটির সাধারণ জনগণ সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে লাখ লাখ সোলার প্যানেল বসিয়ে দেশটিতে এক নীরব ‘জ্বালানি–বিপ্লব’ ঘটিয়ে তুলেছে. সরকারি নথির বাইরে থাকা এই জনবিপ্লব যেমন স্বস্তি এনেছে, তেমনই উন্মোচন করেছে দেশটির নীতিনির্ধারকদের চরম ব্যর্থতাকেও.

☀️ চীনের সস্তা প্রযুক্তি ও জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া

২০২১ সাল থেকে এ পর্যন্ত পাকিস্তান চীন থেকে ৫০ গিগাওয়াটেরও বেশি সোলার মডিউল আমদানি করেছে, যার মধ্যে প্রায় ৩০ গিগাওয়াটের বেশি ইতিমধ্যে সচল রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে. বাড়ির ছাদে উৎপাদিত এই বিদ্যুৎ সরাসরি আমদানি করা ব্যয়বহুল জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দিয়েছে.

খাত📊 পাকিস্তানের সোলার রূপান্তরের চালক ও প্রভাব (২০২৫-২৬)
গ্রিড বিদ্যুতের দাম২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে গ্রিড বিদ্যুতের দাম বেড়েছে রেকর্ড ১৫৫ শতাংশ.
বিদ্যুৎ বিলের বোঝাকরাচি ও লাহোরে বিদ্যুৎ বিল সাধারণ মানুষের মাসিক বাড়িভাড়াকে ছাড়িয়ে যায়.
বাজারের সুবিধাবিশ্ববাজারে গত এক দশকে সোলার প্যানেলের দাম ৮৭% এবং ব্যাটারির দাম ৯০% কমে যাওয়ায় চীনের সহায়তায় পাকিস্তানিরা সরাসরি সুবিধা পায়.
গ্রিডের ব্যবহার হ্রাস২০২৫ সালে গ্রিড বিদ্যুতের বাণিজ্যিক ব্যবহার ২৩% এবং শিল্প খাতে ব্যবহার ১১% কমে গেছে.

পাকিস্তানের এই বিশাল সোলার বাফারের বিপরীতে ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোকে চলতি বছর তীব্র জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে হয়েছে, যেখানে রাতারাতি বিদ্যুতের দাম দ্বিগুণ হয়ে গেছে.

⚠️ ‘কাপাসিটি চার্জ’ ও এলএনজি চুক্তির কাঠামোগত ফাঁদ

সাধারণ মানুষ সোলারের দিকে ঝুঁকে বাঁচলেও, সরকারের অতীতের কিছু ভুল চুক্তি এখন পুরো বিদ্যুৎ খাতের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে. ১৯৯৪ সালে চালু করা স্বতন্ত্র বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের (আইপিপি) জন্য ‘কাপাসিটি পেমেন্ট’ বা কাপাসিটি চার্জ ব্যবস্থার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলেও কেন্দ্রগুলোকে বিপুল অর্থ দিতে হচ্ছে. ২০২৩-২৪ অর্থবছর নাগাদ বিদ্যুৎ–শুল্কের ৬১.৫ শতাংশই চলে যাচ্ছে এই কাপাসিটি চার্জের পেছনে, যা মাত্র দুই বছর আগেও ছিল ৪১ শতাংশ. অর্থাৎ, বর্তমানে বিদ্যুৎ বিলের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অর্থই ব্যয় হচ্ছে সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রের পেছনে.

পাশাপাশি, ‘টেক-অর-পে’ (Take-or-Pay) শর্তে করা দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) চুক্তিগুলো লোকসানের পরিমাণ আরও বাড়িয়েছে. সোলার–বিপ্লবের কারণে গ্রিডের চাহিদা কমে যাওয়ায় ২০২৫ সাল নাগাদ পাকিস্তান বছরে ১২০টি চুক্তিবদ্ধ কার্গোর মধ্যে প্রায় ৪৫টি কার্গো বাতিল করতে বাধ্য হচ্ছে. এই এলএনজি চুক্তির অপরিকল্পিত বাধ্যবাধকতার কারণে দেশটির বার্ষিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার.

📉 অন্ধকারে পরিকল্পনা বিভাগ ও পরবর্তী ধাপ

আশ্চর্যের বিষয় হলো, তৃণমূল পর্যায়ের এই বিশাল রূপান্তরের কোনো সঠিক হিসাব নেই সরকারের পরিকল্পনা বিভাগের কাছে. সরকারি তথ্যে মাত্র ৭ গিগাওয়াট নিবন্ধিত ‘নেট-মিটারিং’ সোলারের হিসাব থাকলেও বাস্তবে এর পরিমাণ ১৯ থেকে ৩১ গিগাওয়াট, যার সিংহভাগই অনিবন্ধিত. ফলে দেশ এখন একটি ভুল ও কাল্পনিক গ্রিডের ওপর ভিত্তি করে তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সাজাচ্ছে.

তবে সরকারি সমন্বয়হীনতা সত্ত্বেও জনগণ থেমে নেই. গত দু-তিন বছরে দেশটিতে ব্যাটারি আমদানি বেড়েছে আট গুণ এবং সোলার মালিকেরা এখন হাইব্রিড সিস্টেমের দিকে ঝুঁকছেন. গবেষকদের মতে, পাকিস্তানের জ্বালানি খাতের ভবিষ্যৎ এখন ছয়টি অধ্যায়ে বিভক্ত হচ্ছে:

১. গণ-সোলারাইজেশন (যা চলমান)

২. স্টোরেজ ও বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) বিপ্লব

৩. মাইক্রোগ্রিডের উত্থান

৪. ডিজিটাল ও এআইভিত্তিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনা

৫. জ্বালানি সাশ্রয়

৬. ব্যাটারি রিসাইক্লিং

এবং এই প্রতিটি খাতের প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন অংশীদার হিসেবে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে চীন.

🛠 টেকসই সংস্কারে যা করা জরুরি

সিপিইসি সেন্টার অব এক্সিলেন্সের গবেষক সাকিব উর রেহমান মুঘল দেশটির এই ভঙ্গুর জ্বালানি খাতকে বাঁচাতে দ্রুত কিছু নীতিগত সংস্কারের তাগিদ দিয়েছেন:

  • বাজেটীয় দায়বণ্টন: কাপাসিটি পেমেন্টের বিশাল বোঝা সাধারণ গ্রাহকের বিল থেকে সরিয়ে সরাসরি সরকারি বাজেটের মাধ্যমে মেটাতে হবে.
  • শুল্ক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন: সব গ্রাহক পর্যায়ে ‘ফ্ল্যাট’ রেট বাতিল করে সময়ভিত্তিক (Time of Use) শুল্কব্যবস্থা চালু করতে হবে.
  • চুক্তি পরিমার্জন: ফসিল ফুয়েল বা জীবাশ্ম জ্বালানির জন্য ভবিষ্যতে আর কোনো ‘টেক-অর-পে’ চুক্তি করা যাবে না.
  • জাতীয় সোলার রেজিস্ট্রি: দেশের প্রকৃত সোলার উৎপাদন জানতে একটি সহজ ও ডিজিটাল জাতীয় সোলার রেজিস্ট্রি তৈরি করা জরুরি.

📌 তথ্যসূত্র:

  • বিজনেস রেকর্ডার (পাকিস্তান) ও প্রথম আলো
  • সিপিইসি সেন্টার অব এক্সিলেন্স, পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট ইকনোমিকস (পিআইডিই)
  • পাকিস্তান জাতীয় বিদ্যুৎ ও পরিকল্পনা বিভাগীয় পরিসংখ্যান (২০২৫-২৬)
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular