আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ২৮ মে ২০২৬
ইরানের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর নগরী বন্দর আব্বাসের একটি সামরিক স্থাপনায় নতুন করে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। এই ঘটনার তীব্র প্রতিশোধ হিসেবে কুয়েতে অবস্থিত একটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের এলিট ফোর্স ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)।
উভয় পক্ষের এই রক্তক্ষয়ী পাল্টাপাল্টি হামলার ফলে গত এপ্রিল থেকে কার্যকর থাকা ভঙ্গুর ও সাময়িক যুদ্ধবিরতি এখন চরম হুমকির মুখে পড়েছে। নতুন করে শত্রুতা শুরু হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক ধাক্কায় ২ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
🚀 বন্দর আব্বাসে মার্কিন হামলা ও ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এবং হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাগুলো জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন সেনা ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হুমকি তৈরি করায় তারা ইরানের চারটি ‘ওয়ান-ওয়ে অ্যাটাক’ ড্রোন সফলভাবে ভূপাতিত করেছে।
এক মার্কিন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বন্দর আব্বাসের একটি গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন বা ড্রোন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়, যেখান থেকে পঞ্চম আরেকটি ড্রোন উৎক্ষেপণের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, এই পদক্ষেপটি সম্পূর্ণ পরিমিত এবং আত্মরক্ষামূলক, যা যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার স্বার্থেই নেওয়া হয়েছে।
তবে ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম তাসনিমের দাবি, আইআরজিসি প্রথমে একটি মার্কিন তেলবাহী জাহাজকে সতর্ক করে গুলি ছুড়েছিল এবং সেটি পিছু হটতে বাধ্য হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র এই হামলা চালায়।
💥 কুয়েতের মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের বিধ্বংসী পাল্টা আঘাত
বন্দর আব্বাসে মার্কিন হামলার মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ভোরে তীব্র প্রতিশোধমূলক পাল্টা হামলা শুরু করে ইরান। আইআরজিসি এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে যে, স্থানীয় সময় ভোর ৪টা ৫০ মিনিটে (জিএমটি ১:২০) কুয়েতের ওই মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়।
কুয়েত সরকার তাদের ভূখণ্ডে “শত্রুতামূলক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হুমকি” প্রতিহত করার কথা নিশ্চিত করলেও সেগুলো কোথা থেকে এসেছে তা নির্দিষ্ট করে বলেনি। আইআরজিসি এই হামলাকে শত্রুর জন্য একটি “চূড়ান্ত সতর্কবার্তা” হিসেবে অভিহিত করে বলেছে, ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলে ইরানের পরবর্তী জবাব আরও বেশি বিধ্বংসী ও সুনির্দিষ্ট হবে。
🛑 ওমানকে ট্রাম্পের হুমকি ও হরমুজ প্রণালিতে নতুন নিষেধাজ্ঞা
হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে এক মন্ত্রিসভা বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সাথে কোনো প্রকার সমঝোতার খবর সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। একই সাথে তিনি ওমানকে হুশিয়ারি দিয়ে বলেন,
“কেউ এই প্রণালির (হরমুজ) নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে না। ওমানকেও অন্য সবার মতোই আচরণ করতে হবে, না হলে তাদের বিরুদ্ধে আমাদের ব্যবস্থা নিতে হবে।”
পাশাপাশি, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে অর্থ বা ‘ফি’ আদায়কারী ইরানি প্রতিষ্ঠান ‘পারসিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি’র ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ。 মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট একে “চাঁদাবাজি” উল্লেখ করে বলেন, কোনো জাহাজ বা প্রতিষ্ঠান এই ফি প্রদান করলে তারাও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকির মুখে পড়বে।
⏳ পটভূমি: তিন মাসের যুদ্ধ ও ব্যর্থ আলোচনা
উল্লেখ্য, গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলা চালালে এই যুদ্ধ শুরু হয়। পরবর্তীতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত ৮ এপ্রিল একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও স্থায়ী শান্তি চুক্তি চূড়ান্ত করতে ব্যর্থ হয় উভয় পক্ষ। বিশ্ব বাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে গত তিন মাস ধরে সংঘাত চলায় ইতিমধ্যে এই রুটে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল প্রায় ৮৮ শতাংশ কমে গেছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যে বড় বিপর্যয় ডেকে এনেছে।



