‘এক জোড়া স্যান্ডেল তিন বছর পরা’ রামিসার বাবার কান্না বনাম মাদক ব্যবসায়ীর নেপাল ভ্রমণ ও হাজতের ৩২ দাঁত বের করা হাসি; সমাজ ও রাষ্ট্রের চরম বৈষম্যের বাস্তব রূপরেখা
ঢাকা | ২৪ সে ২৬
রাজধানীর মিরপুরে ৮ বছরের শিশু রামিসা আক্তারের নৃশংস হত্যাকাণ্ড এবং মোহাম্মদপুরের শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী ‘পিচ্চি রাজা’র গ্রেপ্তারের পর হাজতে হাসিমুখের ছবি—এই দুই বৈপরীত্যের ওপর ভিত্তি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার চরম অবক্ষয় নিয়ে একটি দীর্ঘ ও ক্ষুব্ধ স্ট্যাটাস দিয়েছেন সমাজবিজ্ঞানী ও বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম। তাঁর মতে, সমাজ থেকে মাদক ও অপরাধীদের পেছনে থাকা ‘খুঁটির জোর’ নির্মূল করতে না পারলে রামিসার মতো এমন ট্র্যাজিক ঘটনা ঘটতেই থাকবে।
অধ্যাপক আমিনুল ইসলামের সেই আলোচিত সোশ্যাল মিডিয়া স্ট্যাটাসের মূল বক্তব্য এবং তাঁর দেওয়া তথ্যের আলোতে তৈরি একটি বিশেষ প্রতিবেদন নিচে তুলে ধরা হলো।
‘সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা পাশের মানুষটাই করে’: মাদকের মরণকামড়
অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম তাঁর লেখার শুরুতেই একটি চরম সত্য মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, মানুষের সবচেয়ে বড় ক্ষতি আকাশ থেকে পড়ে এসে কেউ করে না, বরং করে তার আশেপাশের কোনো চেনা মানুষ। রামিসার ক্ষেত্রেও ঠিক তা-ই ঘটেছে। পাশের ফ্ল্যাটের প্রতিবেশী, যে কিনা তীব্র মাত্রার ইয়াবা সেবন করে বিকৃত লালসা চরিতার্থ করতে গিয়ে একটি নিষ্পাপ শিশুকে টুকরো টুকরো করে ফেলল।
তিনি বর্তমান ঢাকা শহরসহ দেশের নগর জীবনের এক ভয়ানক চিত্র তুলে ধরে বলেন, “আপনার পাশের ফ্ল্যাটের প্রতিবেশী গোপনে মাদক সেবন করছে কিনা, তা জানা বা দেখার কোনো আইনি বা সামাজিক সুযোগ আপনার নেই। কিন্তু এটা নির্মম সত্য যে, মাদক এখন পুরো বাংলাদেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে। আর এই মাদকের কারণেই মানুষের মানবিক মূল্যবোধের চূড়ান্ত পতন ঘটছে।”
মাদক ব্যবসায়ী পিচ্চি রাজার হাসি এবং রামিসার বাবার ছেঁড়া স্যান্ডেল
মোহাম্মদপুরের শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী ‘পিচ্চি রাজা’কে গত পরশু পুলিশ গ্রেপ্তার করার পর থানার সামনে তার নির্বিকার ও সহাস্য চেহারার কড়া সমালোচনা করেছেন এই অধ্যাপক। তিনি লেখেন, “দেখেন, থানার সামনে দাঁড়িয়ে ৩২ দাঁত বের করে সে নায়ক-নায়ক ভাব করছে! অপরাধ করেও তার মনে কোনো অনুশোচনা বা ভয় নেই। কারণ সে জানে, এই দেশে অপরাধীরাই মূলত হেসে বেড়ায়, দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ায়।” গ্রেপ্তার হওয়ার কিছুদিন আগেই পিচ্চি রাজা তার স্ত্রী ও শ্যালককে নিয়ে নেপালে প্রমোদভ্রমণ করে এসেছে।
এর বিপরীতে রামিসার হতভাগ্য বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লার গতকালের একটি বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম দেশের ৯০ শতাংশ সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের করুণ চিত্র এঁকেছেন। রামিসার বাবা গতকাল বলেছিলেন:
“আমি গরীব মানুষ। একটা স্যান্ডেল তিন বছর ধইরা ছিঁড়া গেলে সেলাই কইরা পরি। তবুও নিজের কষ্ট গায়ে মাখি নাই, মেয়েটার সব আবদার মেটানোর চেষ্টা করছি সব সময়।”
অধ্যাপক আমিনুল ইসলামের মতে, রামিসার বাবা কিংবা এ দেশের খেটে খাওয়া ৯০ শতাংশ মানুষ জীবনে কোনোদিন বিমানে চড়তে পারবে না, বিদেশ ভ্রমণ করতে পারবে না। কারণ, তাঁদের জীবন কাটে স্রেফ তিন বছর এক জোড়া স্যান্ডেল সেলাই করে পরে বেঁচে থাকার অসম সংগ্রামে। কিন্তু এই সাধারণ মানুষেরা নিরাপরাধ হয়েও বাঁচতে পারছে না, তাদের সন্তানকে বেঘোরে মরতে হচ্ছে এবং মরার পর সহপাঠী শিশুদের রাস্তায় নেমে বিচার চাইতে হচ্ছে।
📊 বাংলাদেশের বাস্তবতার দুই বিপরীত মুখ (A Tale of Two Realities)
অধ্যাপকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক ও আইনি কাঠামোর বৈষম্যকে এই দুটি চরিত্র ও সংলাপের মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত করা যায়:
| বিষয়ের ধরণ | 😢 সাধারণ নাগরিক (রামিসার পরিবার) | 😎 অপরাধী চক্র (মাদক ব্যবসায়ী পিচ্চি রাজা) |
| জীবনযাত্রার মান | এক জোড়া স্যান্ডেল ৩ বছর ধরে সেলাই করে পরা। | অপরাধের টাকায় সপরিবারে নেপাল ভ্রমণ। |
| আইনি প্রতিক্রিয়া | সন্তান হারিয়ে রাজপথে সহপাঠীদের কান্নার মিছিল ও বিচার প্রার্থনা। | থানা হাজতে ঢুকেও ৩২ দাঁত বের করা হাসিমুখ ও দম্ভ। |
| সামাজিক অবস্থান | রাষ্ট্র ও সমাজে এরা মূলত শোষিত ‘প্রজা’। | স্থানীয় নেতা ও পুলিশের মাসোহারা ভিত্তিক ‘রাজা’। |
‘আমরা নিজ দেশে শরণার্থী, রাষ্ট্র শুধু খুঁটির জোরওয়ালাদের’
বাংলাদেশ একটি ছোট রাষ্ট্র হলেও এখানে কোটি কোটি মানুষের বসবাস। অধ্যাপক আমিনুল ইসলামের মতে, এত মানুষের ভিড়ে লুকিয়ে আসলে কোনো অপরাধ বা মাদক ব্যবসা করা সম্ভব নয়। পিচ্চি রাজাদের মতো অপরাধীরা যে দিব্যি ব্যবসা করে যেতে পারে, তার কারণ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা এদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয় এবং পুলিশ এদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা বা অনৈতিক সুবিধা নেয়। কখনো লোকদেখানো গ্রেপ্তার করা হলেও স্থানীয় নেতারাই আবার আইনের ফাঁক গলে এদের বের করে নিয়ে আসে।
স্ট্যাটাসের শেষে অধ্যাপক অত্যন্ত হতাশা ও ক্ষোভ নিয়ে এই দেশের একটি নতুন সংজ্ঞা দাঁড় করিয়েছেন:
“এই দেশ কোনোদিন আমাদের (সাধারণ মানুষের) ছিল না। আমরা নিজ দেশে আসলে এক একজন শরণার্থী। এই রাষ্ট্র শুধু তাঁদেরই—যাদের এই পিচ্চি রাজার মতো ওপর মহলে খুঁটির জোর আছে। রাজত্ব তো ওরাই করছে, আর বাদবাকিরা বেঁচে থেকেও মৃত মানুষের মতো প্রজা হয়ে জীবন পার করছে। এটাই বাংলাদেশের বর্তমান সংজ্ঞা। ফুল স্টপ।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অধ্যাপক আমিনুল ইসলামের এই পোস্টটি হাজার হাজার মানুষ শেয়ার করেছেন। রামিসা হত্যার দ্রুত বিচারের দাবিতে আজ যখন স্কুলের ছোট ছোট বাচ্চারা প্ল্যাকার্ড হাতে রাস্তায় নেমে এসেছে, তখন মাদক সিন্ডিকেট ও রাজনৈতিক গডফাদারদের এই অশুভ আঁতাত ভাঙতে না পারলে সমাজ যে আরও বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠবে, পোস্টের কমেন্ট বক্সে সাধারণ নাগরিকেরাও সেই আশঙ্কাই প্রকাশ করছেন।
অধ্যাপক ড. আমিনুল ইসলামের ফেসবুক স্ট্যাটাস অবলম্বনে



