জুলাই আন্দোলনের বাড্ডা এলাকার সোহেলী তামান্না হত্যাচেষ্টা মামলায় খাদিজা ইয়াসমিন বিথী গ্রেপ্তার; বাবার কারণে বারবার হয়রানির অভিযোগ
ঢাকা | ২৩ মে ২০২৬
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালীন রাজধানীর বাড্ডা-ভাটারা এলাকায় সোহেলী তামান্না নামের এক নারীকে গুলি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যাচেষ্টার মামলায় শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের মেয়ে খাদিজা ইয়াসমিন বিথীকে (৩৫) নতুন করে গ্রেপ্তার (শোন অ্যারেস্ট) দেখানো হয়েছে। আজ শনিবার (২৩ মে) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলাম তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই আদেশ দেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ভাটারা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. আমিনুর রহমান আসামিকে আজ কড়া নিরাপত্তায় আদালতে হাজির করে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেন। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী শামসুদ্দোহা সুমন। তিনি যুক্তি দেন, ঘটনার সাথে আসামির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে কান্নায় ভেঙে পড়েন বিথী।
আদালত কক্ষেই বিথীর আবেগঘন বক্তব্য ও আর্তনাদ
শুনানি চলাকালীন বিচারককে উদ্দেশ্য করে শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের মেয়ে খাদিজা ইয়াসমিন বিথী বলেন,
“এর চেয়ে আমাকে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলেন? আমার বাচ্চা আছে। বারবার এভাবে নতুন নতুন মামলা দিয়ে কেন হয়রানি করা হচ্ছে? আমি সাধারণ একটা চাকরি করে চলি, মামলা লড়ার মতো এত টাকা আমি কোথায় পাবো?”
বিথী আদালতে দাবি করেন, তিনি কোনো ধরনের রাজনৈতিক দল বা আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগ-যুবলীগের রাজনীতির সাথে কখনোই জড়িত ছিলেন না। শুধুমাত্র তাঁর বাবার (সুব্রত বাইন) পরিচয়ের কারণে তাকে বলির পাঁঠা বানানো হচ্ছে। তিনি আদালতকে বলেন:
- বাবার সাথে দেখা করতে গিয়ে গ্রেপ্তার: “আমি স্রেফ আমার বাবাকে দেখতে গিয়েছিলাম। সন্তান হিসেবে আমি আমার বাবাকে দেখতে যেতেই পারি। সেখান থেকেই পুলিশ আমাকে অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করে নিয়ে আসে।”
- আন্দোলনের সময় অবস্থান: “জুলাই মাসে গণ-আন্দোলনের সময় আমি পার্ট-টাইম জবের (খণ্ডকালীন চাকরি) প্রয়োজনে সিলেটে অবস্থান করছিলাম। ঢাকায় কোনো ঘটনার সাথেই আমার সম্পর্ক নেই।”
- পারিবারিক সংকট: “আমার ১৩ বছরের একটি কন্যাসন্তান আছে। এর আগে একটি রাজনৈতিক মামলায় অনেক কষ্টে জামিন পেয়েছিলাম। জেল থেকে বের হওয়ার আগেই আবার এই নতুন সাজানো মামলা দেওয়া হলো।”
🕒 ঘটনাপঞ্জি ও মামলার প্রেক্ষাপট
সোহেলী তামান্না হত্যাচেষ্টা মামলার বিবরণী ও বর্তমান আইনি পরিস্থিতি নিচে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
- ৫ আগস্ট ২০২৪: শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিন রাজধানীর ভাটারা থানাধীন প্রগতি সরণি এলাকায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমর্থনে একটি মিছিল বের হয়। ওই মিছিলে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা নির্বিচারে গুলিবর্ষণ ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়।
- গুরুতর জখম: হামলায় মিছিলের সামনের সারিতে থাকা সোহেলী তামান্না নামের এক নারী গুরুতর আহত হন। সন্ত্রাসীদের ছোঁড়া বুলেট ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তাঁর বাম হাতের কার্যক্ষমতা চিরতরে নষ্ট হয়ে যায়।
- মামলা দায়ের: সুস্থ হওয়ার পর ভুক্তভোগী সোহেলী তামান্না নিজেই বাদী হয়ে বাড্ডা ও ভাটারা এলাকার অপরাধীদের চিহ্নিত করে একটি হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেন।
- ২৩ মে ২০২৬ (আজ): এই মামলায় সন্দিগ্ধ আসামি হিসেবে সুব্রত বাইনের মেয়ে খাদিজা ইয়াসমিন বিথীকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন মঞ্জুর করেন ঢাকার আদালত।
তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্য ও আদালতের সিদ্ধান্ত
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই আমিনুর রহমান আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, ঘটনার দিন প্রগতি সরণি এলাকায় সহিংসতা ছড়ানোর নেপথ্যে বিথীর প্রত্যক্ষ ইন্ধন ও সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। এই মুহূর্তে আসামি জামিনে মুক্ত পেলে বা তাকে গ্রেপ্তার না দেখালে সে স্থায়ীভাবে পলাতক হতে পারে, যা জুলাই গণহত্যার এই স্পর্শকাতর মামলার তদন্তে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটাবে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী শামসুদ্দোহা সুমনের আইনি যুক্তি ও তদন্ত কর্মকর্তার আবেদন পর্যালোচনা করে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলাম বিথীকে এই মামলায় আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দিয়ে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। মামলার পরবর্তী শুনানির দিন বিথীর আইনজীবীরা জামিনের আবেদন করবেন বলে জানা গেছে।
📌 তথ্যসূত্র:
- ঢাকা সিএমএম (CMM) আদালত রেকর্ড ও মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এজলাস ডায়েরি (মে ২০২৬)
- ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ভাটারা থানা অপরাধ প্রতিবেদন



