স্বামীর ক্যানসারের কথা উল্লেখ করে ইস্তফা দিলেও নেপথ্যে ইরানের পরমাণু নীতি ও অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্কার নিয়ে বিরোধের গুঞ্জন; ভারপ্রাপ্ত প্রধান হচ্ছেন অ্যারন লুকাস
ওয়াশিংটন | ২৩ মে ২০২৬
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক (ডিএনআই) তুলসী গ্যাবার্ড তাঁর পদ থেকে আকস্মিক পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। গতকাল শুক্রবার (২২ মে) ওভাল অফিসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাত করে তিনি তাঁর পদত্যাগপত্র জমা দেন, যা আগামী ৩০ জুন থেকে কার্যকর হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) পোস্ট করা এক চিঠিতে গ্যাবার্ড তাঁর স্বামী আব্রাহাম উইলিয়ামসের হাড়ের ক্যানসার (বোন ক্যানসার) ধরা পড়ার কথা উল্লেখ করে পারিবারিক কারণে দায়িত্ব ছাড়ার কথা জানিয়েছেন।
তবে ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ কূটনৈতিক একাধিক সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছে যে, পারিবারিক কারণ সামনে আনা হলেও মূলত হোয়াইট হাউসের প্রবল চাপের মুখেই গ্যাবার্ডকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। তাঁর পদত্যাগের পর মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র সাবেক কর্মকর্তা ও জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের সাবেক বিশ্লেষক অ্যারন লুকাস ভারপ্রাপ্ত জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বলে ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ নিশ্চিত করেছেন।
⚠ মূল বিষয়
- আনুষ্ঠানিক কারণ: তুলসী গ্যাবার্ডের স্বামী আব্রাহাম উইলিয়ামস বিরল বোন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ায় তাঁর পাশে থাকার জন্য এই সিদ্ধান্ত।
- প্রকৃত নেপথ্য: ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নরম মনোভাব পোষণ এবং হোয়াইট হাউসের নীতি নির্ধারকদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের মতবিরোধ।
- বিতর্কিত পদক্ষেপ: সিআইএ ও এফবিআই-এর সাবেক ৩৭ কর্মকর্তার সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স বাতিল করে আন্ডারকভার এজেন্টের নাম ফাঁসের অভিযোগ।
- পরবর্তী নেতৃত্ব: প্রিন্সিপাল ডেপুটি ডিরেক্টর ও সিআইএ-র সাবেক কর্মকর্তা অ্যারন লুকাস হচ্ছেন নতুন ভারপ্রাপ্ত ডিরেক্টর।
হোয়াইট হাউসের সঙ্গে নীতিগত সংঘাত ও নেপথ্য কারণ
সাবেক ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য তুলসী গ্যাবার্ড যখন ১৮টি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাকে তদারকি করার জন্য গঠিত এই শীর্ষ পদে মনোনীত হন, তখন থেকেই তাঁর গভীর গোয়েন্দা অভিজ্ঞতার অভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। দায়িত্ব নেওয়ার পর গত দেড় বছরে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি নির্ধারকদের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব ক্রমাগত বেড়েছে।
সূত্র মতে, গ্যাবার্ডের বিদায়ের নেপথ্যে প্রধানত তিনটি বিষয় কাজ করেছে:
১. ইরান নীতি নিয়ে দ্বিমত: গত মার্চ ও জুন মাসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে তেহরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা দমনের ক্ষেত্রে গ্যাবার্ডের অবস্থান মার্কিন প্রশাসনের চেয়ে অনেক ‘নরম’। ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি করছে না—গ্যাবার্ডের এমন মূল্যায়নের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন ট্রাম্প।
২. গোপন নথির টাস্কফোর্স: গ্যাবার্ডের অধীনে গঠিত ‘ডিরেক্টরস ইনিশিয়েটিভস গ্রুপ’ জন এফ কেনেডির হত্যাকাণ্ড, মার্কিন নির্বাচনী মেশিনের নিরাপত্তা এবং কোভিড-১৯-এর উৎস নিয়ে স্বাধীন তদন্ত শুরু করায় ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টারা অসন্তুষ্ট ছিলেন।
৩. সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স বাতিল বিতর্ক: গত বছরের আগস্টে গ্যাবার্ড সাবেক সিআইএ প্রধান জন ব্রেনানসহ ৩৭ জন বর্তমান ও প্রাক্তন মার্কিন কর্মকর্তার বিশেষ নিরাপত্তা ছাড়পত্র (সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স) বাতিল করেন। এই প্রক্রিয়ায় বিদেশে কর্মরত এক আন্ডারকভার (ছদ্মবেশী) মার্কিন এজেন্টের নাম ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর গোয়েন্দা মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
💬 গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য
“আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ আমার ওপর আস্থা রাখার জন্য এবং গত দেড় বছর ধরে ওডিএনআই (ODNI) পরিচালনোর সুযোগ দেওয়ার জন্য। তবে এই কঠিন সময়ে আমার স্বামীকে একা রেখে এই সময়সাপেক্ষ ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।”
— তুলসী গ্যাবার্ড, বিদায়ী জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক“তুলসী চমৎকার কাজ করেছেন। তবে তাঁর স্বামীর ক্যানসার ধরা পড়ায় তিনি এখন তাঁর পাশে থাকতে চান। তারা একসাথে একটি কঠিন লড়াই লড়ছেন, আমি তাঁর স্বামীর দ্রুত সুস্থতা কামনা করি।”
— ডোনাল্ড ট্রাম্প, প্রেসিডেন্ট, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র“এই পদটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হওয়া উচিত নয়। এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি একজন স্বাধীন, অভিজ্ঞ এবং পেশাদার গোয়েন্দা কর্মকর্তার এই সংস্থায় নেতৃত্ব দেওয়া প্রয়োজন, যিনি ঘরোয়া রাজনীতির চেয়ে বিদেশি গোয়েন্দা তথ্যে মনোনিবেশ করবেন।”
— সিনেটর মার্ক ওয়ার্নার, শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য, মার্কিন সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটি
🕒 ঘটনাপঞ্জি ও রাজনৈতিক প্রোফাইল
- ২০০৪–২০০৫: হাওয়াই ন্যাশনাল গার্ডের সদস্য হিসেবে ইরাক যুদ্ধে অংশ নেন। পরবর্তীতে মার্কিন আর্মি রিজার্ভের লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে উন্নীত হন।
- ২০১৭: সিরিয়া সফরের সময় দেশটির প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সঙ্গে বিতর্কিত বৈঠক করেন, যা নিয়ে দ্বিপাক্ষিক সমালোচনা তৈরি হয়।
- ২০২২–২০২৪: ডেমোক্র্যাটিক পার্টি ত্যাগ করে কনজারভেটিভ ধারার রাজনীতিতে যোগ দেন এবং ২০২৪ নির্বাচনে ট্রাম্পকে সমর্থন দিয়ে রিপাবলিকান পার্টিতে অন্তর্ভুক্ত হন।
- ২০২৫ (মার্চ): মার্কিন হাউসের ইন্টেলিজেন্স কমিটির শুনানিতে বৈশ্বিক হুমকি নিয়ে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য দেন।
- ২০২৬ (এপ্রিল): রয়টার্সের প্রতিবেদনে ট্রাম্পের ক্যাবিনেট রদবদলে গ্যাবার্ডের পদ হারানোর সম্ভাবনার কথা প্রথম প্রকাশ পায়।
- ২২ মে ২০২৬: ওভাল অফিসে ট্রাম্পের কাছে পদত্যাগপত্র পেশ।
মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ নিরাপত্তা বৈঠক, বিশেষ করে ভেনিজুয়েলা পরিস্থিতি, ইরানের চলমান যুদ্ধ এবং কিউবা সংকটের মতো সংবেদনশীল আন্তর্জাতিক বিষয়ে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে গ্যাবার্ডকে নীতি নির্ধারণী আলোচনা থেকে দূরে রাখা হয়েছিল। তাঁর এই আকস্মিক বিদায় আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের ক্যাবিনেট রদবদলের ইঙ্গিতকে আরও স্পষ্ট করল।
📌 তথ্যসূত্র:
- Reuters (রয়টার্স ওয়াশিংটন ব্যুরো)
- Fox News Digital
- মার্কিন জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালকের দফতর (ODNI) অফিসিয়াল বিবৃতি
- ডোনাল্ড ট্রাম্পের ট্রুথ সোশ্যাল হ্যান্ডেল



