Homeটুডে বাংলাতৃণমূল সাংবাদিকতার অনন্য বাতিঘর পটুয়াখালীর ‘আন্ধারমানিক’

তৃণমূল সাংবাদিকতার অনন্য বাতিঘর পটুয়াখালীর ‘আন্ধারমানিক’

কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়ন ছাড়াই কলাপাড়ার উপকূলীয় ইটভাটার শ্রমিকদের হাত ধরে শ্রমজীবী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুখ-দুঃখের দর্পণ হয়ে উঠেছে এই কমিউনিটি পত্রিকা

কলাপাড়া (পটুয়াখালী) — বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার পশ্চিম সোনাতলা গ্রামে গ্রামীণ জনযোগাযোগের এক অবিশ্বাস্য ও নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে। মূলধারার গণমাধ্যমের আড়ালে থাকা উপকূলীয় অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া এবং শ্রমজীবী মানুষের দৈনিক সংগ্রাম, সংকট ও সফলতার গল্প তুলে ধরছে স্থানীয় কমিউনিটি পত্রিকা ‘আন্ধারমানিক’।

তবে এই পত্রিকার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—এর পেছনে কোনো পেশাদার সাংবাদিক বা করপোরেট স্পন্সরশিপ নেই; বরং পত্রিকার সম্পাদক নিজে এবং এর বেশিরভাগ সংবাদকর্মীই জীবিকার তাগিদে স্থানীয় ইটভাটায় শ্রমিকের কাজ করেন। কঠোর শারীরিক পরিশ্রমের পর হাড়ভাঙা খাটুনির ফাঁকে ফাঁকেই তারা বের করে আনেন প্রান্তিক মানুষের ভেতরের গল্প।

সম্পূর্ণ ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে তৈরি ও স্থানীয় উদ্যোগে প্রকাশিত এই পত্রিকা গত কয়েক বছরে এই অবহেলিত জনপদে এক বিশ্বস্ত সামাজিক মেলবন্ধনে পরিণত হয়েছে।
উপকূলীয় সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম মন্টুর দূরদর্শী ধারণা ও পরিকল্পনায় এবং স্থানীয় উদ্যমী সংবাদকর্মী হাসান পারভেজের প্রকাশনা ও সম্পাদনায় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে এই আন্ধারমানিক। পত্রিকাটির মূল প্রতিপাদ্য—”কমিউনিটি পত্রিকাই বলে দিতে পারে শ্রমজীবী মানুষের সফলতার কথা।”

ইটভাটার হাড়ভাঙা খাটুনি থেকে খবরের কাগজ: এক কঠিন ম্যানুয়াল লড়াই

আধুনিক ছাপাখানা, চকচকে স্টুডিও কিংবা ডিজিটাল লে-আউট সফটওয়্যার—এর কোনোটিই নেই আন্ধারমানিকের। এর প্রতিটি সংখ্যা প্রকাশের পেছনে রয়েছে এক অভিনব ও কঠোর শারীরিক পরিশ্রমের গল্প।

  • শ্রমিকের হাতে কলম: সম্পাদক হাসান পারভেজ এবং তাঁর সঙ্গে যুক্ত বেশিরভাগ স্থানীয় তরুণ দিনমজুর হিসেবে ইটভাটায় কাজ করেন। সারাদিন কাদা-মাটি আর আগুনের উত্তাপে ইট তৈরির কাজ শেষে যে সামান্য অবসর মেলে, তাতেই তারা নেমে পড়েন খবর সংগ্রহের কাজে। জেলেপল্লি, ইটের ভাটা এবং কৃষকদের মাঠ ঘুরে ঘুরে প্রান্তিক মানুষের অভাব-অভিযোগ ও সফলতার খবর সংগ্রহ করেন। সংগৃহীত তথ্যগুলো প্রথমে ডায়েরিতে হাতে লেখা বা টাইপ করে পত্রিকার পাতার জন্য বিন্যাস করা হয়।
  • ম্যানুয়াল বাঁধাই ও পৃষ্ঠা তৈরি: প্রিন্ট করা নিউজ ও ছবিগুলো সম্পূর্ণ ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে নিখুঁতভাবে আঠা দিয়ে শক্ত বোর্ডের ওপর যুক্ত করে একেকটি পূর্ণাঙ্গ সংখ্যা বা কপি তৈরি করা হয়। ইটভাটার আয়েই জোটে এই কাগজ ও আঠার খরচ।
  • স্বেচ্ছায় ঘরে ঘরে বিতরণ: কোনো বাণিজ্যিক ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক বা হকার ছাড়াই হাসান পারভেজ নিজে পায়ে হেঁটে মাইলের পর মাইল উপকূলীয় মেঠো পথ পাড়ি দেন। চটের ব্যাগে পত্রিকার কপি নিয়ে তিনি স্থানীয় বাসিন্দা, চায়ের দোকান এবং খেটে খাওয়া মানুষের হাতে তা বিনামূল্যে পৌঁছে দেন।

গণযোগাযোগের নতুন সরঞ্জাম ও পাঠক প্রতিক্রিয়া

স্থানীয় চায়ের দোকান, বাড়ির আঙিনা ও পাড়া-মহল্লায় আন্ধারমানিক পত্রিকা নিয়ে গোল হয়ে বসে আলোচনা করা এখন কলাপাড়ার এই অঞ্চলের একটি পরিচিত চিত্র। পত্রিকাটির কপি হাতে পেয়ে গ্রামের কৃষক, জেলে, প্রবীণ ব্যক্তিত্ব এবং তরুণরা একসঙ্গে বসে খবরগুলো পড়েন ও নিজেদের পারিপার্শ্বিক সমস্যা নিয়ে কথা বলেন।
স্থানীয় পাঠকদের মতে, এই পত্রিকাটির মাধ্যমে তারা তাদের নিজেদের অধিকার, বেড়িবাঁধের সমস্যা, ফসলের ন্যায্যমূল্য এবং এলাকার নানা সংকটের কথা জানতে পারছেন, যা প্রায়শই জাতীয় গণমাধ্যমগুলোতে স্থান পায় না। গ্রামীণ মানুষের নিজস্ব জীবনের গল্প ও শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের কথা এখানে তাদেরই সহজ ভাষায় উঠে আসায় এটি পুরো কলাপাড়ায় অত্যন্ত আপন এক মাধ্যমে পরিণত হয়েছে।
💬 হাসান পারভেজ (সম্পাদক ও প্রকাশক) বলেন:

​”আমরা যখন এই আন্ধারমানিক পত্রিকা শুরু করি, আমাদের মূল উদ্দেশ্যই ছিল আমাদের মতো অবহেলিত খেটে খাওয়া মানুষের কথা বলা। আমি নিজে এবং আমার সঙ্গে যারা কাজ করে, তাদের বেশিরভাগই ইটভাটার শ্রমিক। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর আমরা এই পত্রিকার কাজ করি। আমাদের এখানে কোনো হকার বা প্রযুক্তি নেই। আমি নিজেই খবর লিখি, আঠা দিয়ে বোর্ড বাঁধাই করি এবং পায়ে হেঁটে মানুষের কাছে পৌঁছে দিই।”

​🔎 বিশ্লেষণ ও ভবিষ্যৎ পথরেখা

​আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও উন্নয়ন সমীক্ষার দৃষ্টিতে, ‘আন্ধারমানিক’ তৃণমূল সাংবাদিকতা বা Grassroots Journalism-এর এক অনবদ্য এবং মানবিক মডেল। এটি প্রমাণ করে, তথ্য বা সংবাদ কোনো বিলাসী পণ্য নয়, বরং এটি প্রান্তিক মানুষের মৌলিক অধিকার ও সচেতনতার হাতিয়ার। তবে শ্রমিকদের ব্যক্তিগত আয়ের ওপর নির্ভরশীল এই প্রশংসনীয় উদ্যোগের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো এর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্থায়িত্ব। বৈরী আবহাওয়া, সীমিত অর্থায়ন এবং প্রিন্ট-সামগ্রীর সহজলভ্যতার অভাব এই অগ্রযাত্রাকে মাঝে মাঝে থমকে দেয়।

​বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যবহারিক কিছু পরিবর্তন ও কাঠামোগত সহযোগিতার মাধ্যমে এই উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব:

ডিজিটাল হাইব্রিড সংস্করণ: প্রিন্ট কপির সীমাবদ্ধতা ও তৈরি খরচ কাটাতে মোবাইল-ভিত্তিক সাশ্রয়ী ডিজিটাল পোর্টাল বা হোয়াটসঅ্যাপ/ফেসবুক গ্রুপ চালু করলে তথ্য আরও দ্রুত ছড়াবে এবং ইটভাটার শ্রমিকদের ব্যক্তিগত পকেটের ওপর চাপ কমবে।

প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি: এই অপেশাদার কিন্তু লড়াকু সংবাদকর্মীদের মোবাইল জার্নালিজমের (MoJo) ওপর মৌলিক প্রশিক্ষণ দিলে প্রতিবেদনের মান আন্তর্জাতিক স্তরে উন্নীত হবে।

দুর্যোগকালীন বিতরণ কৌশল: উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ঝড়-বন্যার মৌসুমে বিকল্প ও জলবায়ু-রোধী বিতরণ ব্যবস্থা তৈরি করা প্রয়োজন।

​সীমিত সম্পদ, তীব্র অভাব আর বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও এই কন্ট্রিবিউশন প্রমাণ করেছে যে, সমাজের সবচেয়ে নীচুস্তরের মানুষেরা চাইলে নিজেদের কণ্ঠ বিশ্বস্তভাবে বিশ্ব দরবারে তুলে দেখাতে পারে। ইটভাটার শ্রমিকদের এই অনন্য লড়াই দেশের সামগ্রিক সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগের ইতিহাসে এক নতুন বাতিঘর হিসেবে কাজ করবে।

তথ্যসূত্র: কলাপাড়া (পটুয়াখালী) মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান, আন্ধারমানিক সম্পাদকীয় দপ্তর এবং উপকূলীয় সাংবাদিকতা বিষয়ক আঞ্চলিক রিভিউ, মে ২০২৬।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular