Homeটুডে বাংলাস্কুল ফিডিং প্রকল্পে 'সাগর চুরি': সপ্তাহে কলা-ডিমেই লোপাট প্রায় ১৭ কোটি টাকা!

স্কুল ফিডিং প্রকল্পে ‘সাগর চুরি’: সপ্তাহে কলা-ডিমেই লোপাট প্রায় ১৭ কোটি টাকা!

নিম্নমানের খাবারে অসুস্থ শতাধিক শিশু, প্রশ্নের মুখে ৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প

বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | ১৮ মে, ২০২৬

দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে চালু হওয়া সরকারি স্কুল ফিডিং প্রকল্প এখন ভয়াবহ অনিয়ম, নিম্নমানের খাদ্য সরবরাহ এবং কোটি কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে।

Jamuna Television-এর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, প্রকল্পের আওতায় সরবরাহ করা ডিম, বানরুটি ও কলায় ওজন ও মানের বড় ধরনের কারসাজি হচ্ছে। শিশুদের জন্য বরাদ্দকৃত খাবারের বড় অংশ নিম্নমানের, বাসি, ফাঙ্গাসযুক্ত কিংবা কম ওজনের।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো — এসব খাবার খেয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে শতাধিক শিশু অসুস্থ হয়ে পড়েছে।

বর্তমানে দেশের প্রায় ১৫০টি উপজেলায় চলমান এই প্রকল্পে প্রায় ২৯ লাখ ৫৮ হাজার ৭৫০ জন শিক্ষার্থীকে ডিম, বানরুটি, দুধ, কলা ও বিস্কুট সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রকল্পের মোট ব্যয় প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে — পুষ্টির নামে শিশুদের দেওয়া হচ্ছে নিম্নমানের খাদ্য, আর সেই সুযোগে সপ্তাহে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করছে একটি অসাধু সিন্ডিকেট।

📌 শিশুদের খাবারে ফাঙ্গাস, পচা ডিম ও কাঁচা কলা

স্কুল ফিডিং প্রকল্পের খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল শিশু রাইসা মুনতাহা

তার ভাষায়: “ওই খাবার খেয়ে আমার পেট ব্যথা করছিল। খাবারগুলোতে কেমিক্যালের মতো লাগে।”

রাইসার মা জান্নাতুল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:

“বিষাক্ত খাবার দিয়ে লাভ কী? যদি বাচ্চাদের কিছু হয়ে যায়, তখন দায় নেবে কে?”

অভিভাবকদের অভিযোগ, শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করার নামে এমন খাবার দেওয়া হচ্ছে যা অনেক ক্ষেত্রে খাওয়ারই অনুপযোগী।

🍞 বানরুটিতে ফাঙ্গাস, দুর্গন্ধ ও ওজনে কারচুপি

জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার থুপশাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরেজমিনে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীদের দেওয়া বানরুটিতে ফাঙ্গাস জমেছে এবং তা থেকে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জিয়াউল হক জানান:

“এমন ঘটনা এখানে নতুন নয়, প্রায় নিয়মিতই ঘটে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।”

একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে তেলিহার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও। শিক্ষকরা জানিয়েছেন, অনেক সময় রুটির ভেতরের বাতাস থেকে তীব্র দুর্গন্ধ বের হয় এবং শিশুরা তা ফেলে দিতে বাধ্য হয়।

প্রকল্প অনুযায়ী প্রতিটি বানরুটির ওজন হওয়ার কথা ১২০ গ্রাম এবং প্রতি পিসের জন্য বরাদ্দ প্রায় ২৪ টাকা। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে রুটি ফাঁপা ও বাতাসযুক্ত, ওজন ঠিক দেখাতে অনেক সময় পানিতে ভিজিয়ে রাখা হচ্ছে এবং মান এতটাই খারাপ যে শিশুরা তা খেতে পারছে না।

🥚 ডিমের ওজনে বড় কারসাজি

সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী প্রতিটি ডিমের ওজন কমপক্ষে ৬০ গ্রাম হওয়ার কথা এবং প্রতি ডিমের জন্য বরাদ্দ প্রায় ১৪ টাকা। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ ডিমের ওজন পাওয়া গেছে মাত্র ৩৫–৪৩ গ্রাম

পাবনার এক খামার ব্যবসায়ী জানিয়েছেন:

“ছোট ডিমে দাম কম পড়ে। বড় ডিমের দাম বেশি।”

শুধু ওজনে কম নয়, অনেক স্থানে আধাসিদ্ধ ডিম, পচা ডিম এবং নিম্নমানের সংরক্ষণ নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষার্থীদের ভাষ্যমতে: “ডিমে গন্ধ থাকে, খাওয়া যায় না।”

💰 ‘এক টাকা কম’ মানেই কোটি টাকার দুর্নীতি

বর্তমানে প্রকল্পের আওতায় থাকা প্রায় ৩০ লাখ শিক্ষার্থীর জন্য প্রতিটি ডিমে যদি মাত্র ১ টাকা করেও কম খরচ করা হয়, তাহলে প্রতিদিন প্রায় ৩০ লাখ টাকা অতিরিক্ত থেকে যায়। সপ্তাহ শেষে এই অনিয়ম দাঁড়ায় কোটি টাকায়। শুধু ডিম ও বানরুটিতেই সপ্তাহে প্রায় ১৫ কোটি টাকা পর্যন্ত অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের ছোট ছোট কারসাজিই জাতীয় পর্যায়ে “সাগর চুরি”-তে পরিণত হচ্ছে।

🍌 ৩ টাকার কলা দেখানো হচ্ছে সাড়ে ১০ টাকায়

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সরবরাহকৃত কলার ওজন পরীক্ষা করে দেখা গেছে, চুক্তি অনুযায়ী ১০০ গ্রাম কলা দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা ৯০ গ্রাম বা তারও কম।

সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী প্রতি কলার দাম প্রায় ১০.৫ টাকা। কিন্তু জয়পুরহাটের দুর্গাদহ বাজারে গিয়ে দেখা গেছে একই মানের কলার পাইকারি মূল্য মাত্র ৩–৩.৫ টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি কলায় প্রায় ৭ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত মূল্য দেখানো হচ্ছে এবং সারা দেশে সপ্তাহে শুধু কলা থেকেই প্রায় ২ কোটি টাকা পর্যন্ত অনিয়ম হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

শিক্ষার্থীরা জানিয়েছে, কলা শক্ত ও কাঁচা, মাঝখানের অংশ অনেক সময় পচা থাকে এবং খেলে কাশি বা পেটের সমস্যা হয়।

📊 সাপ্তাহিক আর্থিক অনিয়মের চিত্র

খাতসরকারি বরাদ্দবাস্তব চিত্রসাপ্তাহিক অনিয়ম
বানরুটি১২০ গ্রাম, ২৪ টাকাফাঁপা, নিম্নমানের, ভেজানো
ডিম৬০ গ্রাম, ১৪ টাকা৩৫–৪৩ গ্রাম, পচা/ছোটপ্রায় ১৫ কোটি টাকা
কলা১০০ গ্রাম, ১০.৫ টাকা৯০ গ্রাম, বাজারমূল্য ৩–৩.৫ টাকাপ্রায় ২ কোটি টাকা
মোটপ্রায় ১৭ কোটি টাকা

🚨 নিম্নমানের খাবারে অসুস্থ শতাধিক শিক্ষার্থী

দেশের বিভিন্ন স্থানে এসব খাবার খেয়ে তিন শতাধিক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সবচেয়ে বড় ঘটনা ঘটে শঙ্করবাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। গত ২২ এপ্রিল সেখানে একসঙ্গে ২০ জন শিক্ষার্থী পেট ব্যথা, বমি ও দুর্বলতা নিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা জানায়, পাউরুটি খাওয়ার পরই তাদের সমস্যা শুরু হয়।

🏥 জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও World Health Organization-এর উপদেষ্টা অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন:

“খাদ্যের উপাদানগুলো যদি ক্ষতিকর বা রাসায়নিকযুক্ত হয়, তবে তা শিশুদের লিভারের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হতে পারে। আর বাসি বা পচা খাবার হলে ডায়রিয়া, জন্ডিস, এমনকি হেপাটাইটিস-এ ও ই ছড়িয়ে পড়তে পারে।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের অপুষ্টি কমানোর প্রকল্প যদি উল্টো স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে, তাহলে সেটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি

🏛️ সরকারের প্রতিক্রিয়া ও তদন্ত

প্রকল্প পরিচালক জানিয়েছেন: “ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিশুদের খাবারের বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।”

এদিকে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন বলেছেন:

“মাঠ পর্যায়ে তদন্তে গিয়ে আমরা ৪১ গ্রামের ডিম এবং ৯০ গ্রামের কম ওজনের কলা পেয়েছি। এটি সরাসরি ‘সাগর চুরি’। এখন থেকে প্রধান শিক্ষক ও স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটি খাবারের মান ও ওজন যাচাই করে গ্রহণ করবে।”

🔮 সামনে ১২ হাজার কোটি টাকার নতুন পরিকল্পনা

সরকার আগামীতে দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই প্রকল্প সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে। এজন্য প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার নতুন প্রকল্প নেওয়ার আলোচনা চলছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বর্তমান প্রকল্পেই যদি জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও বড় বাজেটে দুর্নীতির ঝুঁকি বাড়বে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের কোমলমতি শিশুরাই।

📌 উপসংহার

বাংলাদেশের লাখো শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করার জন্য নেওয়া একটি মহৎ উদ্যোগ এখন দুর্নীতি, অনিয়ম ও নিম্নমানের খাদ্য সরবরাহের অভিযোগে গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।

শিশুদের জন্য বরাদ্দ খাবারে অনিয়ম শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ নয় — এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি প্রতারণা

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই যদি কঠোর তদারকি, স্বাধীন মান নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ডিজিটাল মনিটরিং এবং জবাবদিহিতামূলক সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না হয়, তাহলে হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করার বদলে দুর্নীতির আরেকটি বড় উৎসে পরিণত হবে।

ভিডিও অনুসন্ধান প্রতিবেদন: Jamuna TV Investigation

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular